যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

ঝড় — ১০ম পর্ব — বন্য মাধব

ঝড় — ১০ম পর্ব — বন্য মাধব


পৌনে ন’টা নাগাদ খিচুড়ির ডেকচি এল। সবুজ সবুজ কুমড়ো ঝিঙে অবোধ ঝোলে খেলে বেড়াচ্ছে। কলাপাতায় খেতে দেওয়া হল, খিদের মুখে রেশনের লাল লাল চালের আনাজ ভাসা আসামীভোগ বেশ অমৃত অমৃতই লাগল।

 এবার এক কনস্টেবল এসে হাঁক দিল, সব রেডি হও, গাড়ি এসে গেছে……. অর্থাৎ যেতে হবে , সদরে।

 লক আপ খোলা হল, গোনাগুণতি করে লাইনে দাঁড় করানো হল, কাকু আর হিমুকে হাতকড়া পরানো হল, মোটা কাছির দড়ি দিয়ে সবাইকে ঘিরে পিক আপ ভ্যানে তোলা হল।

 মান্ধাতার আমলের গাড়িটা কঁকিয়ে স্ট্যার্ট নিল, ধীর গতিতে নবাবী চালে এগিয়ে চলতে লাগল, কারো মুখে কোন কথা নেই। এ পার্টি বি পার্টি সব চুপচাপ। 

 গাড়িটার গতর নাড়া দেখে আমার একটা পুরনো ঘটনা মনে পড়ে গেল।

ভোটের আগে সরকারের খেয়াল হয়, আরে বেকার ছেলেমেয়েদের জন্যে কিছু করা দরকার, অমনি এমনি এমনি প্রকল্প, এটা সেটা প্রকল্প ঘোষনা! তো এমন এক ভোট বাজারে বেকার ছেলেদের গাড়ি ঋণ প্রকল্পের ঘোষণা হল। আমার মধ্যে তখন বেশ হতাশা ঢুকতে শুরু করেছে। দু’ তিনজন মিলে ঠিক করলাম, আমরা গাড়ি বের করবো। যেই ভাবা সেই কাজ। প্রথমে লাইসেন্স বের করার ধান্দা করতে লাগলাম।

  এত কম সময়ে কোন ড্রাইভিং স্কুল থেকে লাইসেন্স বের করা অসম্ভব হয়ে পড়ল। এক কথায় সবাই ভাগিয়েই দিল। এমনকি আমরা পুরো কোর্স ফি দিতে চাইলাম, তাও কেউ রাজি হল না। শেষমেষ এক দালালের দেখা মিলল, বালিগঞ্জে বেলতলা মোটর ভেহিক্যালস এ বিভিন্ন কাজ করিয়ে দেয়। সবশুনেটুনে সে অভাবনীয় কম টাকায় আমাদের লাইসেন্স বের করে দেবে বলল। কোন টেস্ট দিতে হবে না, না মৌখিক না লিখিত না প্র্যাকটিক্যাল! সব বলা থাকবে, শুধু শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকতে হবে এই যা। 

 নির্দিষ্ট দিনে বেলতলার মোটর ভেহিক্যালসের সামনে দালালবাবুর অফিসে গেলাম। ওখান থেকে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল আলিপুরে। কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখার পর দালালবাবু এল। জানাল, সব ঠিকঠাক আছে, ওদের গাড়ি আসছে নিয়ে যাবে। আর বলল, যে লোকটা নামধাম জানতে চাইবে তাকে কুড়ি টাকা করে দিয়ে দেবে। 

 ভাল, খুব ভালো। এক সপ্তাহের মধ্যেই লাইসেন্স পেয়ে যাব।

 একটা রদ্দিমার্কা গাড়িতে আমাদের তোলা হল। ঘষটে ঘষটে তিনি প্রায় কাছাকাছি এসে দেহ রাখলেন, আর চাকা জ্যাম, আর ঘুরছে না। নেমে সবাই দেখতে লাগলাম, বেশ কিছুটা চাকা ঘষটানোর দাগ রাস্তার পিচে। ড্রাইভার জানাল গাড়ি আর নড়বে না। অগত্যা আমাদের মিনিট পাঁচেক হেঁটেই যেতে হল। 

 অনেকগুলো বাইক, কয়েকটা অটো দাঁড় করানো। তাদের টেস্ট চলছে। আর আমরা যারা চার চাকার লাইসেন্সের জন্যে এসেছি তাদের টেস্টিং এর জন্যে  কিছুই দেখতে পেলাম না। আমাদের নামধাম উদ্দেশ্য জানার পর নির্ধারিত টাকাটা বুঝে নিয়ে ওরা ছেড়ে দিল।

 যাক বাবা, সবমিলিয়ে তাহলে আমাদের পাঁচশো সত্তর টাকায় সব হয়ে গেল। গাড়ির উত্তর পুব কান্ডজ্ঞান ছাড়াই লাইসেন্সের মালিক হওয়া যায় তাহলে!

 লাইসেন্স আমরা ঠিকসময়েই পেয়েছিলাম, একটা স্বপ্ন তাড়া করতে করতে পৌঁছে গেলাম এইচ ডি এফ সি ব্যাঙ্কে, আর তারপর? কহতব্য নয়, সরকারের ঘোষণা এক, আর লোন স্যাংশনকারী ব্যাঙ্কের বাহানা আরেক। সুতরাং লাল ফিতের শোনা গল্পগুলোর ভয়ানক সত্যিগুলো জেনেই রণে ভঙ্গ দিতে হল, মনকে বললাম, ভাইরে এরচেয়ে বাপকেলে বাঁকামুঠিই ঢের ভাল।

  কঁকিয়ে কেঁদে গাড়িটা গন্তব্যে পৌঁছাল, আহা খুনের আসামী আমরা, মহা যত্নে মহা তোয়াজে আমাদের আলিপুর ক্রিমিনাল কোর্টের লক আপে ঢোকানো হল। কাকুর কাছ থেকে খবর মিলল, এখনও পার্টির নেতারা এসে পৌঁছায় নি, পৌছায় নি পার্টির প্যাডে লেখা চিঠিও। যা ছুটোছুটি সব আত্মীয় স্বজনরাই করছে।

 কোর্টের লক আপটা ভারী মজার জায়গা, পুরনো আসামীরা যেমন জামিনের জন্যে এসেছে, আমাদের মতো সদ্যোজাতও আছে। একধারে জল আর মল ত্যাগের বন্দোবস্ত, খাসা তার চেহারা আর আহা কি খোশবু! সারা ঘর তার অমায়িক সেন্টুতে ভরে আছে। এ ঘরের একটাই গেট, মোটা মোটা গোল লোহার, কোন আমলের বোঝা শক্ত, তালা লাগিয়ে দুই বন্দুকওয়ালা হাই তুলতে তুলতে অতন্দ্র প্রহরায় ব্যস্ত। বাড়ির কেউ দেখা করতে এলেই নিজেদেরটা বুঝে নিয়ে তবেই আসামীকে ডেকে দিচ্ছে, তাও বেশিক্ষণ না। এ যেন পয়সা ফ্যাল তামাসা দ্যাখ, পয়সা শেষ তামাসাও শেষ। 

 এই পর্যন্ত দেখতে বেশ লাগছিল, কিন্তু সব জায়গার মতই এখানেও অবাঞ্ছিত ইন্টারাপশন আছে, এটা জানতাম না। হয়েছে কি, একটু আগে যে ক’টা লোক এসে এখানে আসার হেতু কি জানতে চাইছিল, তারাই দু’টো লোককে দেওয়ালে ঠেসে উত্তম মধ্যম দিচ্ছে। কারনটা কি? একান ওকান হয়ে জানা গেল, এটা নিত্যদিনের ঘটনা, ক’জন মিলে একটা গ্যাং বানিয়ে নতুনদের জেলের নিয়ম কানুন শেখাবার জন্যেই এরা এসব কাণ্ড করে, তার বখরাও বন্দুকধারীরা পায় বটে।

 অর্থাৎ বাড়ির মুখ দেখছো, আর মুখ দেখানির জন্যে কিছু বকশিস ছাড়বে না তাই হয়? হয় না। দিবি না মানে কি? না দিলে তো আমাদেরও খুব ইচ্ছে করে এমন একটু আধটু আদর করার!  নে তাহলে আদরই খা শালা!

 হুম, এইজন্যেই লোকে বলে, জেলের ঘানি টানিয়ে ছাড়বে!

আমরা পার্টি পার্টি কেসে এসেছি শুনে ওরা চলে গিয়েছিল। ওদের টার্গেট খুব সফ্ট হয়, বোঝা গেল। চোখের সামনে পর পর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো তাই বলছে। হুম, কাকুকে আর কাকুর জামাইকে খুব গম্ভীর দেখাচ্ছে।

 সামান্য ব্যাঘাতটুকু ছাড়া এই সুন্দর জায়গাটা আমাদের ছাড়তেই হল। মহামান্য হাকিমসাহেব আমাদের মাত্র দিন পনেরোর জেল হেফাজত দিয়েছেন। তথ্যপ্রমাণাদি, যেটা সরকারি উকিল সাহেব দিয়েছেন শোনা গেল, তারপর আমাদের  খুনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দু’টো যোগই থাকা উচিত বলে নিশ্চয়ই মনে হয়েছে, তাই জামিন নাকচ! কিন্তু এতে যদি কবির কথামতো বিচারের বাণী  কেঁদে কেঁদে চোখ ফোলায়, তাতে তাঁর কি করার থাকতে পারে। যে সব ধারায় কেস সাজানো হয়েছে, তাতো ননবেলেবল!

 হুম, কাল সন্ধ্যে থেকে ঘটে যাওয়া তামাসাগুলো দেখতে দেখতে এতটুকুও ক্লান্তি আসে নি, এসেছে স্মৃতি, আসছেও তারা ভিড় করে। চেনা বাস্তব, শোনা বাস্তব যত মিথ্যে হচ্ছে, ততই কৌতূহল বাড়ছে। এই বাড়ন্ত কৌতূহলের মধ্যেই আমাদের আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে ঢোকানো হল।

 তখন ঘোর সন্ধ্যে, নাম ধাম লেখার ক্রিয়াকর্মাদি সারার পর ইয়া বড় গেটের মধ্যে দিয়ে লাইন করিয়ে ঢোকানো হল। তারপর স্কুলে যেমন পিটির লাইনে দাঁড় করানো হত, তেমনি আয়তাকারে সাজানো হল। আদেশ হল উবু হয়ে বসার, বসা হল। দু’ তিনজন ষণ্ডামার্কা লোক, পরে জেনেছি, এরা সব মেয়াদখাটা অপরাধী, ডান্ডা ঠুকে ঠুকে বাজখাঁই গলায় নাম ডাকছিল, বরং বলা ভাল রোল কল করছিল।

  মেলানো হয়ে গেলে আবার সারি দিয়ে দাঁড় করালো, একটা ঘরের দেয়াল ঘেঁশে বেশ একটা ভারিক্কি চেহারা, আসলে নধর ভুঁড়িওয়ালা, মানানসই চেয়ারে বসে, আমার হঠাৎ যমরাজের কথা মনে এল, উনিই কি ভবিষ্যতে প্রমোশন পেয়ে যমরাজ হবেন? যাইহোক, এক এক করে তিনি সবার আগমনের হেতু জেনে নিচ্ছেন। আমরা পার্টি পার্টি কেসে জড়িয়েছি জেনে, এলাকার টুকটাক এটা ওটা জেনে খুবই নরম সুরে জানালেন, পার্টির প্যাডে চিঠি এলেই এ পার্টির আর বি পার্টির সেলে আপনাদের পাঠানো হবে, আপাততঃ সাধারন সেল থাকতে হবে।

 অতএব সাধারন সেলে সবাইকে যেতে হল। 


https://banglasahityamancha.quora.com/

Post a Comment