যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

মৈত্রেয়ী সিংহরায়

 


সাদা পাতার সঙ্গে সখ্যতা // মৈত্রেয়ী সিংহরায় // 1৬.0৮.২০২১

বাড়ির পাশেই বড় দীঘি। ইব্রাহিম প্রতিদিন পূর্ব কোণ লাল হয়ে ওঠার আগেই দীঘির পাড়ে বসে একমনে ফ্লুট বাজায়। দীঘির পাড়,জল, মাঠ, ঘাট যেন ওই সুরের ভিতর হাহাকার করে। একটা আধো অন্ধকার মনখারাপের আবেশ থাকলেও চাদর সরিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে শ্বেতা। নিজের এই সামান্য জীবনের বেঁচে থাকার গন্ডীর মধ্যে
কার না ইচ্ছে করে একটু সাফল্যের স্বাদ পেতে বা একটু সার্থকতার রং লাগাতে। তাছাড়া সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তো বলেছিলেন সাদা পাতার সামনে গিয়ে রোজ একবার বসতেই হবে। লেখা আসুক আর না আসুক। এতগুলো বছর ধরে নিজের এই ধৈর্য্য দেখে নিজেই অবাক হয়ে যায় শ্বেতা। শ্রম, নিষ্ঠা, সময়, মনোযোগ কোনটাই কম খরচ করে না তবুও ধারাবাহিক ব্যর্থতা। বারবার খালি হাতে ফিরে আসার পরেও তৈরি হয় পরের বারের জন্য।
বাড়ির লোকেদের উঠতে এখনও অনেক দেরি আছে। সকাল থেকেই কাজের মেলা। সংসারের এক একজনের এক একরকম চাহিদা। তাড়াতাড়ি খাতা কলম নিয়ে বসে পড়ে ঘরের এককোণে। সেই নামী পত্রিকায় লেখা পাঠাতে হবে। কখন যে বেলা গড়িয়ে গেছে খেয়াল হয়নি। ছেলেটা
উঠে পড়তে বসে গেছে। এক কাপ চা পায়নি। কেমন এক পাপবোধে আচ্ছন্ন
হয়ে যায় সে। তাড়াতাড়ি দু’কাপ চা নিয়ে
ছেলের কাছে বসে। ছেলের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল শ্বেতা। এটা সেটা গল্প করতে করতে চা খায় দু’জনে। ছেলে যে মায়ের ওপর রাগ করেনি এটা টের পেয়ে মনটা প্রসন্ন হয়ে উঠল। ছেলে জিজ্ঞাসা করে
–কবিতা লিখলে?
শ্বেতা কেমন গুম মেরে গেল। বলে– হ্যাঁ ধারাবাহিক ব্যর্থতা অভ্যেস হয়ে গেছে। তবুও বালি দিয়ে দুর্গ বানানো শেষ হয় না। যেভাবে রোজ তোদের জন্য রান্না চাপাই, সংসার সামলাই ঠিক সেইভাবে বসি নতুন একটা কিছু লিখতে।
–কেন? তোমার কবিতা কি ওদের ভালো লাগছে না? –তুই কবিতা ভালোবাসিস? –হ্যাঁ পড়ি তো। কিছু বোধগম্য হয় কিছু হয়না।
–আমার লেখা কবিতা পড়েছিস কোনোদিন?
— হ্যাঁ, ফেসবুকে পোস্ট করো সেগুলো তো পড়ি। বেশ লাগে।
–কোনো গঠনমূলক সমালোচনা?
— আমি তো বিশেষ কিছু বুঝি না। তবে মনে হয় এমন লেখা লিখবে যে সকলে উপলব্ধি
করতে পারবে। তোমার লেখা পড়ার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলবে।
— বুঝেছি কবিতার শেকড়ে রস ঢালতে হবে।
— তা যারা বারবার তোমার লেখা প্রত্যাখ্যান
করছে তাদের বক্তব্য?
— কবিতার বক্তব্য সহজে বোধগম্য হবে না।প্রচলিত সহজ শব্দ দেওয়া চলবে না।
অভিধান দেখে শব্দ খুঁজে বসাতে হবে। কিন্তু
আমার তো প্রজাপতি লিখতেই বেশ লাগে।
খামোকা তিতলি লিখব কেন? আমি নাকি এখনো রবীন্দ্রনাথের যুগে পড়ে আছি। এইসব কথা আর কি!!!
আচ্ছা বেশ তুই পড়। বেলা হয়ে যাচ্ছে। এখনই নির্মল আসবে। ঠাকুমার বেডসোর ড্রেসিং করতে। আমি যাই ঠাকুমাকে রেডি করি।
— মা শোনো, একটা কথা বলব। রাগ করবে না?
—হ্যাঁ বল তাড়াতাড়ি।
—তুমি একবার কোনো বড় আধুনিক কবির লেখা একটা কবিতা নিজের নামে ওদের
কাছে পাঠাও। আর বারবার অনুরোধ করো
এই লেখাটা যেন ছাপায়। কি বলে একবার
দেখো না।
—-না না তোমার এইসব ছেলেমানুষী বুদ্ধি
ছেড়ে পড়াশুনা করো। আমি একটু পরে ব্রেকফাস্ট আনছি।
শাশুড়ি অনেক দিন হল বিছানায় পড়ে
আছেন। তাঁকে পরম যত্নে খাবার খাওয়াতে
খাওয়াতে ভাবে এই পৃথিবী কবেই বা সামান্যদের ছিল!! আমি যে সত্যিকারের ব্যর্থ একথা মেনে নেওয়ার মধ্যে তো কোনো
্যর্থতা নেই।
দুপুরে খাবার পর সবাই যখন একটু বিছানায় এলিয়ে পড়েছে শ্বেতা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষের কবিতা নিয়ে বসে। ভিজে চুল বিছানার উপর ছড়িয়ে দিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় পড়তে পড়তে ভাবে ছেলেটা মন্দ বলেনি। দেখাই যাক না একবার। যেমন ভাবা তেমন কাজ। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের একটি মোটামুটি জানা কবিতা শ্বেতা শুধুমাত্র পরীক্ষা করবার জন্য মেল করে এবং বারবার অনুরোধ করে এবার যেন তার কবিতাটি বিবেচনার মধ্যে রাখা হয়। এই বিষয়ে ছেলেকে বিন্দুবিসর্গ জানায় না।
সেদিন আকাশে লাল টকটকে সূর্য।
ইব্রাহিমের ফ্লুট মনের ভিতরটা তোলপাড়
করে দিচ্ছে। একটা পাপবোধ কাঁটার মতো বিঁধছে। সাদা পৃষ্ঠার ওপর একদৃষ্টে তাকিয়ে
আছে। কী জানি কী হল হঠাৎ-ৎ মোবাইলটা
খুলে দেখে দীর্ঘ মেসেজ….” আপনাকে কতবার বলেছি একটু আধুনিক কবিতা পড়ুন,শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ পড়ুন।
দেখুন কীভাবে লিখতে হয়, আর আজকের
কবিতাটি তো খুবই নিম্নমানের। কী করে আপনার কবিতা আমাদের পত্রিকায় প্রকাশ
করি। এই পত্রিকায় যাঁরা লেখেন তাঁদের সঙ্গে আপনার এই কবিতা আমাদের পক্ষে
প্রকাশ করা সম্ভব নয়। দুঃখিত।”
ধীরে ধীরে ছেলের ঘরে যায়। মাথায় হাত রেখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। তারপর
নিজের ঘরে এসে মেলের উত্তর দেয় শ্বেতা…” আমায় ক্ষমা করবেন এই কবিতাটি
স্বয়ং শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের। পরীক্ষামূলকভাবে নিজের নামে পাঠিয়েছিলাম। আর কোনোদিন বিরক্ত করব না।”
ইব্রাহিমের ফ্লুটের মতোই এই সাদা পাতা তার মাথা গোঁজার শেষ ঠাঁই। লেখার জন্য নয় বাঁচার জন্য। হাজার কাজের মাঝে
সাদা পাতাটার সামনে লেখার প্রতীক্ষায় প্রতিদিন নতজানু হয়ে বসা বা সাদা পাতার সঙ্গে তার যে এই সখ্যতা তাই বা কম কি?

Post a Comment