যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

তিনি একান্তে বসে শুধুই স্মৃতির জাবর কাটেন আর একরাশ অভিমান নিয়ে দিনপাত করেন.

দীপু ও রঞ্জনরা অতীন বাবুদের অন্যান্য আত্মীয়দের খবর দিয়ে, অতীন বাবুকে পাড়ার পক্ষ থেকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য ফুলের মালা কিনতে গেলো.

 

Story and Article

ছোটগল্প

শিকড়ের টান
অমিতাভ মুখোপাধ্যায়

অতীন বাবুর ছেলে শ্যামল সপরিবারে কর্ম সূত্রে সিডনিতে থাকে . পেশায় চিকিৎসক. স্বামী স্ত্রী দুজনেই. বাড়ীর সঙ্গে যোগাযোগ বলতে মোবাইল ফোন. এই বয়সেই নাতি প্রিয়ব্রত ছবি আকাঁয় বেশ পটু হয়ে উঠেছে, আনন্দ মেলা পত্রিকায় তার কয়েকটি ছবিও ইতি মধ্যে ছাপা হয়েছে . স্ট্যান্ডার্ড টু-তে পড়ে. অতীন বাবু ও তাঁর স্ত্রী সুরমা নাতির ফোনের অপেক্ষায় থাকেন. সপ্তাহে তিন -চার বার কথা হয় ওঁদের. অবশ্যই রাতে. ইদানীং অতীন বাবুর শরীর ভালো যাচ্ছে না. প্রেসার, সুগার, লিপিড প্রোফাইলএর রিপোর্ট সন্তোষজনক নয়. কলকাতার সল্ট লেকে ছেলেরই ফ্ল্যাটএ ওরা থাকেন. ছেলেই মেডিকেল কলেজের এক বন্ধু ডাক্তার, কার্ডিওলজিস্ট মানবেন্দ্র দেবকে বাবা -মার চিকিৎসার দায়িত্ব দিয়েছে.কাছেই তাঁর চেম্বার. কিন্তু মুশকিল হলো ডাঃ দেব অতীন বাবুদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সব খবর দেন না. শ্যামলকেই সরাসরি জানিয়ে দেন.

-'অতীন বাবুকে শুধু সাবধানে থাকার পরামর্শ দেন.' অতীনবাবু জানেন, তাঁর হার্ট এর সমস্যা আছে.বেশী হাঁটা চলা, সিঁড়ি দিয়ে ওঠা নামা করলে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়.মাঝে মাঝে বুকে যন্ত্রণা হয়. তাই প্রায়ই রাত নামলেই আতঙ্কে থাকেন. সুরমা খাটের পাশের টেবিলে জরুরী ওষুধ পত্র রেখে দেন.অসুবিধে হলে তিনিই ডাঃ দেবএর সঙ্গে মোবাইলে কথা বলে নেন. অতীন বাবু নাতির ফোন শুনলে একটু আশ্বস্ত হন. নাতির পাঠানো ছবিগুলি বার বার দেখেন.তখন বেশ খুশিতে থাকেন. এ এক চিরাচরিত অবাধ্য আকর্ষণ. কাউকে বলে বোঝানো যায় না-----

বোলপুরের বাড়িতে অতীন বাবুর এক ভাই, অন্যান্য আত্মীয় স্বজনরা থাকেন. ওঁদেরও একটা ঘর রয়েছে ওখানে. শিকড়ের টান প্রগাঢ় থাকলেও অতীন বাবু সেখানে যেতে পারেন না. যদিও হাওড়া থেকে বোলপুর -শান্তিনিকেতন যাওয়ার অনেক ট্রেন আছে. কিন্তু ছেলের লং জার্নির অনুমতি নেই. কিন্তু আগে বছরে একাধিক বার যেতেন. সে পৌষ মেলার সময়ই হোক বা বসন্ত উৎসবের সময়. অতীন বাবু ছেলে বেলা, পড়াশোনার দিনগুলো সব ওখানেই কাটিয়েছেন. বিদ্যুৎ বিভাগের এসিট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবেই অবসর নিয়েছেন. এককথায় কাজের সূত্রেই --কলকাতায় আসা এবং শেষ পর্যন্ত থেকে যাওয়া. কিন্তু বোলপুরের শৈশব -কৈশোরের স্মৃতি, বিশ্ব ভারতীতে পড়াশোনার দিনগুলি বড় পিছু টানে. বন্ধুবান্ধবরাও ফোনে বলে, 'তুই যে আমাদের একেবারেই ভুলে গেলি, আগে বছরে অন্ততঃ বার দুই আসা যাওয়া করতিস, এখন তো তাও বন্ধ, ডাইরেক্ট এক্সপ্রেস ট্রেন হয়েছে এখন, তাই কিসের অসুবিধে? '

অতীন বাবু কিশোর বেলার বন্ধু দিবাকরের এই হৃদয় বিদারক প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারেন না. তিনি একান্তে বসে শুধুই স্মৃতির জাবর কাটেন আর একরাশ অভিমান নিয়ে দিনপাত করেন.

সুরমা একবার বলে ছিল, চলো কদিনের জন্য বোলপুর ঘুরে আসি. আর এই পাখীর খাঁচার মতো ফ্ল্যাট জীবন আমারও ভালো লাগছে না.
'কিন্তু দুই ডাক্তারকে এসব বোঝাবে কে? ওরা শিকড়ের টানের মর্যাদা বুঝবে না. ওদের শহরেই জন্ম. উচ্চ সুখ বিলাসী জীবন ওদের
-অতীন বাবু স্ত্রীকে বললেন.

সুরমা বললেন, ওদের না জানিয়েই ওষুধ, প্রেসক্রিপশন সব নিয়েই যাবো, ওখানে সুধীন ডাক্তার বাবু তো আছেন. উনার অভিজ্ঞতাও কম নয়.
-তাহলে আগামী মাসেই যাবো ঠিক হলো.
শীতটা একটু কমুক, অতীন বাবু স্ত্রীকে এ কথা বলে একটু আত্ম তৃপ্তিও পেলেন.

এর পর, এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই অতীন বাবু এক রাতে শোবার আগে বাথরুমে যেতে গিয়েই অসুস্থ হয়ে পড়লেন. দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে একটু পিছিয়ে এসে সোফায় বসে পড়লেন. বুকের যন্ত্রণায় কাতর হয়ে সুরমাকে সর্বিট্রেট ট্যাবলেট আনতে বললেন. সুরমা ছুটে গিয়ে এক গ্লাস জল, একটি সর্বিট্রেট ট্যাবলেট ও একাধিক এসপিরিন ট্যাবলেট অতীন বাবুকে খাইয়ে দিলেন. এসব খেয়েও কোন কাজ হলো না. প্রচণ্ড ঘাম শুরু হলো.

সরমা বুঝতে পারলেন, সমস্যা গুরুতর. ডাঃ দেবকে ফোন করলেন. কিন্তু ফোন বেজেই চললো. ডাঃ দেবকে পেলেন না. এই সময়েই প্রিয়ব্রতর রুটিন ফোন এসে গেলো. সুরমা তৎক্ষণাৎ তার বাপিকে মোবাইলটা দিতে বললেন.

-কেন কী হয়েছে ঠাকমা? দাদুকে তোমার ফোনটা দাও. শ্যামল পাশেই কম্পিউটারে একটা কাজ নিয়ে বসেছিল.
কী হয়েছে মা? বাবা ঠিক আছে তো?
সুরমা কাঁদতে কাঁদতে জানালো, তোর বাবা বাথরুম যেতে গিয়ে যেতে পারে নি, সোফায় বসে বুকের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে. আমি সর্বিট্রেট ও এসপিরিন দিয়েছি.

উদ্বিগ্ন শ্যামল বাবাকে ফোনটা দিতে বললো. সুরমা তাড়াতাড়ি মোবাইলটা অতীনকে দিতে গিয়ে দেখলো, ' অতীন তখন সোফায় ঢলে পড়েছে. কথা বন্ধ হয়ে গেছে, বাম চোয়াল টা কেমন বেঁকে গেছে. '
সুরমা শ্যামলকে জানালো, 'তোর বাবা আর কথা বলতে পারছে না তুই মানবেন্দ্র কে একবার ফোন কর.

শ্যামল বুঝতে পারলো, সিভিয়ার এটাক হয়ে গেছে.
-মা তুমি পাশের ফ্ল্যাটে খবর দাও. দীপু, রঞ্জনকে ডাকো. ডিসান হসপিটালে নিয়ে যাও. আমি কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ মুখার্জিকে বা সরকারকে বলছি -অ্যাম্বুলেন্স এসে নিয়ে যাবে.
কুড়ি মিনিটের মধ্যে নীচে আধুনিক ব্যবস্থা সম্মত অ্যাম্বুলেন্স এসে গেলো, সঙ্গে একজন জুনিয়র ডাক্তার.

সে প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসা করে অতীন বাবুর সামনে গিয়ে হাজির হয়ে চোখ মুখ দেখেই - বি পি চেক করে বুকে ম্যাসাজ করতে শুরু করলো.কিন্তু কোন রেসপন্স এলো না. -আপনারা উনাকে অ্যাম্বুলেন্সএ তুলে দিন. দেখি, আই সি ইউ তে নিয়ে গিয়ে কিছু করতে পারি কিনা. ওখানে স্যাররা অপেক্ষা করছেন.
ততক্ষণে শ্যামলের অনুরোধে ডাঃ দেব চলে এলেন.

তিনি পরীক্ষা করে মাথা নীচু করে জানালেন, 'কাকাবাবু আর নেই'. আমি শ্যামলকে সব জানিয়ে দিচ্ছি. 'আই আম সো সরি. উনি আমার দীর্ঘ দিনের পেশেন্ট ছিলেন.কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারলাম না. '

সুরমা ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠলো. কাঁদতে কাঁদতেই সকলের উদ্দেশ্যে বললো, আমাদের আগামী সপ্তাহে বোলপুর যাওয়ার ঠিক ছিল. ইদানীং নাতির ছবি আর বোলপুরের কথা প্রায় সব সময় বলতেন.
শিকড়ের টানে আমাদের আর বোলপুরে যাওয়া হলো না.

ইতিমধ্যেই শ্যামলের ফোন এসে গেলো, 'আমরা মেয়রের চেষ্টায় প্লেনের টিকিট পেয়ে গেছি মা . তুমি কয়েক ঘন্টা অপেক্ষা করো .আমরা আসছি. মানবেন্দ্র অন্য ব্যবস্থাগুলো করে রাখবে. '
সুরমাকে প্রতিবেশী মহিলা বন্ধুরা সান্ত্বনা দিতে লাগলেন .

দীপু ও রঞ্জনরা অতীন বাবুদের অন্যান্য আত্মীয়দের খবর দিয়ে, অতীন বাবুকে পাড়ার পক্ষ থেকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য ফুলের মালা কিনতে গেলো.



Post a Comment