যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

বিকাশের একদিন - সুব্রত মজুমদার

 

সুব্রত মজুমদার


মরে যে এতসুখ তা জানা ছিল না বিকাশের। টুক করে পাকা কলার মতো খোসা থুরি দেহ হতে বেরিয়ে আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়ানোর মজাই আলাদা। অফিস নেই, বসের হম্বিতম্বি নেই, গিন্নির মুখ ঝ্যামটা নেই, ছেলেমেয়েদের নিরীহ হুমকি নেই, – এ এক সুখের জগৎ।

সকালবেলা চা নিয়ে বসেছিল বিকাশ, চায়ের কাপটা ঠোঁটের কাছে আনতেই কি যেন হয়ে গেল। অন্ধকার হয়ে এল চারপাশ। তারপর নিজের মস্তিষ্কের ব্রহ্মরন্ধ্র দিয়ে ফুটুস করে বেরিয়ে এল বাইরে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ছুটোছুটি লেগে গেল। দামড়া ছেলেটা ছুটল ডাক্তার ডাকতে, গিন্নি মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে কাঁদতে লাগল । বিকাশ ততক্ষণে উঠোনের আমগাছে এসে বসেছে।

হঠাৎই একটা হৈহট্টগোল শোনা গেল। হরেন ডাক্তার এসেছেন। স্টেথো বাগিয়ে ধরে রোগীকে দেখলেন ডাক্তার। কোনও সাড়াশব্দ নেই। হাত দিয়ে রোগীর হাতের কব্জি, ঘাড়ের পাশ পরীক্ষা করলেন। অবশেষে স্টেথোটা গলায় নামিয়ে এনে বললেন, “সব শেষ।”

দেখতে দেখতে লোকজন জমে গেল। বাড়িময় কান্নাকাটি। পাড়ার বয়স্করা এসে দাঁড়ালেন। ভবেশ ভটচায বললেন, “যা হওয়ার তা তো হয়ে গিয়েছে, এখন ব্যাকুল হলে চলবে না। ওরে তপন শেষযাত্রার আয়োজন কর ভাই। তোরা ছাড়া বিকাশের আর কে আছে বলো ।”

বাঁশ কাটা, মাচান করা, মড়া বাঁধা সব সম্পন্ন হল। বটুক মাল গান ধরল, “নদের পথে কে বা যায়, আমার নিতাই যায় আর গৌর যায়….”

চিতাতেই সব শেষ নয়। শববাহকদের সাথে ফিরে এল বিকাশ, ঘরের সামনের গাছটাতে আশ্রয় নিল। এখান হতে সবকিছু স্পষ্ট দেখা যায়। টাকাপয়সা নিয়ে ছেলেমেয়ের মধ্যে ঝগড়া, ভোজের খরচ কে করবে তাই নিয়ে বিবাদ, গিন্নির হেনস্থা, – সবই দেখতে পায় সে। কিন্তু কি আর করবে, মহাভারতের সঞ্জয়ের মতো কেবলমাত্র দর্শক সে। যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষমতা নেই।

মনটা বিষন্ন হয়ে যেতেই উড়তে উড়তে মোড়ের মাথার বটগাছটায় এল বিকাশ। সেখানে আবার করিম খাঁয়ের আস্তানা। বিকাশে দেখে খিকখিক করে হেসে উঠল করিম। আদাবের ভঙ্গিতে বলল, “আদাব জনাব, তা এখানে কি করতে ?”

-“কি করতে আবার, থাকতে । যেমন আপনি আছেন।”
করিম খাঁ খিক করে হেসে বলল, “তসলিব নিয়ে অন্যত্র যান জনাব। এখানে হবে না।”

কিছু বলতেই যাচ্ছিল বিকাশ কিন্তু তার আগেই একটা সুরেলা স্ত্রীকণ্ঠ ভেসে এল, “তুমি একদম যাবে না বিকাশদা। এই গাছে ওই মামদোর যেমন অধিকার তেমনি তোমার। ওকে পাত্তা দেবে না। ”

-“একি রত্না তুই ? তুই তো…. ” রত্নাকে দেখে অবাক হয় বিকাশ। দীর্ঘ বিশ বছর পর চেনা মুখটা দেখে কি যে ভালো লাগছে তার। ঠিক তিরিশ বছর আগে বিকাশের বয়স তখন গোটা পঁচিশ, পাশের বাড়ির এই মেয়েটি একদিন হঠাৎ গলায় দড়ি নিল। নানান লোকে নানান রকম বলল। আসল কারনটা জানে বিকাশ। সেদিন একটা মেয়ের ইচ্ছাকে বলি দিয়ে বাবার পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করেছিল সে ।

রত্না এগিয়ে এসে বিকাশের চোখে চোখ রেখে বলল, “কি বিকাশদা, তোমার রত্নাকে ভুলে গেলে ? এত সহজে সবকিছু ভোলা যায় ?”

মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে বিকাশ। এসময় ধরণী বিদীইহলে ঢুকে যেত সে। বলল, “তুই বিশ্বাস কর, আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি যে তু অন্তঃসত্ত্বা। আমাকে ক্ষমা করে দে।”

-“আর আমি ?” এগিয়ে এল আরেকটা চেহারা। একেও চেনে বিকাশ। এ হলো মালবিকা বৌদি । বাচ্চা হতে গিয়ে হাসপাতাল হতে আর ফিরে আসেনি। দেওরের টিউশনি মাষ্টারকে খুবই পছন্দ করত মালবিকা। ওদের সম্পর্ক গড়িয়েছিল বহুদূর, কিন্তু ওই যে মালবিকা আর ফিরে এল না।

পিছিয়ে আসে বিকাশ। মালবিকা বৌদিকে একবারের জন্যও মনে নেই। এই পাপ সে লুকোবে কোথায় ! কিন্তু পিছিয়ে এসেও উপায় নেই। একে একে এসে হাজির হলো টুম্পা, চন্দন, মনা, করবী, পম্পা, আরও অনেকে। কিন্তু এরা তো সবাই মরেনি ! তাহলে এখানে কেন এরা ?

-“কি চাও তোমরা ? ছেড়ে দাও আমাকে। আমি কাউকে চিনি না। তোমাদের কাউকে চিনি না। হ্যাঁ হ্যাঁ তোমরা কেউ প্রমাণ করতে পারবে না যে আমি তোমাদের ঠকিয়েছি।”

মানুষ হলে হয়তো কেঁদেকেটে চলে যেত ওরা কিন্তু ভুতের তো সেসবের বালাই নেই। ঝাঁটা হাতে এগিয়ে এলো সবাই, ঝেঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দিতে লাগল। ঝাঁটার বাড়ির চোটে বিছানা হতে উল্টে পড়ল বিকাশ, চেয়ে দেখল তার রণচণ্ডী বৌ ঝাঁটা হাতে দাঁড়িয়ে আছে।

-“ঘুমের ঘোরে সব বেরিয়ে পড়েছে মিনসের। টুম্পা, চন্দন, মনা, করবী, পম্পা, মালবিকা…….. যা না রে মুখপোড়া ওদের কাছে যা….. আমার কাছে পড়ে আছিস কেন ?”

তড়াক করে উঠে পড়ে বিকাশ, তড়িঘড়ি বাথরুমে ঢুকে পড়ে। আজ সোমবার, অফিসে দেরি হয়ে গেলে আরেকপ্রস্থ দুর্দশা আছে।

#banglasahitya #bangladesh



https://banglasahityamancha.quora.com/





Post a Comment