যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে উপেক্ষিতা দুই বাঙালি নারী - পুলক মন্ডল

 
পুলক মন্ডল

স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালি নারীর অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ উঠলেই আমরা সাধারণত যে নামগুলো উল্লেখ করি তা- প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, মাতঙ্গিনী হাজরা, কল্পনা দত্ত, বীণা দাস, সরোজিনী চট্টোপাধ্যায়(নাইডু), শান্তি-সুনীতি ও আরও অনেকের কথা। এঁরা সকলেই চিরস্মরণীয়, চিরবরনীয়। কিন্তু এঁদের বাইরেও প্রায় নিরক্ষর কিম্বা অর্ধশিক্ষিত বহু গ্রাম্য নারী প্রতক্ষ্যভাবে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছিলেন। 

অগ্নিযুগের সেইসব অসমসাহসী নারীদের অনেকের নাম আমাদের জানা নেই, আবার অনেকেই ইতিহাসে চির উপেক্ষিতা হয়ে আছেন। এবং এমন একটা সময়ে এঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন যখন ঘরের বাইরেই মেয়েরা কদাচিৎ বেরতেন, তার ওপরে আবার ইংরেজদের বিরুদ্ধাচরন! কেউ কল্পনাই করতে পারতেন না।

এমনই দুজন স্মরণীয় নারী হলেন ননীবালা দেবী ও দুকড়িবালা দেবী। একজন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম মহিলা রাজবন্দী এবং অপরজন অস্ত্র আইনে ধৃত প্রথম মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামী। এই দু’জনকে দিয়েই স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম এ দেশের নারীদের প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ।

ননীবালা দেবী জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৮৮ সালে হাওড়ার বালিতে। ১১ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় এবং মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিধবা হন। এরপর তিনি বাবার কাছে ফিরে আসেন। এখানেই তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামে হাতেখড়ি। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র অমরেন্দ্র চ্যাটার্জী ছিলেন বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তর সমিতির সদস্য। ১৯১৫ সালে ননীবালা দেবী অমরেন্দ্রর কাছে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী হওয়ার দিক্ষা নেন।

ওই বছরে বিপ্লবীরা রিষড়া ও চন্দননগরে দুটি বাড়ি ভাড়া নেয়। বছর সাতাশের ননীবালা অভিভাবিকা সেজে পুলিশের খাতায় পলাতক বিপ্লবীদের এই দুই ভাড়াবাড়িতে আশ্রয় দিয়ে রাখতেন। ব্রিটিশের পুলিশ যাঁদের মাথার দাম ঘোষণা করেছে তেমন বিপ্লবী যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়, অমর চ্যাটার্জী সহ অনেকের আশ্রয়দাত্রী ছিলেন তিনি। একবার পুলিশের কাছে ধরা পড়লেন আর এক পলাতক বিপ্লবী রামচন্দ্র মজুমদার। তাঁর কাছে একটি পিস্তল ছিল কিন্তু ধরা পড়ার আগে সেটা তিনি কোথায় রেখেছেন তা জানতে বিপ্লবীরা উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন। 

সেই সন্ধান আনার জন্য রামচন্দ্র বাবুর স্ত্রী সেজে জেলে গিয়ে পিস্তলের খোঁজ নিয়ে এসেছিলেন ননীবালা। আজ থেকে একশো বছর আগে একজন বাঙালি বিধবার সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে পরস্ত্রী সেজে জেলে দেখা করতে যাওয়া পুলিশ তো দুরস্ত কোন বাঙালি মেয়েই কল্পনা করতে পারতেন না। কেননা ধরা পড়লে শুধু শাস্তিই নয়, সমাজচ্যুত হওয়াটাও নিশ্চিত ছিল।

 শেষপর্যন্ত পুলিশ সন্ধান পেয়ে গেল চন্দননগরের এই আস্তানার। তবে পুলিশ আসার আগেই পলাতক হলেন ননীবালা সহ বিপ্লবীরা। ননীবালা তাঁর দাদার এক বন্ধুর সহায়তায় চলে এলেন পেশোয়ার।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ধরা পড়ে গেলেন তিনি। ১৯১৬ সালের প্রথম দিকে। তাঁকে পাঠানো হল কাশীর জেলে, যেখানে বিপ্লবীদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার করা হতো। কুখ্যাত ডেপুটি পুলিশ সুপার বঙ্গসন্তান জিতেন ব্যানার্জী তাঁকে মহিলা জেলকর্মীদের দিয়ে উলঙ্গ করিয়ে শরীরে লঙ্কার গুঁড়ো ছিটিয়ে দিনের পর দিন জেরা করতেন। 

তাঁকে পরপর তিনদিন রোজ আধঘণ্টা করে রাখা হয়েছিল কাশীর জেলের ভয়ংকর শাস্তি কুঠুরিতে, যেখানে একটা মাত্র দরজা এবং ঘরে কোন জানালা নেই এমনকি আলোবাতাস ঢোকার জন্য কোন ছিদ্রও নেই। তিনি প্রতিদিনই জ্ঞান হারাতেন, তবুও একমুহূর্তের জন্যেও জানাননি কোথায় আছেন পলাতক বিপ্লবীরা। অবশেষে ১৯১৮ সালে ৩নং রেগুলেশন অ্যাক্টে তাঁকে প্রেসিডেন্সী জেলে পাঠানো হয়। এখানেই তাঁর সাথে সাক্ষ্যাত হয়েছিল দুকড়িবালা দেবীর সাথে। তিনি ১৯১৯ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দী ছিলেন।

 ননীবালা দেবীই ছিলেন বাংলার প্রথম মহিলা রাজবন্দী। তাঁর শেষ জীবন খুব অবহেলার সাথে কেটেছিল। শেষ জীবনে তাঁকে পুলিশের ভয়ে কেউ আশ্রয় দিতে চান নি। কষ্ট ও দারিদ্রতা ছিল তাঁর জীবনের নিত্য সঙ্গী। ১৯৬৭ সালে প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায় স্বাধীন ভারতে তিনি প্রয়াত হন।

১৯১৪ সালের ২৬ আগস্ট ব্রিটিশের তৈরি অস্ত্র প্রস্তুতকারক সংস্থা রডা কোম্পানির অস্ত্রশস্ত্র প্রায় ২০০টি গোরুর গাড়িতে কলকাতার পথে আসছিল। একটি গাড়ির গাড়োয়ান ছিলেন ছদ্মবেশী বিপ্লবী হরিদাস দত্ত। তিনি সেই গাড়িটিকে নিয়ে উধাও হয়ে যান, তাতে ছিল ৫০টি মাউজার পিস্তল এবং ১২০০০ কার্তুজ । 

মাঝে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও ১৯১৭ সালের ৮ জানুয়ারি পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে ৭টি পিস্তল ও ১০০০ মতো কার্তুজ বাজেয়াপ্ত করে বীরভূমের নলহাটি থানার ঝাউপাড়ার যে বাড়ি থেকে, সেটাই দুকড়িবালা চক্রবর্তীর শ্বশুরবাড়ি। দুকড়িবালাদেবীর বাপের বাড়িও ছিল ওই ঝাউপাড়া গ্রামেই। অবশ্য তল্লাশির খবর পেয়ে তিনি পিস্তল ও কার্তুজ সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় সুরধনী মোল্লানির বাড়িতে সরিয়ে দেন। পুলিশ সে খবরও পেয়ে যায় এবং সেগুলি আটক করে।

 ১৯১৪-১৭ এই তিনবছর অস্ত্রগুলো পালা করে থাকছিল তাঁর বাবার বাড়ি ও শ্বশুরবাড়িতে। বিপ্লবীরা নিয়মিত যাতায়াত করতেন অস্ত্র নেওয়ার জন্য। আর আগ্নেয়াস্ত্র আগলে রাখতেন তিনি, এক প্রত্যন্ত গ্রামের অসমসাহসী যুবতী বঁধু দুকড়িবালা। ইংরেজের পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করলো। কোলের শিশু বাড়িতে রেখে জেলে গেলেন তিনি।

তাঁর বোনপো নিবারণ ঘটক এই পিস্তল ও কার্তুজ রাখতে দিয়েছিলেন তাঁকে। নিবারণ মাসীমা ডাকতেন বলে দুকড়িবালাও স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে সর্বজনীন মাসীমা হয়ে গিয়েছিলেন। নিবারণ হুগলি মহসীন কলেজে পড়তেন। সেখানে তিনি ‘যুগান্তর’ দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। 

পরবর্তীকালে বহু সময় বহু বিপ্লবী ঠাঁই নিয়েছেন এই মাসীমার কাছে। এই ঘটনার পরে দুকড়িবালা ও নিবারণের নামে পুলিশ অস্ত্র আইনে মামলা রুজু করে। সিউড়িতে স্পেশ্যাল ট্রাইবুনালে মামলার বিচার হয় এবং ওই বছরই ৯ মার্চ মামলার রায় বেরোয়। দুকড়িবালাকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও এক বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নিবারণের পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়। 

দুকড়িবালাকে পাঠানো হয় প্রেসিডেন্সী জেলে। এখানে ননীবালা দেবীর সাথে তাঁর পরিচয় এবং সখ্যতা গড়ে ওঠে। স্বাধীনতার লড়াইয়ে দুকড়িবালাই ছিলেন অস্ত্র আইনে ধৃত প্রথম মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামী। ১৯১৮-এর ডিসেম্বরে তিনি জেল থেকে মুক্তি পান। তাঁর শেষজীবনে অবশ্য ননীবালা দেবীর মতো এত করুণ পরিণতি হয়নি। পরিবারের সঙ্গ পেয়েছিলেন। তিনি প্রয়াত হন ১৯৭০ সালে।

স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে এ দেশের নারীদের প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণের পথ যে দুই মহীয়সী বাঙালি নারী দেখিয়েছিলেন, স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে তাঁরাই থেকে গেলেন উপেক্ষিতা।

——————————————————

তথ্যসূত্রঃ ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী’- কমলা দাশগুপ্ত
ছবিতে বাঁদিক থেকে ননীবালা দেবী ও দুকড়িবালা দেবী।

#bangladesh #westbengal #sahityashruti #banglasahitya

Post a Comment