যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

সুমনা চক্রবর্তী

 


ধারাবাহিক গল্প // সুমনা চক্রবর্তী // মেঘের দেশে // (পর্ব -১)

সামনের সিকিমের পাহাড়টা দেখে নিয়ে ঠিক তার বাঁদিক থেকে সাগরমাথার ছবিটা তুলে নিল আবিরা। একসাথে সে তিন চারটে ক্লিক করে। তারপর ভালো ছবিটাকে নির্বাচন করে। কোনও পেশাদার চিত্রগ্রাহক সে নয়। নিছক ভালো লাগে বলে নিজের চেষ্টায় একটু পড়াশোনা করে নিয়ে তবে সে এই ছবি নিতে শুরু করেছে। তবে, পরিযায়ী পাখির মতো ঘুরে বেড়ানোটা তার কাছে বেশি প্রিয়। টুপিটা একটু আগুপিছু করে সে মন দিয়ে ছবিগুলো দেখছিল। খুব বেশি হলে দশ সেকেন্ড হবে, এরই মধ্যে সামনে তাকাতেই সাদা ধোঁয়ার মতো মেঘ ডানা মেলে ভেসে বেড়াতে থাকল। আবিরা মুখে একটা বিরক্তি আনতেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির চালক বলল, “ সব লাক আছে ম্যাদামজি, যা পেলেন তাই নিয়ে মজা করুন। দুপুরে ফির দেখবেন”।
আবিরার কথাটা পছন্দ হল। তারা এখানে এসেছে সকাল দশটা নাগাদ। জলখাবার খেয়ে আশপাশটা ঘুরে ছবি তুলতে শুরু করেছিল সে। হাতে আজ পুরো দিন আর সাথে কাল সকাল। এর মধ্যে আবার সাগরমাথার দেখা সে পাবেই। পাহাড়ে বেশ কিছু জনগোষ্ঠী আছে, যারা কাঞ্চনজঙ্ঘা কে সাগারমাথা বলে। নেপালিরা ঐ নামে ডাকে বলে এরাও তাই বলে। অনেকদিন ধরে পাহাড়ের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে সে এই জনগোষ্ঠীর অনেক কথাই জেনেছে। এই যেমন তার গাড়ির চালক থাকে এখান থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার নীচে। ওখান থেকে কিন্তু মোটেই কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখা যায় না। চালক নিজেও বলতে পারেনি ওখানে যে পাহাড়টা ওরা রোজ দেখতে পায়, তার নাম। আবিরা চেষ্টা করেছিল নেট দুনিয়া ঘেঁটে সে নাম খোঁজার। মজার ব্যাপার হল, এই যে তারা এখন সিমান্দারা তে আছে, তার ঠিক এক কিলোমিটার আগে থেকে ম্যাপ সাদা। কোনও নিশানা নেই। এই অংশ থেকে হাতে এঁকে বা স্মৃতিতে ভর করে চলতে হবে। এই যে তারা তামাংজির বাড়িতে উঠেছে এর সামনে দিয়ে সোজা পাঁচ কিলোমিটার গেলে আপার পেদং। তার ম্যাপ দিব্যি পাওয়া যাবে। মনে মনে একটু হেসে নিল আবিরা। এইরকম জীবনই তো বেশ, যেখানে প্রতিমুহূর্তে নতুনকে জানা যায়। এই যেমন এখানে এসে সে জানতে পারল এই অঞ্চলটা ক্যাসিওনে নামে পরিচিত। অথচ সে কারসিয়াং থেকে এখানে এসে যখন সেকথা এদের বোঝাতে গেল, তখন সবাই সেটা বুঝল ক্যাসিওনে। সে নিজেও তো এই নামটা জানত না। এক পাহাড়ের মানুষ অন্য পাহাড়ের খবর রাখে না। আর রাখবেই বা কেন? এরা সারাদিন চাষের কাজ, সবজির বাগান, অতিথি ভবনের অতিথি সেবা – এসব নিয়েই আছে। কি হবে অন্যের কথা খুঁজে? আবিরা সামনের ঢাল থেকে উঠে এলো ওপরের দিকে। তামাংজির অতিথিরা যেখানে বসে চা খায়, ঠিক তার পাশে শরীরটা হেলিয়ে রয়েছে গাড়ির চালক মঙ্গল। আঁতকে উঠে আবিরা বলল, “ আরে! কি করছ? পড়ে যাবে যে?”
হাতে কি যেন নিয়ে হাসিমুখে মঙ্গল উত্তর দিল, “ ইয়ে দেখিয়ে, ভিন্দি হ্যায়। খাবেন এর সবজি?”
আবিরা অবাক হয়ে দেখল মঙ্গলের হাতে ধরা জিনিসটাকে। এত বড় ঢ্যাঁড়শ সে আগে কখনও দ্যাখেনি। একেকটা তার হাতের তালুর দ্বিগুণ লম্বা আর ইয়া মোটা। তাছাড়া রঙটাও সবুজ নয়। হালকা সবুজের গা ঘেঁষে বেগুনি রঙ। ভারি সুন্দর তার গড়ন। সে মোহিত হয়ে বলল, “ আজ দুপুরে সবজি খাব”।
মঙ্গলও ঘাড় বেঁকিয়ে রান্নাঘরের দিকে মুখ করে বলল, “ খানা বানাও। খায়েগি ম্যাদামজি”। তারপর আবার টপাটপ কটা ঢ্যাঁড়শ ছিঁড়ে রান্নাঘরে দিয়ে এল।
আবিরার বেশ লাগছিল গাছগুলো দেখতে। তামাংজি নিজে হাতে গাছগুলো লাগিয়েছে। ফুল তো আছেই, তার সাথে নানারকম শাক, আলু, কাঁচা লঙ্কা, পেঁয়াজ, রসুন, লাউ, কুমড়ো আরও অনেক কিছু মজুত আছে। অতিথি ভালোভাবেই খেতে পাবে এদের কাছে। খাওদাও আর সামনে তাকিয়ে মাঝে মাঝে একবার কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখে নাও। জগতে এর চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে কি?

Post a Comment