যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

সুমিত মোদক

 


আমি , আমার মেয়ে , রবীন্দ্রনাথ ও গীতবিতান

সুমিত মোদক
মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট হল । স্কুল থেকে ডাক এলো । একদিন ঘটা করে হাতে তুলে দিলো একটা মিষ্টির প্যাকেট আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতবিতান । সেরাতে পড়ে ফেলেছিলাম অর্ধেকেরও বেশি । বুঝে এবং না বুঝে । তবে সে রাতে ভিতর থেকে বারবার গুনগুন করেছিল – ” আনন্দধারা বহিছে ভূবনে … ”
পড়াশোনার এখানেই ইতি । গ্রামের এক অভাবি বাড়ির মেয়ে । মাধ্যমিক পাস যথেষ্ট । আজকাল পাত্রপক্ষ একটা পাশ খোঁজে । সে কারণে বাবাও চেয়েছিল একটা পাশ ।
বিয়ে দেওয়ার প্রথম সোপান । আর পড়তে না পারার যন্ত্রনা যে হয়নি তা নয় । মাঝেমধ্যে গীতবিতানটা বুকে চেপে চোখের জল মুছেছি । কন্ঠ থেকে বেরিয়ে এসেছে – ” দুঃখের তিমিরে যদি জ্বলে তব মঙ্গল আলো / তবে তাই হোক … ”
বসন্ত আসে বসন্ত যায় । যে পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর গল্প । খড়ের চালে পচন ধরে । সে বাড়ির মেয়ে কনে সাজবে কিভাবে !পাড়াতে গুঞ্জন । কানাঘুষো আষাঢ়ে গল্প । কোনদিন কেউ দেখল না । বাপটা কিভাবে একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছে । শেষ হয়ে যাচ্ছে ভিতর ও বাহিরে । যখন বিদ্রুপ কানে আসে , মনে হয় শেষ করে দিই নিজেকে । কিন্তু পারিনি । বার বার টেনে এনেছে গীতবিতান তার বুকে ।সান্ত্বনা দিয়েছে । দিয়েছে বাঁচার স্বপ্ন । বুক ভরা গান – ” ও নিঠুর , আরো কি গান তোমার তুনে আছে … ”
কনে দেখা আলোতে অনেকে দেখেছে । কিন্তু কেউ কনে করে নিয়ে যেতে রাজি নয় । কারণ একটাই । পণের টাকা । কারোর দাবি মতো টাকা জোগাড় করতে পারেনি । কি করে পারবে ! যে মানুষটা দিন আনে দিন খায় । সে মানুষটা পণের টাকা পাবে কোথায় ! সেদিন গুলিতে মনে পড়ছিল রবি ঠাকুরের নিরুপমার কথা । তাই কন্ঠ থেকে বেরিয়ে আসত – ” এই করেছ ভালো ,নিঠুর হে , নিঠুর হে , / এই করেছ ভালো … ”
একদিন বড় মাসিমনি এক সম্বন্ধ আনলো ।পাত্রপক্ষের কোন দাবি-দাওয়া নেই । কেবল দেখতে ভালো মেয়ে হলেই চলবে । দেখতে মন্দ ছিলাম না । আঠারো-ঊনিশের যুবতী মেয়ে যেমনটি হয় । পাত্রপক্ষ পছন্দ করলো । বাবা ধারদেনা করে বিয়ে দিল । সে সময় মনে হয়েছিল ছোটবেলার সেই রূপকথার রাজপুত্তুর । অহংকার নেই । কি মিষ্টি কথা বলে । কি মিষ্টি স্বভাব একেবারে দেবদূত ।
সিঁথিতে সিঁদুর রাঙিয়ে মুক্তি দিল । মুক্তি দিল বাবাকে । একটা কন্যা দায়গ্রস্ত পরিবারকে ।মাটির ভাঙা ঘরে থেকে ইটের দোতলা বাড়ি ।ইলেকট্রিকে আলো জ্বলে । মাথার উপর পাখা ঘরে । সে যেন এক নতুন পৃথিবী । ফুলশয্যার রাতে গেয়ে ছিলাম – ” আঁধার রজনী পোহালো , জগত পুরিল পুলকে … ”
মাস ঘুরতে না ঘুরতে বুঝলাম । স্বামী পুরুষটা ওর বৌদির সঙ্গে । কোনো প্রতিবাদ করতে পারিনি । কেবল রাতের পর রাত বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেছি । আর বুকে চেপে ধরেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতবিতান । কন্ঠ থেকে বেরিয়ে এসেছে – ” ছি ছি , মরি লাজে , মরি লাজে … ”
দিন যায় । মাস যায় । পেটেরটা নড়াচড়া করে ।ভালোবাসায় লালিত হৃস্পন্দন । ন মাসে মা কাকিমারা স্বাদ দিল । এতদিনে ভুলতে চেষ্টা করেছি একাকী বিছানায় । একাকী জীবন । এই ন মাসে নতুন করে বাঁচতে চেয়েছি । আগামীকে আঁকড়ে । রাতের পর রাত তাকে গুন গুন করে শুনিয়েছি – খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি আমার মনের ভিতর …
সে গানে সে শান্ত হয়েছে । দেখতে চেয়েছে পৃথিবীর আলো । মায়ের কাছে মা হতে আসা । সেই যে আসা আর যাওয়া হয়নি বাড়ি । আঁতুড় ঘরে সন্তানের মুখ দেখা ।। এত সুখ , এত আনন্দ আগে পাইনি । অথচ সেই সন্তানের মুখ দেখল না তার বাবা । কারণ সে মেয়ে বলে । মেয়েদের এ পৃথিবীতে জন্মানো যে অন্যাযের । মেয়েকে নিয়ে বাড়িতে যেতে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল ।মেয়ের বাপ । আমার জা । আমি নাকি নষ্টা ।চরিত্রহীন । মিথ্যা অপবাদ নিয়ে ফিরে এসেছিলাম মার কাছে । বাপের বাড়ি । সেদিন বুকের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছিল – ” চিরসখা ছেড়ো না মোরে ছেড়ো না … ”
অভাবের সংসারে আবার আমরা দুজন । মা-মেয়ে । কদিন বা ওদের বোঝা হয়ে থাকা যায় ।সংসারের হাল ধরতে ছোট ভাই দুটো স্কুল ছাড়ল । ঢুকল ওপেন কারখানায় । মেয়েটা ছমাস হতে না হতে আমি ঢুকে পড়লাম । এখানে অনেক মেয়ে । অনেক জীবন । এত জীবনের মাঝে নিজের জীবনটাকে ফিরে দেখা আর হয়ে ওঠেনি । সারাটা দিন বুকের শিশুটাকে আগলে রাখে আমার মা । রাতটুকু আমার আর আমার মেয়ের । রাতটুকু আমাদের আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের । গীতবিতানে কখন আমরা এক হয়ে যেতাম বুঝতে পারতাম না । চারিদিকে কেবল সুর আর সুখ । প্রতিধ্বনি হতে থাকে – “আজি বহিছে বসন্ত পাবন সুন্দর তোমারি সগন্ধ … ”
আমার মেয়ে , আমার স্বপ্ন , আমার ছন্দ । সে স্বপ্ন ও ছন্দ দিয়েছে এ জীবনে গীতবিতান ।নতুন একটা গীতবিতান কিনে দিলাম সে যখন মাধ্যমিক পাস করে । সে গীতবিতান বুকে জড়িয়ে ধরে গেয়ে ওঠে – ” আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে / এ জীবন পুণ্য কর দহন দানে … ”
নিরবে ভিজে যেতে থাকে দুজনের চোখের পাতা ।

Post a Comment