যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

কেন, আজ স্নান না করলে কি হয় ? নাও বেগুনপোড়া রেডি। বাবুর আবার এতো পিঠের মাঝেও মুড়ি ছাড়া চলে না। "

-কেন, আজ স্নান না করলে কি হয় ? ভটচায মশাই মৃদু হেসে বললেন, "হয় না কিছুই, কিন্তু এটা নিয়ম। আজ ব্রাহ্মমূহুর্তে উঠে স্নান করতে হয়। ছোটবেলায় দেখিসনি

 

Story and Article


মকর সংক্রান্তি

সুব্রত মজুমদার


উঠোনের ম্লান রোদে বসে বসে পিঠে খাচ্ছিলেন অঘোরবাবু, পাশেই বসে বসে পোড়া বেগুনের চোকা ছাড়াচ্ছিলেন ভটচায মশাই । মানে আমাদের বিখ্যাত তান্ত্রিক বগলাচরণ ভট্টাচার্য্য ।

ভটচায মশাই অঘোরের দিকে ঈষৎ কটাক্ষপাত করে বললেন, "আজ মকর সংক্রান্তির দিনে বিনা চানে খেতে বসেছিস ?"

-কেন, আজ স্নান না করলে কি হয় ?

ভটচায মশাই মৃদু হেসে বললেন, "হয় না কিছুই, কিন্তু এটা নিয়ম। আজ ব্রাহ্মমূহুর্তে উঠে স্নান করতে হয়। ছোটবেলায় দেখিসনি 'হর হর বোম, হরার মায়ের একটা পিঠে কম' বলে ছেলেছোকরার দল নদীতে স্নান করতে যেত। ওদের সঙ্গে থাকত এক আঁটি করে খড়। স্নান করে খড় জ্বালিয়ে আগুন পুইয়ে ঘরে ফিরত। আমিও যেতাম। এখন বয়স হয়েছে বলে পারি না। ঘরেই স্নান করি।"

-"কিন্তু সব নিয়মের তো কারণ থাকবে কিছু। " একটা গড়াপিঠেতে কামড় দিতে দিতে বললেন অঘোরবাবু।

ভটচায মশাই বললেন,"মকর সংক্রান্তি মানে হল সূর্যের মকররাশি ভোগকালের শেষদিন। জ্যোতিষ মতে সূর্য এক বছরে বারোটা রাশি ভোগ করে। এই এক একটা ভোগকালকে বলা হয় এক একটি মাস। আর এই গণনাকে সাবন গণনা বলে। এই মকর সংক্রান্তির তিথিতেই সূর্য ধনুরাশি হতে মকর রাশিতে যাবেন। অর্থাৎ মকরক্রান্তি রেখার উপর আসে সূর্য।

দেবতারা (ত্রিদেব বাদে ) যে লোকে থাকেন সেখানে দিনরাতের বিস্তৃতি অনেক বেশি। পৃথিবীর হিসেবে ছয়মাস দিন আর ছয়মাস রাত। দেবতাদের দিবাকাল শুরু হয় এই মকর সংক্রান্তির দিন হতেই । ফলে কোনও ব্যক্তি যদি আজ বা এই উত্তরায়নে দেহত্যাগ করে তবে তাকে অপেক্ষা করতে হয় না। যমলোক খোলা থাকায় সহজেই সে যেতে পারে। অন্যথা দক্ষিণায়নে দেহত্যাগ করলে সেই আত্মাকে যমলোকের দিন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এজন্যই পিতামহ ভীষ্ম দেহত্যাগের জন্য এই দিনটি বেছে নিয়েছিলেন।

এছাড়াও মান্যতা আছে যে এই দিনেই রাজা ভগীরথের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে এই দিনেই মর্তে এসেছিলেন দেবতোয়া পবিত্রসলিলা গঙ্গা।

এই মকর সংক্রান্তি ভারতের নানান প্রদেশে নানা নামে পরিচিত। যেমন - বাংলায় সহ উত্তর ভারতে মকর সংক্রান্তি, আসামে মাঘ বিহু, পাঞ্জাবে মাঘী, হিমাচল প্রদেশে মাঘিসাজি, হরিয়ানায় সকরাত, দক্ষিণ ভারতে পোঙ্গল। "

-" হুঁ বুঝলাম। কিন্তু মকর সংক্রান্তিতে পিঠে কেন ?"

-"পিঠে কথাটা এসেছে সংস্কৃত পিষ্টক শব্দ হতে। আর এই পিষ্টক শব্দটির উৎপত্তি পুরোডাশ শব্দ হতে। পুরোডাশ বানানো হত যব বা চালের আটার সাথে বিভিন্ন বস্তু মিশ্রিত করে। যজ্ঞাগ্নিতে তৈরি এই পিঠে উৎসর্গ করা হত দেবতাদের উদ্দেশ্যে। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত সংস্কৃত কবি ভট্টি বলেছেন -

আভিক্ষীয়ং দধি ক্ষীরং পুরোডাশং তথৌষধম ।
হবির্হৈয়ঙ্গবীনং চ নাপ্যুপঘ্নন্তি রাক্ষসাঃ।

সময়টা শীতকাল বলে তিল দিয়ে তৈরি পুর ভরা হয় এই পিঠেতে। তিল একটি উত্তম মানের তেল জাতীয় শস্য, তাছাড়া এর পুষ্টিগুণও অনেক। ফলে শীত প্রতিরোধে ও রসনাবিলাসে তিলের ভূমিকা প্রচুর। এখন অবশ্য নারকেল, মিল্ককেক , মিষ্টি, তরকারি, পোস্ত ইত্যাদিরও পুর দেওয়া হয়। গুড়ে ডুবিয়ে এই পিঠে খাওয়ার কি মজা সেটা তো তোমার চেয়ে কেউ বেশি বুঝবে না।

এই মকর সংক্রান্তি আবার পুরুলিয়া বাঁকুড়ার মতো মানভূমের জেলাতে বেশ বড়সড় করে পালন করা হয়। দীর্ঘ দশদিন জুড়ে। তাই এক মনিব তার কাজের লোককে (মুনিশ ) ডাকতে গেলে সে বলে-

'চাঁউড়ি বাঁউড়ি মকর
আখান ছেঁছান ঘ্যাঁঙান
ছেল্যা কাছড়া টুকিঝাড়া
রাঁইরুই সাঁইসুঁই
তার বিহানে আসবি তুঁই ?'

এই মকর সংক্রান্তিতে জায়গায় জায়গায় মেলাও বসে। দ্বারবাসিনী, গঙ্গাসাগর, জয়দেব তো মকর স্নান আর মকর মেলার জন্যই বিখ্যাত। ছোটবেলায় পিঠে খেয়ে দ্বারবাসিনীর মেলা দেখতে যেতাম। বিশ্বাস কর সে দিনগুলো আজও মনে পড়ে।

মকর সংক্রান্তিতে দুটো জিনিস বাধ্যতামূলক। স্নান আর দান। যেহেতু সূর্য শনির রাশিতে যাবে আর জ্যোতিষ শাস্ত্রমতে শনি আর রবি শত্রুগ্রহ তাই এসময় অশুভ প্রভাব দূর করতে দান ও স্নানের প্রয়োজন। কালো তিল, কম্বল, ঘি, তুলো, জুতো ও বস্ত্র দান করা উত্তম।

মাঘে মাসে মহাদেবঃ যো দাস্যতি ঘৃতকম্বলম।
স ভুক্তা সকলান ভোগান অন্তে মোক্ষং প্রাপ্তি।।
এদিন ব্রাহ্মমূহুর্তে স্নান করে দানধ্যান সম্পন্ন করে তিলের লাড্ডু, পিঠে, খিচুড়ি ইত্যাদি খেয়ে দিন অতিবাহিত করলে সারাবছর ভালো যায়।

তবে তোমার মতো হুজুগে লোক ওসব ছেড়েছুড়ে সোসাল মিডিয়ায় আজগুবি সব সংখ্যা ভাইরাল করতেই বেশি মন দেবে এটাই আমার বিশ্বাস।
নাও বেগুনপোড়া রেডি। বাবুর আবার এতো পিঠের মাঝেও মুড়ি ছাড়া চলে না। "

বেগুনের বাটিটা অঘোরবাবুর সামনে রেখে উঠে গেলেন ভটচায মশাই। অঘোরবাবু অবশিষ্ট পিঠেগুলো রেখে মুড়ি আর বেগুনপোড়ার দিকে মনযোগ দিলেন।



Post a Comment