যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

প্রভাষক একাব্বর রসায়নবিজ্ঞান




তপ্ত মরুর বুকে – স্থাপত্যের বিস্ময় “এক স্কুল ” : ভারতের রাজস্থানে মরুভূমির মাঝে থাকা এক স্কুল,শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ছাড়াই ঠান্ডা থাকে।

লিখেছেনঃ

প্রভাষক একাব্বর রসায়নবিজ্ঞান

✓ রাজস্থানের থর মরভূমির মাঝে অবস্থিত এই স্কুল।

✓ নিউইয়র্কের এক দম্পতি এই স্কুল তৈরি করেন।

✓ প্রায় ৪০০ জন ছাত্রী এখানে পড়াশোনা করবে।

✓ ৯ হাজার বর্গফুটের বিশাল এই স্কুল সবাইকে অবাক করে দিয়েছে।


ভারতের রাজস্থানের তপ্ত মরুর বুকে এক আশ্চর্য, বিশাল ও শীতল স্কুল বানিয়ে দিলেন আমেরিকান নিউইয়র্কের স্থপতি দম্পতি মাইকেল কেল্লগ ও ডায়ানা। এ কোনো রূপকথার কল্পকাহিনী নয়।রাজস্হানের শিক্ষার ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।


যে দিকে দু’চোখ যায় শুধু বালি আর বালি। গরম হাওয়া চারিদিকে। তার মাঝেই চলছে পড়াশোনা। মরুভূমির মাঝে স্কুল! ব্যাপারটি কখনও ভাবতে পারেন! কল্পনাতীত হলেও সত্য,বাস্তবেও রয়েছে এমনই এক স্কুল।


ডিম্বাকার বিশাল বাড়িটার চারিধার কেল্লার মতো পরিখা দিয়ে ঘেরা। ঠিক যেন সোনার কেল্লা।আর এই সোনার কেল্লার মতো পরিখার মধ্যেই গড়া হয়েছে এক স্কুল। এক ঝলক দেখলে মনে হয় সোনার কেল্লা! সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লা ছিল রাজরাজরাদের বাস।আর এটি কেল্লা নয়,এটা আস্ত একটা স্কুল।


স্কুলটিতে বিজ্ঞানের ব্যবহার এমনভাবে করা হয়েছে যে, খোলামেলা পরিবেশে পড়াশোনা করেও গরম হাওয়াকে সহজেই উপেক্ষা করা যায়। তাও আবার কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ছাড়াই ।


সোনার শহর জয়সলমির, জয়পুর বা যোধপুরের মতো রঙ করা নয়,সবকিছুই স্যাণ্ডস্টোন দিয়ে তৈরি। হালকা সোনালি হলুদ বেলে পাথরের কারুকার্য। জয়সলমির শহরের কাছে কানোই গ্রামে হলুদ রঙের বেলে পাথরে দিয়েই স্কুলটি নির্মাণ করেছেন মার্কিন স্হপতিরা। পুরো স্কুলটি ঝলসানো রোদ আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে পুরোপুরি সুরক্ষিত।


রাজস্থানের থর মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছে বালিপাথরের তৈরি এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অবকাঠামো। মরুভূমির মাঝে এই অবকাঠামো দেখে যে কেউ বিস্মিত হতে পারেন।


√ স্কুলটি আসলে মেয়েদের একটি স্কুল ।

√ স্কুলটির নাম রাজকুমারী রত্নাবতী গার্লস স্কুল।

√ স্কুলটি কিন্ডারগার্টেন থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত।

√ স্কুলটি স্থানীয় হলুদ বালিপাথর দিয়ে তৈরি করা

হয়েছে।

√স্কুলটা দেখলেই মনে হবে এ যেন কোনো ঐতিহাসিক স্থাপত্য।


এই স্কুলের ছাত্রীদের পোশাক ডিজাইন করেছেন বিখ্যাত ডিজাইনার সব্যসাচী মুখোপাধ্যায়। তাঁর সেলাই করা পোশাক পরেই ছাত্রীরা স্কুলে যাবে।

এই স্কুলে সবটাই বিনামূল্য পাবে গ্রামের মেয়েরা।


স্কুলটিতে কোন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র‌ও নেই।

তা সত্ত্বেও বাইরের এবং ভিতরের তাপমাত্রার আকাশ-পাতাল পার্থক্য। স্কুল ক্যাম্পাসের ভিতরের মাঠে পড়ুয়ারা নিশ্চিন্তে খেলাধুলোও করতে পারবে।


২০১৪ সালে এই স্থপতি দম্পতি রাজস্থানে ঘুরতে এসে এখানকার স্থাপত্য-ভাস্কর্যের প্রেমে পড়ে যান,একই সঙ্গে এখানকার মেয়েদের অশিক্ষা, কুসংস্কার তাঁদের কে বিচলিত করে।বিখ্যাত ব্লগার-আর্কিটেট ডায়না তখনই ঠিক করেন,এখানে এমন কিছু একটা বানাবেন যা এই জায়গাটাকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরে। পাশাপাশি রাজস্থানের দুর্গম এই গ্রামে মহিলাদের শিক্ষার হারও তলানিতে দেখে তিনি ঠিক করেন একটি গার্লস স্কুল‌ই করবেন।


স্কুলটিকে তৈরি করেছে আমেরিকার অলাভজনক একটি বেসরকারি সংস্থা। অনেক খুঁজে রাজস্থানের থর মরুভূমির এই জায়গাটিকে চিহ্নিত করে ওই সংস্থা।২০১০ সালে প্রথম এ রকম একটি স্কুল তৈরির পরিকল্পনা করেন ওই সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল দৌবে। কিন্তু তখন সেটা সম্ভব হয়নি। এজন্যই

তিনি তার জন্য দীর্ঘ সময় রাজস্থানে কাটিয়েছেন। সেখানকার সংস্কৃতি, পরিবেশ গভীরভাবে বুঝেছেন।


এলাকার রাজনৈতিক নেতা এবং সরকারি স্তরের অনেক আলাপ-আলোচনার পরই এই স্কুলের অনুমতি পান তিনি।


এই অঞ্চলের বেশিরভাগ ছেলেমেয়েরাই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। তবে মেয়েদের শিক্ষার হার একেবারে তলানিতে। সেই অবস্থা কাছ থেকে উপলব্ধি করার পর মাইকেল চেয়েছিলেন এমন একটি স্কুল করতে যা সারা ভারতে নজির তৈরি করবে।


√ যে স্কুলে ভর্তি হলে গর্ববোধ করবেন অভিভাবকেরা।

√ যে স্কুল শুধুমাত্র পুঁথিগত বিদ্যাই দেবে না বরং এই অঞ্চলের সংস্কৃতিকেও তুলে ধরবে।


সিআইটিটিএ-র কর্ণধার মাইকেল ডৌবে বলেছেন, এখানে যে গরিব ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে আসে তাদের অনেকেরই বাবা বা আত্মীয়রা পাথরের কাজ করেন। তাঁরাই হলুদ বেলেপাথরের জোগান দিয়েছেন। মার্কিন স্থপতিদের নকশা করা ভবনে স্থানীয় ভাস্করদেরই পরিশ্রম মিশে আছে।পাথরের পর পাথর গেঁথে ৯ হাজার বর্গফুটের বিশাল স্কুলবাড়ি তৈরি করেছেন তাঁরাই।


ডায়না নিজে এই স্কুলের পরিকল্পনা থেকে নকশা,

সব নিজে হাতে তৈরি করেছেন।এই স্কুলের রূপকার ডায়না কেল্লগ ও আমেরিকার আর্কিটেক্টের স্থপতিরা।বেলেপাথর দিয়েই মরভূমির বুকে এই স্কুল বানিয়েছেন সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থপিতরা।পাথরের ওপর, পাশে পাথর গেঁথে ৯ হাজার বর্গফুটের বিশাল এই স্কুল বাড়িটি তৈরি করেছেন। নিউইয়র্কের এক দম্পতির পরিকল্পনা ও রূপায়নের সৌজন্যে থর মরুর বুকে এই স্কুল এখন গোটা দুনিয়ার নজর কাড়ছে।


” Rajkumari Ratnavati Girl’s School an architectural marvel will serve more than 400 girls, from kindergarten to class 10, from below the poverty line residing in the mystic Thar Desert region of Jaisalmer in Rajasthan, India. The girls’ uniforms are designed by Sabyasachi.” pic.twitter.com/6O1AguMeCy


— Harsh Goenka (@hvgoenka)


তাই তিনি থর মরভূমির মাঝে স্থাপত্য কীর্তির অদ্ভূত নির্দশন রাখা এই স্কুল তৈরি করবেন বলে ঠিক করেন। ২০১৮ সালের অক্টোবরে এই স্কুল তৈরি শুরু হয়। এত বড় একটা স্কুল শেষ হতে লাগে মাত্র বছরখানেকের মতো। জয়সালমীরে সব কিছুই স্যান্ডস্টোন বা বালির পাথর দিয়ে তৈরি। সেই শহরেই মরুর বুকে আছে এক অবাক করা হলুদ বেলেপাথরের এই স্কুল।


স্কুলটি ডিম্বাকার।চারদিক দিয়ে ঘেরা স্কুলের মাঝখানে ফাঁকা খেলার মাঠ। ছাদে এবং মাঠের উপর অর্থাৎ পুরো স্কুল ক্যাম্পাস জুড়েই রয়েছে সোলার প্যানেল। একদিকে যেমন এই সোলার প্যানেল বিদ্যুতের জোগান দেয় তেমন মাঠে ছায়া দেয়।যার নীচে নিশ্চিন্তে খেলতে পারবে পড়ুয়ারা।


বালিপাথর দিয়ে স্কুলটি তৈরি করায় কার্বন অনেক কম নির্গত হয়। ফলে স্কুল এবং স্কুলের আশেপাশের পরিবেশ তুলনামূলক অনেক ঠান্ডা। প্রাকৃতিক নিয়মে মরুভূমি রাতে ঠান্ডা এবং দিনে গরম হয়ে যায়।তাই স্কুলের গঠন এমনভাবে করা হয়েছে যাতে রাতের ঠান্ডা হাওয়া দিনভর স্কুলের ভিতরে আটকে থাকে। ফলে বাইরের থেকে অনেকটাই আলাদা স্কুলের ভিতরের তাপমাত্রা।


স্কুলের ভিতরের দেওয়াল চুন দিয়ে প্লাস্টার করা। এটিও ইনসুলেটরের কাজ করে। ফলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ছাড়াই স্কুলের ভিতরের পরিবেশ তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে।


স্কুলটির বাইরের দিকের দেওয়ালে কোনও জানলা নেই। সমস্ত জানলাই ভিতরের মাঠের দিকে। তাই হাওয়ার সঙ্গে বালি উড়ে স্কুলের ভিতরে ঢোকার উপায় নেই।


√ ২০১৮ সালে স্কুল তৈরির কাজ শুরু হয়।

√ ১ বছরের মধ্যেই সেটি সম্পূর্ণ হয়ে যায়।

√ এই স্কুলটিকে পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা হয়েছে।


অন্তহীন বালির সমুদ্রের মাঝে এই স্কুল তৈরি হলেও হলুদ বেলেপাথরের কারণে স্কুলবাড়ির ভেতরটা বেশ ঠান্ডা। বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা আছে। বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে, যেখান থেকে সৌরবিদ্যুতে আলো, পাখা সব চলে। ডায়ানা বলেছেন, জিওথার্মাল এনার্জি সিস্টেমে দিনের বেলা স্কুলের ভেতরটা ঠান্ডা থাকে, রাতের বেলা যখন বালির রাজ্যে হিমশীতল ঠান্ডা নামে, তখন স্কুলের ভেতরের পরিবেশ আরামদায়ক থাকে। স্কুলবাড়ির নির্মাণের দায়িত্বে থাকা করিম খান বলেছেন, ৩.৫ লক্ষ লিটার জল স্কুল বাড়ির ভেতরেই সংরক্ষণ করে রাখা আছে। তাছাড়া বৃষ্টির জল ধরে রাখার ব্যবস্থাও আছে। স্কুলের প্রতিটা ঘরে ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা আছে। দিনের বেলা প্রখর রোদে শিশুদের কষ্ট পেতে হবে না।


এই স্কুলের নকশা জয়সালমীরের পুরনো দুর্গগুলির ঢঙেই তৈরি হয়েছে। তবে তার সঙ্গে আছে আধুনিকতার ছোঁয়া। কিন্তু মরভূমির ৫০ ডিগ্রি গরমের মাঝে গরমে কি স্কুল সম্ভব? স্কুলে কিন্তু কোনো এয়ার কন্ডিশনার বসানো নেই। তারপরেও খুব আরামেই সবাই ক্লাস করতে পারবে। কিন্তু কী করে?


থর মরুভূমির মাঝখানে পড়াশোনা করবে বাচ্চারা, যেখানে দিনের তাপমাত্রা প্রায় 50 ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি এবং উষ্ণ বাতাস বয়ে যাওয়ার কারণে দিনের বেলা স্বাভাবিক জীবন অচল। কিন্তু স্থাপত্য কৌশলের কারণে শিক্ষার্থীরা তা টেরই পাবে না।


জয়সলমিরের বিখ্যাত স্যাম ডুনেস থেকে মাত্র ছয় মিনিটের দূরে অবস্থিত একটি বিস্ময়কর স্থাপত্য !

বিস্ময়টি মেয়েদের শিক্ষিত করতে এবং তাদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যেই কানোই গ্রাম এরূপ নিয়েছে।


বেলেপাথর দিয়ে বানানোর ফলে তাপমাত্রাজনিত কোনও সমস্যা এখানে হয় না। রাতে বালির দেশে কনকনে ঠান্ডা দিয়ে কাবু করে দেয়,সেই ঠান্ডাও স্কুলে এসে জব্দ করে পারে না।


ছাত্রীদের যাতে প্রখর রোদে কষ্ট না হয় তার জন্য আছে বিশেষ ধরনের ভেন্টিলেশানের ব্যবস্থা।মরুভূমির ধুলো ঝড় থেকে রক্ষা করতে আছে বিশেষ পাঁচিলের ব্যবস্থাও।কাউকে দুর্গম এই প্রান্তে জলের কষ্ট পেতে হয় না। কারণ স্কুলের ভিতরেই রয়েছে

৩.৫ লক্ষ লিটার জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা।পাশাপাশি বিশেষ উপায়ে বৃষ্টির জল ধরে রাখার ব্যবস্থাও আছে।


কমপ্লেক্সটিতে একটি টেক্সটাইল যাদুঘর এবং পারফরম্যান্স হলের পাশাপাশি কারিগরদের

কারুশিল্প বিক্রয় করার জন্য একটি প্রদর্শনীর

স্থানও রয়েছে।

অন্য একটি বিল্ডিংয়ে নারীরা মরা হস্তশিল্প সংরক্ষণের জন্য বুনন এবং টেক্সটাইলের মতো traditional ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলার প্রশিক্ষণ পান।প্রশিক্ষণের পাশাপাশি এখানে স্থানীয় মহিলাদের হাতের কাজসহ নানা জিনিস প্রদর্শিত হয়।


সিআইটিটিএ-র একটি অলাভজনক সংস্থা প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল ডাউবের ভবনের ধারণাটি তৈরি করতে এবং এটি বাস্তবায়নে সহায়তা করতে এক বছর লেগেছে। মাইকেল আমেরিকা ভিত্তিক স্থপতি ডায়ানা‌ কেলোগের সাথে যুক্ত,যিনি নকশাটি কল্পনা ও করেছিলেন।


এক অসাধারণ মানবিক ভাবনার ফসল এই স্কুল। বিশাল মরুভূমির মধ্যে এমন একটা স্কুল তৈরি হয়েছে যার নান্দনিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করবে গোটা বিশ্বকে।


কি কি আছে এই স্কুলে ! আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষার সব রকমের ব্যবস্হা এখানে রয়েছে।আছে অডিটোরিয়াম,মিউজিয়াম,জ্ঞান সেন্টার,হস্তশিল্পের হাব,বিনোদন কেন্দ্র,ক্যান্টিন,গেস্টহাউস,শিক্ষকদের আবাসন,লাইব্রেরি,জলসংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা। সত্যিই সার্থক হয়েছে পশ্চিমের সাথে প্রাচ্যের অপূর্ব মেলবন্ধন।


তবে পুরোপুরি তৈরি হয়ে গেলেও স্কুলটিতে এখনও

সে ভাবে পড়াশোনা চালু করা যায়নি মহামারির কারণে।করোনা সংক্রমণের জন্য স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে।চলতি বছরেই শুরু করা যাবে বলে আশাবাদী মাইকেল।

তথ্যসূত্র :

ABP Pvt. Ltd.Asianet News Bangla provatferi.com.জি নিউজ,বিটিসি আন্তর্জাতিক ডেস্ক।

 

Post a Comment