যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

অজয়পাড়ের উপকথা - সুদীপ ঘোষাল

 

অজয়পাড়ের উপকথা - সুদীপ ঘোষাল


আমাদের নবগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত পটুয়াপাড়া গ্রামে কয়েকঘর পটুয়াশিল্পী বাস করেন।মাথায় ঝাঁকড়া চুলের বীরবাহাদুর বললেন, আমরা, পটুয়ারা অনেকে সঙ্গীত সহযোগে পটচিত্র দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। গানের তালে তালে দর্শক-শ্রোতাদের পটচিত্রের আখ্যানভাগ বুঝিয়ে দিই।রামায়ণ,মহাভারত আর বেদ,উপনিষদের কিছু কাহিনী নিয়ে রচিত আমাদের পটচিত্র। এখন সাময়িক ঘটনার কিছু ছবি আমরা আঁকি।পটুয়াপাড়া গ্রামের একজন শিক্ষিত লোকের সঙ্গে পরিচয় হল।

তিনি বললেন, যশোর ও খুলনা অঞ্চলে পটুয়াদের গাইন’ নামে অভিহিত করা হয়। অবিভক্ত বাংলায় ঢাকা, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, সিলেট, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী এবং দিনাজপুর অঞ্চলে পটুয়ারা বসবাস করত। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পটভুমিতে দেশবিভাগের পর অধিকাংশই পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়। যারা থেকে যায় তাদের পেশায়ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ভাটা পড়ে।

বর্তমানে নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ, খুলনা, যশোর ও জামালপুর অঞ্চলে কদাচিৎ দুএকজন পটুয়া বা গাইন শ্রেণীর শিল্পীর সাক্ষাৎ মেলে। পটুয়ারা বিভিন্ন মেলা, ধর্মীয় উৎসব-অনুষ্ঠান এবং গ্রামে-গঞ্জে পটচিত্র বিক্রয় করে। হিন্দুদের মধ্যে অনেকে বিভিন্ন দেবদেবীর পট পূজা-অর্চনার জন্য সংরক্ষণ করে।পটুয়াদের একটি বড় অংশ বেদে সম্প্রদায়ভুক্ত। তাদের বিবাহাদি সামাজিক অনুষ্ঠান হিন্দু-মুসলিমরা একসাথে পালন করে। তাদের সামাজিক জীবনযাপন একইরকম।তিনি আরও বললেন, পটুয়া শব্দের আক্ষরিক অর্থ যারা “পট” (ছবি) আঁকে। পট অঙ্কন গ্রামবাংলার প্রাচীন লোকশিল্প। এর কিছু নিদর্শন এখনো বেঁচে আছে ।

যামিনী রায় প্রাশ্চাত্যের অঙ্কনরীতিতে পারঙ্গম হলেও পটশিল্পকে নিজের অভিব্যক্তির মাধ্যম হিসাবে তুলে নিয়ে পটশিল্পকে প্রাশ্চাত্যের কাছে বিখ্যাত করেন। কিন্তু যামিনী রায় পটুয়া নন। পটুয়ারা একটি পেশাভিত্তিক লোকগোষ্ঠী যাদের প্রধান পেশা বংশানুক্রমে নিজেদের বিশেষ রীতিতে পট অঙ্কন ও প্রদর্শন বা বিক্রয় করা।আমরা ছোটবেলায় দেখতাম বীরবাহাদুর কাকু একটা গোটানো দলিলের মত পটচিত্র বগলে বাড়ি বাড়ি ঘুরতেন। একটা বাড়িতে সুর করে তিনি রামায়ণের কাহিনী বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে ছবি দেখাতেন গোল গোটানো বান্ডিল থেকে। নানরকম ছবি তাতে আঁকা।

রাবণ ভিখারী সেজে সীতাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন লঙ্কায়। দুটো ঘোড়া সহযোগে পুষ্পকরথের ছবি। জটায়ু বাধা দিচ্ছে আর রাবণ তাকে তরবারি সহযোগে আঘাত করছেন। জটায়ুর ডানা কাটা দেখে আমার কান্না আসত। কখনও সখনও মা মাসিরাও কেঁদে ফেলতেন কাকুর করুণ সুরের আবেগে। বীরবাহাদুরের পটকাহিনীর বিষয়গুলো ছিল, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, ধমীয়, সামাজিকএবং পরিবেশগত। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে বিষয়নিরপেক্ষ পটগুলির মধ্যে যে কোনও ধরনের নর ও নারীর ছবি অথবা শিল্পচিত্র দেখা যায় এবং সামাজিক পট বলতে বোঝায় সামজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য যে পটচিত্র গুলি অঙ্কণ করা হ্য় সেইগুলি। যেমন পোলিও টীকাকরণ অভিযান, ম্যালেরিয়া দূরীকরণ, সাম্প্রদায়িক সম্পৃতী, বৃক্ষরোপন, এইডস সন্মন্ধীয় সচেতনতা বৃদ্ধি, মানবাধীকার ও নারীনিগ্রহ বিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধি সঙ্ক্রান্ত পটচিত্রগুলি।

আমাদের গ্রামে চলতি সমস্যাগুলেো নিয়েও বীরবাহাদুর পট আঁকত।আমি বীরবাহাদুরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, পট কি গো?বীরবাহাদুর বললো,পট মানে কাপড় গো। ন্যাকড়া যাকে বলো।আমি বললাম, কি কি বিষয়ের উপর তোমার পট আঁকা আছে কাকু?বীরবাহাদুর কাকু বললো,পৌরাণিক বিভিন্ন গল্প ও গাথা এই পটের উপজীব্য। সেগুলি হল রাবন বধ, সিতা হরণ, রাজা হরিশ্চন্দ্র, কৃষ্ণলীলা, দুর্গালীলা, সাবিত্রী-সত্যবান, মনসা মঙ্গল, চন্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, আনন্দ মঙ্গল, কালকেতু ফুল্লরা ইত্যাদি।ঐতিহাসিক পটের উপজীব্য যা এর নাম থেকেই প্রকাশিত তা হল ঐতিহাসিক ঘটনাবলী।

যেমন- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আজাদ্ হিন্দ্ বাহিনী ও নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, আণবিক বোমাবর্ষণআমি বললাম, আঁকার পদ্ধতি কি রকম?কাকু বললেন, কাপড়ের জমিন তৈরির পর অঙ্কনকাজ শুরু হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশজ রঙের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য; যেমন: ইটের গুঁড়া, কাজল, লাল সিঁদুর, সাদা খড়ি, আলতা, কাঠ-কয়লা ইত্যাদি। পটটিকে কয়েকটি অংশে ভাগ করে কাজ করা হয় এবং রংয়ের প্রকারের মধ্যে লাল, নীল, হলুদ, গোলাপী, বাদামী, সাদা এবং কালো ব্যবহৃত হয়। মাটির হাঁড়ি উপুর করে কেরোসিন লম্ফের উপর ধরা হয়। কালো মোটা স্তর চেঁচে কালি করা হয়।পট দেখানোর পরে পটুয়া বীরবাহাদুর বাড়ি গিয়ে ঝোলা নামিয়ে বসেন। তিনি গিন্নিকে ডেকে বলেন, কই গো রাজুর মা এক গেলাস জল দাও কেনে।

রাজুর মা বলে, আজ কতদূর যেয়েছিলে। পটুয়া বলেন, আজ ভাতারের পাশে শুষনা গেরামে গেয়েছিলাম গো। বড্ড খাটুনি হল।বীর বলেন, গিন্নি একটা গামছা দিয়ে পিঠ মুছিয়ে দাও না ক্যানে।গিন্নি একটু পরে গামছা এনে ঘাম মুছে দেন আদরে।বীরবাহাদুর কাকুর ছেলে রামবাহাদুর পটের ছবি আঁকা শিখছে। সে বড় তুলি দিয়ে এখন কাগজে ছবি আঁকছে রাজা, ঋষি আর রাক্ষসের। বীর বলেন, ভালো করে শিখে নে আঁকাটা।নিজে আঁকতে পারলে খরচ বাঁচবে। তা না হলি চিত্রকরের বাড়ি যেতে হবে। পয়সা লাগবে বিস্তর। ছেলে রাম বলে, দেকো দিকিনি বাবা এটা রামের ছবি বটে? বীর বলে, একদিনে কি হবে রে?

সময় লাগবে।এখন যতদিন বেঁচে আছি আমার কাছে শিখে লেগা। রাম বলে, তুমি রঙটা দাও গা। আমি চান করে আসি।গান গেয়ে রোজগার করা চাল আর আলু সেদ্ধ হতে বিকেল গড়িয়ে যায়। একবারে খেয়ে নেয় তিনজনে পেটভরে কারণ রাতে মুড়ি আর গুড় ছাড়া কিছু জোটে না। বীরবাহাদুর বলে, শিল্পীরা চিরকাল ভিকিরি কেনে গো গিন্নি। গিন্নি বলেন, তাই তো হয় গো।শিল্পিরা হল সাধক। সাধকরা কি কখনও টেকা পয়সার পরোয়া করে গো?বীরবাহাদুর কাকু বলেন, ঠিক বলেচিস তুই। পটের কাহিনীগোলা তাই তো বলে গো। পট শব্দটি সংস্কৃত পট্টি থেকে এসেছে। বর্তমানে এই শব্দটিকে , ছবি আঁকার মোটা কাপড় বা কাগজের খন্ড ইত্যাদি অর্থেও ব্যবহার করা হয়। পটের উপর তুলির সাহায্যে রং লাগিয়ে বস্তুর রূপ ফুটিয়ে তোলাই পট চিত্রের মূলকথা ।

এতে কাহিনী ধারাবাহিক ভাবে চিত্রিত হতে থাকে । অন্তত আড়াই হাজার বছর ধরে পটচিত্র এ মহাদেশের শিল্প জনজীবনের আনন্দের উৎস, শিক্ষার উপকরণ এবং ধর্মীয় আচরণের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে ।বাংলাদেশের পটচিত্রের মধ্যে গাজীর পট ও পশ্চিমবঙ্গের পটচিত্রের মধ্যে কালীঘাটের পট উল্লেখযোগ্য । পট মূলত দুই ধরনের রয়েছে। যথা জড়ানো পট, এ ধরনের পট ১৫-৩০ ফুট লম্বা এবং ২-৩ ফুট চওড়া হয়।চৌকো পটগুলো আকারে ছোট হয়।কাপড়ের উপর গোবর ও আঠার প্রলেপ দিয়ে প্রথমে একটি জমিন তৈরি করা হয়। সেই জমিনের উপর তুলি দিয়ে বিভিন্ন চিত্র অঙ্কিত হয়।

আর এক রকমের চট দিয়ে কাগজের পেছনে আঠা দিয়ে আটকানো হয়। আমরা যখন ওয়াল ম্যাগাজিন, জোয়ার প্রকাশ করি তখন প্রথম ছবি কাকু এঁকে দিয়েছিলেন দয়া করে।ছোট থেকে কাকুকে আমরা তুমি সম্বাধনে অভ্যস্ত ছিলাম। কাকু বলতেন, আপনি আপনি বলবি না। কেমন পর পর মনে হয় রে। তোরা আমাকে তুমি বলেই সম্বোধন করবি।আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ইতিহাস নিয়েও কি তোমাদের কাজ হয় কাকু?কাকু বলেন, ঐতিহাসিক পটের উপজীব্য যা এর নাম থেকেই প্রকাশিত তা হল ঐতিহাসিক ঘটনাবলী। যেমন- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, আণবিক বোমাবর্ষণ,ক্ষুদিরামের বিদায়।

বাঘাযতীনের জাহাজ প্রভৃতি।কাকু আরও বলেন, জমিন তৈরির পর অঙ্কনকাজ শুরু হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশজ রঙের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য; যেমন: ইটের গুঁড়া, কাজল, লাল সিঁদুর, সাদা খড়ি, আলতা, কাঠ-কয়লা ইত্যাদি। পটটিকে কয়েকটি অংশে ভাগ করে কাজ করা হয় এবং রংয়ের প্রকারের মধ্যে লাল, নীল, হলুদ, গোলাপী, বাদামী, সাদা এবং কালো ব্যবহৃত হয়।কাকুকে আমি আবার প্রশ্ন করলাম, তোমাদের শুরুর ইতিহাস তুমি জানো কি?কাকু বলেন, আমাদের কোন চাষের জমি নাই।

আড়াই হাজার বছর আগে থেকে বংশ পরম্পরায় আমরা এই শিল্পে যুক্ত।পটুয়ারা কেবল চিত্রশিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন একাধারে কবি, গীতিকার ও সুরকার। সাধারণত পারলৌকিক ও ধর্মীয়ভাব মিশ্রিত বিষয় নিয়ে পট নির্মিত হলেও পটুয়ারা বিষয় নির্বাচনে রক্ষণশীল ছিলেন না। কর্মে ও চেতনায় তারা ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, বলা যেতে পারে ধর্মনিরপেক্ষ। সমাজের নানা অন্যায় অবিচার পটুয়াদের পটে চিত্রিত হয়েছে দ্রোহের হাতিয়ার হিসেবে। গ্রাম-বাংলার হাট-বাজার, পথে-ঘাটে বিভিন্ন লোকালয়ে পট দেখিয়ে গান গেয়ে, গল্প বলে তারা মানুষকে জ্ঞান ও আনন্দ বিলাতেন, বিনিময়ে জীবনধারনের মতো অর্থ উপার্জন করতেন। সে-কারণে তাঁদের বলা হত ভবঘুরে চিত্রকর। তাঁদের নীতিজ্ঞান ছিল উঁচু পর্যায়ের। সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায়ে রাখতে পটশিল্পীরা ছিলেন সদা সচেষ্ট, যার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁদের ছবি ও গানে।

পটুয়ারা কেবল লোকরঞ্জকই ছিলেন না, ছিলেন লোকশিক্ষকও।পটুয়াপাড়ার আকাশে বাতাসে এক ধর্মীয় চেতনা সদা জাগ্রত। তারা এখনও বিশ্বাস করেন, ভগবান আছেন। তিনি অন্যায় মার্জনা করেন না, জাতিভেদ বা বর্ণভেদ করলে মানুষকে শাস্তি দেন। মৃত্যুর পর মানুষের অন্যায়ের বিচার করা হয় কিভাবে তার চিত্র পটশিল্পীরা এওনও আঁকেন। তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, মৃত্যুর পরেও আর একটি জীবন আছে। তাই বেঁচে থাকতে জীবনে দান, ধ্যান,দয়া,ধর্ম করা উচিত। জীবনটা ঠিক ছবির মত। মনখেয়ালের তুলিতে রাঙানো যায় জীবনের ক্যানভাস।তখনকার সময়ে রায় পরিবারের সুমনের জীবনের ঘটনা।সুমন যাত্রাদলে বাঁশি বাজায়।আর গোপনে বিপ্লবীদের সাহায্য করে নানারকমভাবে। ঠিক একশো বছর আগে রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লব বিশ্বের আরও অনেক দেশের মতো ভারতেও কমিউনিস্ট আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল।

গত শতাব্দীতে ভারতের বামপন্থী রাজনীতিও নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে গেছে, আর তাতে অক্টোবর বিপ্লব তথা সাবেক সোভিয়েত রাশিয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল আগাগোড়াই।রুশ বিপ্লবের নায়ক ভ্লাদিমির লেনিন বা তার উত্তরসূরী স্তালিন একটা পর্বে ভারতের কমিউনিস্টদের প্রবলভাবে আলোড়িত করেছেন, কিন্তু পরে চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব বা মাও জে দংয়ের আবেদনই যে ভারতের বামপন্থীদের কাছে বড় হয়ে ওঠে তাতেও বোধহয় কোনও ভুল নেই।কিন্তু ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে একশো বছর আগেকার সেই অক্টোবর বিপ্লব ঠিক কীভাবে ছায়া ফেলেছে?

বিশ্ব জুড়ে কমিউনিস্ট আন্দোলনের একটা মূল কথাই হল আন্তর্জাতিক সংহতি বা সলিডারিটি। সুদূর রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের ঢেউ ভারতে আছড়ে পড়েই যে এদেশে কমিউনিজমের বীজ রোপিত হয়েছিল তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কোনও দ্বিমত নেই। পাঁচ ছেলের পরে আবার পুত্রসন্তান হয়েছে রায় পরিবারে।খুব সুন্দর দেখতে হয়েছে।কোনো লোকের যাতে নজর না লাগে তাই নাম রাখা হলো কালো। সুমনবাবু খুব খুশি।সুমনবাবুর বোন সুমিতাও খুব খুশি।সুমনবাবু খুব ভালো বাঁশি বাজান।

যাত্রাদলে রাতের পর রাত তাকে বাঁশি বাজাতে হয়।আড় বাঁশি।তাই বেশির ভাগ রাতে তিনি বাড়ি ছেড়ে থাকেন।যাত্রাদলের মেয়ে রূপসী সুমনকে ভালোবাসে।সুমন সুদর্শন।ভালো চিত্রশিল্পী।সুমনরা দুই ভাই।বিমল তার ছোটো ভাই।সুমনের বৌ খেনী আর বিমলর বৌ কুড়ো।একদিন খেনী,কুড়ো আর বিমল গঙ্গায় স্নান করতে গেলো।বিমল সাঁতার জানে না।তাই কুড়ো বললো,বেশিদূর যাবে না। ভয় লাগে।—-ঠিক আছে যাব না।কিন্তু জোয়ারের টানে ভেসে গেলো কুড়োর সিঁদুর।বিমলকে খুঁজে পেলো না কেউ।

তারপর কুড়োর সুন্দর চুলের বেণী কেটে ঝুলিয়ে রাখা হলো বাড়ির মাচায়।কুড়ো বাল্যবিধবা হলো।চিরজীবন বয়ে বেড়াবে কয়েক দিনের বিয়ের জীবনের স্মৃতি।খেনীর ছেলে কালো।খেনী নিজেওযেমন সুন্দরী আবার ছেলেটিও তাই।মহিলামহলে খেনীর রূপের খুব সমাদ। সুমন বাড়ি এলে বলে,তো মাকে আর বাঁশি বাজা তে হবে না।জমি জায়গা দেখাশোনা করার পর আমাদের আর কোন অভাব থাকবে না ।সুমন বললো,দেখো আমি শিল্পী মানুষ।জমি জায়গা নিয়ে আমি থাকতে পারবো না।—-পারবো না বললে হবে না। ছেলে মানুষ করতে হবে।জমি বেদখল হয়ে যাবে।—-আমাকে বোঝার চেষ্টা করো দয়া করে।

আমি শিল্পী মানুষ।আমি বাঁশি ছাড়া মৃত।আমাকে রেহাই দাও।খেনী চোখের জলে অন্য ঘরে চলে গেলো।তার সংসারের চিন্তায় মন খারাপ হয়ে গেলো।আজ রাতে গান নেই।তাই ছুটি। বাড়িতেই আছে।তবু রাতে বৌ এর কাছে না থেকে বাগানে বাঁশি বাজায় সুমন।তার সুর শুনে খেনীর ভয় হয়।এই আপদ বাঁশি তার সংসার ভেঙ্গে দেবে না তো? এই চিন্তায় খেনী রাত কাটায়। আর সুমন সারা রাত রূপসীকে মনে রেখে বাঁশি বাজায় ক্ষণে ক্ষণে।তারপর রাত পোহালেই চা, মুড়ি খেয়ে বেরিয়ে পরে সুমন।

আজ যাত্রা আছে।মীরার বঁধুয়া।মুরা রী বাঁশি মুখে ধরে থাকবে আর আড়াল থেকে বাজবে সুমনের বাঁশি।আজ কৃষ্ণ সাজবে মুরা রী। মীরা মুগ্ধ হবে সুরে।রূপসী আজ মীরা সাজবে।কত লোকে হাততালি দেবে।পুরষ্কার পাবে মুরারী।রূপসী জানে, দলের সবাই জানে বাহাদুর বংশীবাদকের বাহাদু। তবু মুরারী নামের কাঙাল সেজে কপটতা করে।সুমনের তর উপর রাগ হয় না। কৃপা হয়। রূপসীর পিছন পিছন ঘুর ঘুর করে মুরারী।কিন্তু রূপসীর মন পায় না। রূপসী আড়ালে সুমনকে বলে,ডিম,দুধ খাবে।আমার কাছে আসবে।আমি দেবো।—আমার বেশি খেলে বদহজম হয়।হাল্কা মুড়ি আমার প্রিয়।—-না না।মুখ দিয়ে রক্ত উঠবে।—-বেশি খেলে আমার বাজাতে কষ্ট হয়।—-ঠিক আছে।আমার কাছে এসে তুমি যখন বাঁশি বাজাও আমার মনটা কেমন হারিয়ে যায়।—-জানি আমি।তোমার জন্য আমি বাঁশি বাজাই।তুমি আমার বাঁশি শুনলেই হবে।

আর কাউকে চাই না।সুমন বাঁশি বাজানোর সঙ্গে কোনো আপোষ করে না। তাতে না খেয়ে থাকতে হলেও থাকবে।কোনো আপত্তি নেই।অপরদিকে রাবণ অপেরা এদের প্রতিদ্বন্ধি।তারা সুমন কে নিজেদের দলে আনার জন্য নানারকম রাজনীতি করে। কিন্তু সুমন দল ছাড়বে না। মুরারী অপেরায় তার প্রিয়া রূপসী আছে। তাকে ছেড়ে কি করে সে বাঁশি বাজাবে।রাবণ অপেরার ম্যানেজার বললো , তোমার খুব অহংকার। আচ্ছা তোমাকে আমরা দ্বিগুণ টাকা দেবো।আমাদের দলে এসো।—-না আমি পারবো না। আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।—আচ্ছা তোমাকে দেখে নেবো।নিরহঙ্কার সুমনের লোভ নেই।

সে সুরে সুরে মহাসুরের সঙ্গে মিলতে চায়।সুমনের ছয় ছেলের মধ্যে এখন শুধু বেঁচে আছে কালো।একবার গ্রামে ওলাউঠা হয়েছিলো।সেই মহামারিতে মরে গেছে সুমনের পাঁচ সন্তান। খেনীর এখন একমাত্র ভরসা এই কালো।সে ভাবে,তাকে মানুষ করতে হবে।বাবার মত বাউন্ডুলে যেনো না হয়।ভাগীদার গণেশ হাজরা জমি দেখাশোনা করে। সুমন ছমাসে,নমাসে একবার বাড়ি আসে। টাকা পয়সা মাঝে মাঝে পাঠায়। এইভাবে সময়ের তালে তালে কালো পড়াশোনা শিখে বড় হতে থাকে।কেতুগ্রামের মেনকা সম্পর্কে খেনীর আত্মীয়।রূপে,গুণে,সংগীতে মেনকার জুড়ি মেলা ভার।পড়াশোনায় তার সমকক্ষ কেউ নেই।মেনকা গ্রামের আপদে বিপদে সকলের আগে এগিয়ে যায়। গ্রামের লোকেরা খুব ভালোবাসে মেয়োটিকে।

ক্ষ্যান্তবুড়ি মরে গেলে মেনকা চাঁদা তুলে পাড়ার দাদাদের নিয়ে তার শবদাহ করেছিলো।গ্রামের বয়স্ক লোকেরা তাকে দুহাত তুলে আশীর্বাদ করেছিলেন।মেনকা নিজে একজন স্বাধীনচেতা তরুণী। নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে সমাজের মঙ্গল করাই তার লক্ষ্য।তার জন্য তিলে তিলে নিজেকে সে উপযুক্ত করে তোলে।এই গ্রামে এক সুদখোর লোক ছিলো।গরীবদের কাছে সে দশ শতাংশ হারে সুদ নিত।দেনা শোধ না করতে পারলে জমি জায়গা সোনাদানা কেড়ে নিত।মেনকা এই লোকটাকে দেখতে পারত না।

তাকে দেখলেই রাগ হয়ে যেত।জব্দ করার ফন্দি আঁটত দিনরাত।মেনকা কৃষক পরিবারের সন্তান।সে হাঁস পুষত।তার হাঁসগুলো যখন ডানা ঝাপটে জলে নেমে ডুব দিত তখন সেও হাঁস হয়ে ডুব দিত অতল জলে।মক্ত খোঁজার আশায় তার ডুব। ডুবে ডুবে কখনও তার বেলা বয়ে যেত।কিন্তু মুক্ত তার অধরা রয়ে যেত। রাতে সে শিক্ষা নিত চাঁদের বাগানে।তার শিক্ষক বলতেন,চাঁদের বুকে অই যে কালো কালো দাগ দেখছো অইগুলো কলঙ্ক।তবু একটা তৃণ অবধি পৌঁছে যায় তার আলো।কাউকে বাদ দেয় না সে।তিনি মেনকাকে বলতেন, জীবনে যতই বাধা আসুক। এগিয়ে যাবার পথ থেকে সরে আসবে না। একদিন ঠিক সফলতা তোমার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটবে।তারপর সকালে উঠেই মেনকা বই হাতে যায় শিক্ষকের বাড়ি। সঙ্গে ছাগল,ভেড়া, হাঁস।

তাদের যথাস্থানে রেখে তারপর শিক্ষকের বাড়ি যায় ।সুদখোর মহাজন মেনকাকে দেখে বললো,এই সুন্দরী শোন। এদিকে আয়।মেনকা বলে,কি বলছেন বলুন?—–একবার দুপুর বেলায় আমার সঙ্গে আমার বাড়িতে দেখা করিস তো।—কেন? আমার সঙ্গে কি কাজ?—গেলেই জানতে পারবে।মহাজন এমনি ডাকে না। তোমার কপালে আজ প্রাপ্তি্যোগ আছে। যেও বেশ।—এমন আদরের ডাক কি আর ফেলতে পারি।যাব।ঠিক দুপুরবেলায় মেনকা তার দলবল নিয়ে হাজির হলো মহাজনের বাড়ি।সবাই ভূতের সাজে উঠে পড়েছে আম গাছে।পাকা আম। সব পেড়ে খাচ্ছে সকলে।মেনকা সাদা শাড়ি পরে কড়া নাড়লো মহাজনের দরজায়।

মহাজন বাইরে বেরিয়ে মেনকাকে দেখে পাগলপ্রায়।গায়ে হাত দিয়ে বলে, আয় ভেতরে আয়।—-যাব,?আমরা ভূত পেত্নির দল তোর বাগানে থাকি।আজ মেনকার সাজে তোর কাছে এলাম। অই দেখ তোর বাগানে কত ভূত।মহাজন খুব ভিতু।ভূতের ভয়ে সে রাতে বাইরে বেরোয় না। ভয়ে বললো,তোরা ভূত।ওরে বাবারে, আমার সব আম শেষ করে দিলো রে।সঙ্গে সঙ্গে মহাজনের গালে এক থাপ্পড়।

মহাজন জোড় হাতে ক্ষমা চাইছি।আমাকে ছেড়ে দাও।—-ছেড়ে দিতে পারি।একটা শর্তে।যত দলিল,সোনা তুই চুরি করেছিস সবাইকে ফেরত দিবি।তা না হলে আবার আসবো।—না না। আমি সব দিয়ে দোবো।আমি আর সুদের কারবার করবো না।তারপর কিছুদিন পর সুদখোর মেনকার বাবার জমির দলিল ফেরত দিয়েছিল। হয়ত ভূতের ভয়ে তা না হলে লোকবলের ভয়ে।

মেনকার বাবা বলতেন,মনে রাখবি মা,জল জল গঙ্গাজল।আর নল,বল লোকবল। বল বা শক্তির মধ্যে লোকবল শ্রে। তার প্রমাণ মেনকা হাতেনাতে পেলো।সুদখোর মেনকার সামনা সামনি হয়নি আর কোনো দিন।মেনকা জানে,ওরা সবলের ভক্ত আর দূর্বলের যম।মেনকার সঙ্গে সবসময় বন্ধুরা থাকত।প্রায় বিশ পঁচিশজন গ্রামের ছেলেময়ে খেলা করত একসাথে। দলবল নিয়ে গ্রামের বিভিন্ন সমাজসেবা মূলক কাজ করত নিঃস্বার্থভাবে।মেনকা এইভাবে বড় হতে লাগলো।তারপর সে গ্র্যাজুয়েট হলো।তার বাবা এখন খুব খুশিমনে কৃষিকাজ করেন।

#banglasahitya



https://sahityashruti.quora.com/

Post a Comment