যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

শম্পা সাহা

 


আমি_ননীবালা_পর্ব_৯ // #শম্পা_সাহা

সন্ধিপুজো ছিল এক মহাসমারোহের ব্যাপার ।সে এক দেখার মত জিনিস। একশো আটটা প্রদীপ জ্বালিয়ে ঠাকুরমশাই যখন তার জলদগম্ভীর স্বরে মন্ত্রোচ্চারণ করতেন ,সবাই হাত জোড় করে। চারিদিক নিস্তব্ধ ।মনে হত যেন মা স্বয়ং নেমে এসেছেন ওই মণ্ডপে ।
আমাদের গ্রামে হিন্দু মুসলমান বাছবিচার ছিল না।যেমন দুর্গাপুজোয় ফকির, মনিরুল,হালিম সবাই এসে ভোগ খেতো তেমনি বাবার,দাদুর অনেক মুসলমান ব্যবসায়ী বন্ধুরা ঈদে পৌঁছে দিত সেমাই ।তবে আমাদের গ্রামে আর্থিক অবস্থা পণ্য মুসলমানদের তুলনায় হিন্দুদের সংখ্যা একটু বেশি ছিল।
আমিনা চাচী ,মনিরুলের মা।নালার ধারেই ওদের বাড়ি ।আমাকে খুব স্নেহ করতেন। মাঝে মাঝে আমাকে কোলের কাছে বসিয়ে আদর করতেন। কখনো কখনো চিরুনি দিয়ে আমার পিঠ ছাপানো চুলে বেড়া বিনুনি, কলা বিনুনি বেঁধে দিতেন,আর তাতে লাল ফিতের ফুল।
আমরা বড় হওয়ার আগে পর্যন্ত ওদের সঙ্গে সারাদিন হৈ-হুল্লোড়, ঝাঁপ দিয়ে নালায় পড়া, সাঁতরে পার হওয়া, ইচিং বিচিং, কড়ি খেলা, কানামাছি, গোল্লাছুট, আর ছিল ডাংগুলি। ছেলেরা অবশ্য লাটিম ঘোরাতো।ওদের দেখে আমি দু চার বার লেত্তি হাতে ঘোরাবার চেষ্টা করেছিলাম, পারি নাই ।উল্টো ঠাকুমা জানতে পেরে পাঁচবার গাল পেরেছিল
-ডাংকু,অলাক্ষ্মী
এইসব ।কিন্তু তবুও ছেলেবেলার খেলাধুলোর মজার কাছে এসব কথা কিছু মনে হত না।
সন্ধ্যে নামতে না নামতেই চারিপাশে যেন সব ভূত পেত্নীরা নেবে আসতো। যেখানে যত গল্প শুনতাম ভয়ের, গা ছমছম করা। দিনের বেলায় সেগুলোকে মোটেই পাত্তা দিতাম না ।কিন্তু রাত হতে না হতেই সবগুলোই সত্যি হয়ে যেন নেমে আসতো। সূর্য ডোবার কিছুক্ষণের মধ্যেই খাওয়া-দাওয়া সেরে বিছানায় সেঁধোতাম সবকটা। তারপর হুটোপুটি, মারামারি
– মা দেখো পুতুল আমার বেণী খুলে দিল
-সতীশ আমাকে মেরেছে
ঘুমোবার আগে যেন কুস্তির আখরা আমাদের শোবার ঘর।
কোনদিন মা, কোনদিন কাকির দায়িত্ব ছিল আমাদের ঘুম পাড়াবার ।তবে বেশিরভাগ দিনই কাকি আসতো ঘুম পাড়াতে।ঘুম পাড়ানো আর কি? গরমে সবচেয়ে ছোট যে তাকে পাখার বাতাস করা। আমরা পাশাপাশি যেটুকু পেতাম তাই সই। আর নালার দিক থেকে ,আশপাশের গাছগাছালি থেকে ঠান্ডা বাতাস আসায়, খুব একটা গরম লাগতো না।
কাকি এক হাতে হাওয়া করত আর অন্য হাতে থাবড়ে থাবড়ে ঘুম পাড়াতো কুমুদকে। কুমুদ কাকির কোল পোছা মেয়ে ।আমাদের সক্কলের ছোট। ওর গায়ে থাবড় পরতো আর তালে-তালে যেন আমাদেরও ঘুমের একটা ছন্দ এসে যেত।
ঠাকুমা রান্নাঘরে কুপি জ্বেলে বসে ।জেঠিমা আর মা মিলে বাড়ির বড়দের খেতে দিচ্ছে। দিনের বেলার মত কিন্তু রাতের বেলায় সব থেকে আগে বড়দের নয়, সবচেয়ে আগে ছিল ছোটদের খাবার পালা।তা না হলে আবার কেউ কেউ ঘুমে ঢুলে পড়লে, খাওয়ানো মুশকিল হয়ে পড়বে।রান্নাঘরে হারিকেন নয় কুপি মানে লম্ফো।
আমাদের শোবার ঘরের এক কোণে হারিকেন, একেবারে কমিয়ে নিভু নিভু করা। ওটা সারা রাতই জ্বলতো।
রাতে কারো বের হওয়ার দরকার হলে, ভয় যেন প্রাণ বেরিয়ে যেত। জানালার বাইরে ভয়ে তাকাতাম না, মনে হত এই পেত্নী, শাঁকচুন্নী লম্বা হাত বাড়িয়ে ঘাড় মটকে দেবে মট্ করে।
কাকি মাঝে মাঝে রাজপুত্তুরের গল্প বলতো।সব গল্পের রাজকন্যা বিপদে পড়লে রাজপুত্তুরই তাকে রক্ষা করত ।একদিন কাকিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম
-আচ্ছা কাকি সবসময় রাজপুত্তুর কেন রাজকন্যাকে রক্ষা করে? রাজকন্যা কি নিজেকে রক্ষা করতে পারে না?
– ননীরে, মেয়ে মানুষের গায়ে কি অত শক্তি আছে?
আমি মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলাম আর কি!
একদিন ভীমকে মেরে কাদায় ফেলে দিয়েছিলাম। ও ও তো ছেলে! তাহলে?
ভীম আমাদের গাঁয়ের ছেলে। খুব বড় বড় ভাবসাব। তখন সব ছেলেরাই ধুতি পরতো।একটা ধুতি মালকোঁচা মেরে পরে,গোদা পটকা মাছের মতো শরীর নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। আর ফি বছর পরীক্ষায় লাড্ডু পেত ।কিন্তু পাঠশালায় পড়তে যেত বলে খুব লবাব ভাবতো নিজেকে। গায়ের জোরে সব সময় সবার উপর মাতব্বরি খাটাতো। রাজা রাজা খেলার সময় ও রাজা হবে। জাম্বুরা নিয়ে খেলার সময় জাম্বুরার বদলে পায়ে লাথি মেরে পা ফুলিয়ে দেবে। ছোট ছেলেরা মাছ ধরতে গেলে ছিপ ভেঙে দেবে। এইসব নানান কিত্তি!
একদিন আমরা সব ভাইবোন মিলে মাছ ধরছি নালায়। দু-একটা জেলে নৌকা,ডোঙা ভেসে যাচ্ছে সামনে দিয়ে।সে সময় যাতায়াতের প্রধান ব্যবস্থাই ছিল জল। নৌকা করে সবাই এদিক ওদিক যেত আর স্থলপথে গরুর গাড়ি। ঘোড়ার গাড়ি সে সময় শহরে পাওয়া গেলেও আমাদের গাঁ গঞ্জে ছিল না। ওই গরুর গাড়ির থেকে নৌকাতে অনেক তাড়াতাড়ি গন্তব্যে পৌঁছানো যেতো। বাবা,কাকারা শহরে গেলে বাড়ির সামনের নালা দিয়েই নৌকাতে উঠতো। নালা হলে কি? আগেই বলেছি তার তেজ ছোট নদীর চেয়ে কিছু কম ছিল না !
আমরা ছিপ ফেলে বসে। দূরে নৌকা যাচ্ছে। কোনোটাতে চাল বা মালপত্র, গুঁড়ের জালা, মাটির হাঁড়ি বোঝাই করে গঞ্জের হাটে যাচ্ছে বেচতে।ব্যবসায়ীদের দল আবার হাট সেরে সন্ধ্যে সন্ধ্যে বাড়ি ফিরবে। রোদ আছে তবে গায়ে বাধে না।
দু পাশে সবুজ আর সবুজ ।আমরা দলবলেরা ছচির একটু কাছাকাছি ।ওই জায়গায় ঝোপঝাড় গাছগাছালির আধিক্যের জন্য নিচে অন্ধকার ।তাই শ্যাওলাও বেশি আর মাছও । পাশে রাখা একটা পুরনো দইয়ের পাতিলে মাছ ধরে ধরে রাখা হচ্ছে। আমরা সবাই এক সাথে।এ আমাদের এক খেলা।
ভীম কোথা থেকে এসে সতীশ কে দিল এক ঠ্যালা। হঠাৎ ঠ্যালায় বেচারা চমকে গেছে। আর হাত থেকে ছিপ একেবারে জলে। কি আবদার? সতীশের জায়গায় ও বসবে ।সতীশ কি একটা বলতে গেলে -হালার পো হালা
বলে আবার দিয়েছে সতীশকে আরেক ঠ্যালা।বাকি ভাইয়েরা ভয়ে দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে। সতীশ কাদায় মাখামাখি। ধুতি একেবারে ভিজে একাকার। যদিও চান করবে তবে ওর এত সাহস কি করে হয়?যে আমার ভাইয়ের গায়ে হাত তুলবে!
আমি আর পুতুল পাড়ের এক কোনায় বসে।আমি একটা চোরকাঁটার শিস্ চিবুচ্ছিলাম আপন-মনে। পুতুল হাতে একটা মাটির বউ পুতুল নিয়ে খেলছে।সে সময় পুতুল আমরা নিজেরাই বানাতাম।
ভাইয়ের এই হেনস্থা দেখে রাগে আমার মাথায় আগুন জ্বলে গেল। দিলাম ভীমকে এক ধাক্কা ।ও চেহারায় বড় হলে কি ?অতর্কিত হামলা সামলাতে না পেরে একেবারে সোজা পাড়ের কাদায়। আমি নীতিশের হাতের ছিপটা কেড়ে নিয়ে সপাসপ বসিয়ে দিয়েছি ভীমের ঘাড়ে, হাতে ,পিঠে ।বেচারার গায়ে লাল লাল, দাগড়া ,দাগড়া হয়ে ফুলে উঠেছিল। কিন্তু মেয়েছেলের হাতে মার খেয়েছে বলে কাউকে বলার সাহস হয়নি ।খালি আমাকে
-কাউয়া, কাইল্লা, কেল্টি
বলে গাল পেড়ে কাদা লটপট ধুতি নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পগারপার ।
কাকি কেন ?সেখানে উপস্থিত আমার ভাইবোনেরা আর ভুক্তভোগী ভীম ছাড়া কাকপক্ষীও জানে না সেদিনের ঘটনা আর এই সত্যিটা যে সব সময় রাজপুত্র রাজকন্যা কে রক্ষা করে না কখনো কখনো উল্টোটাও হয়।
ক্রমশ……

Post a Comment