যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

আমরা সেই গুহা পরিত্যাগ করে উল্টো দিকে হাটতে লাগলাম। এখানে খুপড়ি খুপড়ি অনেক বাঁশঝোলা বাসা। পাহাড়ের কোনায় কোনায় চোখে পড়ে পাহাড়ী উপজাতি ললনাদের বিচরণ।

আমরা স্থানীয় লোকের সহযোগিতায় পাহাড় ঘেষে যে জায়গাটায় আসলাম,সেটা অতি মনোরম একটি জায়গা।মনে হচ্ছিলো অনিন্দ সুন্দর প্রকৃতির খুব কাছে চলে এসেছি। আমরা পাহাড়

 

Story and Article


পাহাড়ী ললনার ছলনায় মোরা দুই বন্ধু

মো ইব্রাহীম খলিল


বন্ধু ছগিরকে নিয়ে ২০০৯সালে খাগড়াছড়ি গিয়েছিলাম। আজ গল্পের পটভূমিকায় সেখানকার এক পাহাড়ী কন্যার কাছ থেকে মকাং খাওয়ার গল্প বয়ান করবো। আমরা যে জায়গাটায় গিয়েছি,সেটার কিঞ্চিত পরিচিত আগে একটু দিয়ে নেই–


আমরা স্থানীয় লোকের সহযোগিতায় পাহাড় ঘেষে যে জায়গাটায় আসলাম,সেটা অতি মনোরম একটি জায়গা।মনে হচ্ছিলো অনিন্দ সুন্দর প্রকৃতির খুব কাছে চলে এসেছি। আমরা পাহাড়  ডিঙ্গিয়ে চড়াই উতরাই শহরের দিকে নামতেই আলুটিলা পাহাড়। জেলা সদর থেকে মাত্র ৭ কি.মি. এবং পর্যটন মোটেল থেকে ৫ কি.মি. দূরে মাটিরাঙ্গা উপজেলাতে এটি অবস্থিত। এই পাহাড়ের চূড়া থেকে পুরো খাগড়াছড়ি  শহর অবলোকন করা যায়। এই আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের একটি আকর্ষন রয়েছে। যার জন্য এখানে প্রতিদিন শতশত মানুষের সমাগম। সেটি হচ্ছে পাহাড়ের বুক চিড়ে একটি গুহার জন্ম। এই গুহায় অনেক পর্যটক প্রবেশ করার সাহস দেখাতে চায় না।


আমরা সেই গুহা পরিত্যাগ করে উল্টো দিকে হাটতে লাগলাম। এখানে খুপড়ি খুপড়ি অনেক বাঁশঝোলা বাসা। পাহাড়ের কোনায় কোনায় চোখে পড়ে পাহাড়ী উপজাতি ললনাদের বিচরন। কেহ জুম চাষ করছে, কেহ কাঙ্কে করে পানি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে, কেহ বহিরাগত পর্যটনদের কাছে পাহাড়ী খানা বিক্রি করছে, কেহ বা নিজ নিজ গন্তব্যে পাহাড় ঘেষে যাতায়াত করছে। 


মচাং পাহাড়ে আসতেই এক পাহাড়ী ললনা এসে বলতে লাগলো--বাপু মকাং খাইবা?

ইতিপূর্বে আমার আর বন্ধু ছগিরের উপজাতি এলাকায় ঘুরে নানান তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিলো। এখানে সাধারণত উপজাতিরা যা খায়, তার ৮০%আমরা মুসলমানদের কাছে হালাল নয়। একবার তো "মডার রস " নামক কি এক অদ্ভুত হারাম খানা খাওয়া থেকে উদ্ধার পেয়েছিলাম। আজ এই পাহাড়ী ললনা আবার কোন উজবুক খানার অফার করছে আল্লাহই ভালে জানে। 


আমি ষোলআনা বাঙ্গালিয়ানা খানার চরম ভক্ত। তাই বলে খানার মান দন্ড বিচার বিশ্লেষন করে না খাওয়ার পাত্র আমি নই। বিশেষ করে এই পাহাড়ীদের খানা গুলো। 


ছগির ললনাকে বলতে লাগলো, মকাং কি জাতীয় খানা?

পাহাড়ী ললনা হেসে বলতে লাগলো--বাপু এইডা ভালা। বহুত মজক(মজা) পাইবেন।এইডা তালের রস আতপ চাউলের গুড়া আর বিভিন্ন পাহাড়ী ফলের সাথে পেস্ট করে বানানো। একটু খাইয়া দেহেন। বহুত মজাক পাইবেন?


পাহাড়ী ললনার বর্ণনা শুনে খানাটা হালালই মনে হলো।কলসীর ঢাকনা খুলতেই আজব একটা সুস্বাদু ঘ্রাণ ভেসে আসলো। আহাঃ!এমন অপরুচিত সুঘ্রাণ আমি আমার লাইফে কখনোই পাইনি। গন্ধই বলে দিচ্ছিলো, এটা খাওয়া দরকার। 


বন্ধু ছগির প্রশ্ন করলো, কিভাবে বিক্রি করা হয়?


পাহাড়ী ললনা মোটা  বাঁশের  ঠনা দেখিয়ে বলতে লাগলো-এক ঠনা ২০টাকা। 


আমরা দুই বন্ধু দুই ঠনা মকাং নিয়ে বাঁশের কঞ্চির সাথে শামুকের বিশেষ ছোট চামচ দিয়ে মকাং খেতে লাগলাম। আমি খেয়াল করলাম, প্রায় তিন মিনিটেই বন্ধু ছগির ঠনার সব মকাং খেয়ে পাহাড়ী কন্যাকে বলতে লাগলো, আরেক ঠনা মকাং দিন, ভালোই লাগছে। যেনো অমৃত খাচ্ছি। 


আমারো মকাং খাওয়া শেষ।কিন্তু তৃপ্তি মিটছে না বলে আমিও আরেক ঠনা মকাংয়ের অর্ডার দিলাম। 


ললনা ২য় ডোজের মকাং দিতেই  হাপুর হুপুর করে খেয়ে ১০০টাকা দিয়ে ২০টাকা ফেরত নিয়ে সামনে হাটতে লাগলাম। 


কিছুদূর যেতেই ম্রুমাং কারবারির পল্লীর অপরুপ সৌন্দর্য্যের এক জায়গায় এসে দু বন্ধু বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। হঠাৎ ছগির বলতে লাগলো, দোস্ত  ঘুম আসতাছে আমার। তখন বেলা ১২টা বাজে। ঘুম যে শুধু ছগিরেরই আসছে  তা নয়, আমারো কেমন যেনো ঘুম পাচ্ছিলো। ঘুরতে এসে অবেলায় অপরিচিত জায়গায় এভাবে গহীন বনে ঘুমানোর কথা কল্পনাই করতে পারিনা। হুট করে কেন ঘুম পাচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না।

 

যেহেতু কারবারি ম্রুমাং এর পল্লীতে এসেছি,সুতরাং এখানে বিশ্রামের একটা ব্যবস্থা হবেই।এখানে খুপড়ি ঘর বিশ্রামের জন্য পর্যটকদের ভাড়া দেওয়া হয়।আমরা দুই বন্ধু ম্রুমাং হেডম্যানের কাছে একটা খুপড়ি ঘর ঘন্টা দুয়েকের জন্য ৫০টাকায় ভাড়া নিলাম। 


আমাদের দুই বন্ধুর ঘুম ঘুম ভাব দেখে ম্রুমাং বলতে লাগলো--তোমরা মকাং খাইছো?

ম্রুমাংয়ের কথা শুনে দুই বন্ধু দুইজনের দিকে ক্যাবলাকান্তের মতো চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলাম। 

আমরা যে পিছনে পাহাড়ী ললনার কাছ থেকে মকাং খাইছি,তা এই বেটা জানলো কি করে?খুব অবাক হলাম দুই বন্ধু! 

ম্রুমাং বলতে লাগলো, এইহানে যারাই এই অবেলায় খুপড়ি ভাড়া নিতে আসে, তারাই মকাং খেয়ে আসে। মকাং খেলে ঘুম পায়, তাই বিশ্রামের জন্য এখানে এসে খুপড়ি খুঁজে। 

বন্ধু ছগির ম্রুমাংকে বলতে লাগলো, মকাং কি খারাপ কোনো খানা?

ম্রুমাং চোখ কুঁচকে বলতে লাগলো, বাপু এইডা আমাদের কাছে সাধারণ খানা।তোমরা খাসা বাঙ্গালদের কাছে সাধারন নয়। বাংলা মদ তো তরল পানি হয়। এইটা হইলো ঘন মদ। যাকে বলে মকাং। 

তার মানে আমরা দুই বন্ধু যে পাহাড়ী কন্যার কাছ থেকে সুস্বাদু যে খানা গুলো খেয়েছি, সেগুলো পাহাড়ী ঘন মদ?

ম্রুমাং জবাব দিলো, আলবৎ তোমরা ঘন মদ খাইছো। 

ম্রুমাংয়ের কাছ থেকে শুনেই মন চাচ্ছিলে তখনই বমি করে ফেলি। আহা! অজানা, অচেনা শহরে এসে পাহাড়ী ললনার ছলনায় পড়ে এ আমরা কি খেলাম!  

বন্ধু ছগির দন্ত কটমট করে বলতে লাগলো,ম্রুমাং আংকেল, এই মকাং কিভাবে বানায়?

ম্রুমাং বলতে লাগলো, তালের রস পচিয়ে বাসি গুড়ো আতপ চাউল,পচা পেঁপে,শুকুরের চর্বি, চিনি আর সব মশলা দিয়ে বিশেষ আইটেমে বানানো হয়। 

ম্রুমাং এর কাছে মকাং এর আইটেম শুনে বন্ধু ছগির তো ওয়াক থু..বলেই নিজ গলায় ধরে বমি করার চেষ্টা করতে লাগলো। 

আমারো পেট কেমন মোচড় দিতে লাগলো। যে আমি জীবনে ২৪তম বসন্তে একটা সিগারেটও খাইনি,সেই আমি কিনা পাহাড়ী ললনার ফান্দে পড়ে পাহাড়ী মদ খেয়ে নিলাম? ভাবতেই গা ঘিন ঘিন করছে। ঘুমও পাচ্ছিলো। এমনিতেই তালের রস খেলে ঘুম আসে, তার উপর পাহাড়ী মকাং। 

আমরা খুপড়িতে ঘন্টা তিনেক বিশ্রাম নেই। 

ঘুরতে এসে মকাং খেয়ে এখানেই আমাদের দিন শেষ। তাই রাতটা এখানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। এখানে খানার প্রতি আস্থা আর নেই বললেই চলে। তাই রাতে নির্ভরযোগ্য বিস্কুট নাবিস্কো কিনে নিলাম দুই প্যাকেট। দুই বন্ধু রাতে নাবিস্কো আর পানি খেয়েই ছিলাম। 

বন্ধু ছগির তো প্রতিজ্ঞা করে নিয়েছে, কাল সে ঐ ললনাকে খু্ঁজে বের করবে, কেনো সে আমাদেরকে হারাম মকাংকে হালাল বলে খাওয়ালো! 

পরের দিন আমরা আবারো সেই জায়গায় আসলাম ঐ ললনার খুঁজে। এখানে এসে আমরা পড়ে গেলাম আরেক বিড়ম্বনায়। গতকাল যে মেয়েটির কাছ থেকে মকাং কিনে খেয়েছি, সেই মেয়েটি যে আদৌ কোনটা, সেটাই আমরা বুঝতে পারছিনা। কারন, এখানে সব উপজাতি মেয়েদের চেহারা হুবহু একই রকমের মনে হয়। তবুও কয়েক জন মেয়েকে ছগির বলেই ফেলেছে-গতকাল আমাদের কে মকাং খাওয়ালো? 

সব মেয়েই বলতে লাগলো, বাপু এখানে সবাই মকাং বিক্রি করে, আপনি কার কথা কন?

চেহারা বিড়ম্বনায় ছগির বিরক্ত হয়ে বলতে লাগলো,দূর...সব মাইয়ার চেহারা এক। কোন হারামি যে বালের মকাং খাওয়াইলো। সারা জনম মদের ডিপোর কাছে থেকেও মদ, ইয়াবা, হিরোইন, গাঞ্জা খাইনি।শেষ পর্যন্ত কিনা পাহাড়ে এসে পচা মদ খেলাম!  

বন্ধু ছগিরের জিদটা আরো বেড়ে যাচ্ছিলো। আমি ঐ পাহাড়ী মেয়ে খোঁজার কথা বাদ দিয়ে তারে বললাম, যা হবার হয়েছে।ঐ মেয়েকে আর খুঁইজ্জা লাভ নেই। এদের সব চেহারা একই রকমের। বরং চল্..আমরা ঘুরাঘুরি করি। 

তবে ঐদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, ভুলক্রমেও আর পাহাড়ী অঞ্চলে অজানা পাহাড়ী খানা আর খাবো না। ইয়া আল্লাহ মাফ করো। তোমার এই নাদান বান্ধা না বুঝে পাহাড় দেখতে এসে পাহাড়ী ললনার মিথ্যা ছলনায় হারাম মকাং খেয়েছে।



Post a Comment