যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

অরূপের প্রেম: মধুমঙ্গল বিশ্বাস, দৌড় প্রকাশনা, মিলনপল্লি, হৃদয়পুর, কলকাতা-৭০০১২৪,মূল্য-৫০ টাকা।, চলভাষ:৭৫৯৫০৬০৯৭৭, প্রচ্ছদ:নীলিমা দেব।

অরূপের প্রেম: মধুমঙ্গল বিশ্বাস, দৌড় প্রকাশনা, মিলনপল্লি, হৃদয়পুর, কলকাতা-৭০০১২৪,মূল্য-৫০ টাকা।, চলভাষ:৭৫৯৫০৬০৯৭৭, প্রচ্ছদ:নীলিমা দেব।

 

Story and Article

আত্মদর্শনের কাব্য 

 💥


তৈমুর খান 

🫂


মধুমঙ্গল বিশ্বাসের 'অরূপের প্রেম'(প্রথম প্রকাশ নভেম্বর ২০২১)১২টি পর্বে রচিত একখানি কাব্যগ্রন্থ। তাঁর কাব্যধারায় এটি একটি নব সংযোজন। ভাবনায়, বিনির্মাণে, চিত্রধর্মিতায় বাংলা কবিতা পাঠকের কাছে অবশ্যই একটি ভিন্নতর প্রাপ্তি।


   এই কাব্যে কবি মধুমঙ্গল বিশ্বাস তাঁর কাব্য ভাবনাকে এক দার্শনিক প্রান্তর দান করেছেন। তাই তাঁর প্রেম ও পয়ারকে পার্থিব জীবনের মোহটান থেকে মহাজীবনের অনন্তের পথে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। মধুমঙ্গল বিশ্বাস বিশ্বাস করেন মৃত্যু পার্থিব জীবনকে অদৃশ্য করে দিতে পারে, কিন্তু মহাজীবনের কাছে অসীম অনন্তে তাকে পৌঁছে দেয়। সেখানে বিরামহীন বিরাট আত্মার বিস্তারে ক্ষুদ্র জন্মের গণ্ডি থাকে না। মৃত্যু ও জন্মের সন্ধিক্ষণ মুছে যাবে। পার্থিব জীবনের পরাজয় শূন্যতাও আর থাকবে না।  কবি একবার পার্থিব জীবন এবং একবার অপার্থিব জীবনের দিকে তাকিয়ে উপলব্ধি করলেন—


 পার্থিব জীবন:  পরাজয়ের কথা বলছে

 অনন্ত জীবন:   ব্রহ্ম সত্যের জ্ঞানযোগ


    কামনা-বাসনার ঊর্ধ্বে কমের মধ্যেও নিষ্কামের দ্যুতি। বন্ধনের মাঝেও মুক্তির দিগন্ত।


 কেননা জীবাত্মার মধ্যেই পরম আত্মার অবস্থান সূচিত হয়। তাই প্রতিটি আত্মার মধ্যেই আছে ব্রহ্ম ভাব। কেবল জ্ঞানীরাই এই ভাব দ্বারা চৈতন্য লাভ করেন। শাস্ত্রেও বলা হয়েছে:


"নিত্যঃ অনিত্যানাং চেতনশ্চেতনানামেকো বহূনাং যো বিদধাতি কামান্ ।

তমাত্মস্থং যঃ অনুপশ্যন্তি ধীরাস্তেষাং শান্তিঃ শাশ্বতী নেতরেষাম্’।।" (কঠোপনিষদ-২/২/১৩)।।


অর্থাৎ সকল অনিত্যের মধ্যে যিনি নিত্য, সকল চেতন বস্তুর মধ্যে যিনি স্বয়ং চৈতন্য এবং যিনি একমাত্র সকলের মনোবাঞ্ছা পূরণে সক্ষম, তিনিই পরমাত্মা। যে সব প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি এই পরমাত্মাকে নিজ আত্মারূপে দর্শন করেন, কেবল তাঁরাই মনে অপার শান্তি লাভ করেন। অন্যেরা এই শান্তি থেকে বঞ্চিত হন।


 কবি মধুমঙ্গল বিশ্বাসের এই বোধ সঞ্চারিত হয়েছে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে। আত্মা পরমাত্মা দূরত্ব কমেছে। পার্থিব নারীর শরীরেও পরমাত্মার শরীর জেগে উঠেছে। জগৎ হয়েছে ব্রহ্মময়। অনিত্য ব্রহ্মময় নিত্যের দরজায় করাঘাত করেছে। প্রাত্যহিকও অনন্তের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। কবি লিখেছেন:


"বজ্রবিদ্যুতে রটে গেল গোটা পাড়া।বৃষ্টিতে বর্ষণে

ভরে উঠল মনের উঠোন। মানে-অভিমানে পূর্বরাগের

সরগম হয়ে উঠল জোনাকির আলো। তুমি বললে

তুমি বলো। আমি ভাবলাম, নীরবতা। তুমি

বললে, ভাষাহীন। আমি বললাম,প্লেটোনিক।"


    এই পূর্বরাগ ব্রহ্ম-পূর্বরাগ,পরমাত্মার কাছে জীবাত্মার প্রথম প্রেমের জড়তা বা আড়ষ্টতা। আনত শিরে আত্মসমর্পণ। তারপরেই অনন্তের সম্মতি। জীবাত্মার শিহরন ও আত্মবিকাশ:


 "দূরত্ব কমতে লাগল

 দূরত্ব কমতে থাকে

 মনে হল, ক্রমে আলো আসিতেছে

 বিমূর্ত তরঙ্গে বিভঙ্গ জেগে উঠতে চায়

 সুগন্ধী মেঘেদের দেশে গর্ভের সঞ্চার

 তোমার মন আর তোমার শরীর পৃথক থাকতে চাইছে না

 মনের মধ্যে রুয়ে দিচ্ছ আশ্লেষ

 মনের মধ্যে রুয়ে দিচ্ছ শরীর"


    অবশেষে এই মিলনে কবির আত্মদর্শন ঘটেছে। মনের মধ্যে অরূপের শরীর এসে ধরা দিয়েছে। জীবাত্মা পরমাত্মার ভেদ মুছে একাকার হয়ে গেছে। ব্রহ্মসূত্রে উল্লেখ আছে:


অবস্থিতেরিতি কাশকৃৎস্নঃ’।। (ব্রহ্মসূত্র-১/৪/২২)।।

 অর্থাৎ কাশকৃৎস্ন মুনি বলেন, পরমাত্মাই দেহের মধ্যে জীবাত্মারূপে অবস্থিত। সুতরাং জীবাত্মার মনে  পরমাত্মার শরীরই অবস্থান করে। একথা আরও স্পষ্ট করলেন কবি পরের অংশে:


"বৃষ্টির উৎসব রূপের উৎসব অরূপের পারাপার

আমাকে জড়িয়ে ধরে

আমাকে…"


   এই আত্মদর্শন অরূপ ব্রহ্মদর্শন হয়ে উঠলে, পার্থিব জীবনের মায়া-মোহ, কাম-ইন্দ্রিয়, নারী-অঙ্গ, পোশাকহীনতা, রূপ-মাধুর্য, যোনিপীঠ, রঙিন-নখ, ঊরুসন্ধি, চুম্বনপ্রয়াসী ভেজা-ওষ্ঠ, শঙ্খচূড়-স্তন সবই ব্রহ্মঅঙ্গ হয়ে যায়। যেখানে কামই নিষ্কাম, সেখানে এইসব অঙ্গও ব্রহ্মযাপনের অনন্ত সোপানে পরিণত হয়। পার্থিব জীবনের আসক্তি, ক্ষুন্নিবৃত্তি, বাসনা-কামনার ঊর্ধ্বায়নে অনন্ত আনন্দের প্রজ্ঞায় তা চির সৌন্দর্যের রূপ পায়। তাই কাব্যের শেষ পঙক্তিটি এভাবেই লেখেন কবি:


"আর চিঠি নয়। তোমার ঘাটের সব খেয়া খুলে দিলাম। অরূপ তোমার

 রূপে সরগম হোক।শরীরের ঊর্ধ্বে হোক অরূপসঙ্গম।"


 এই অরূপ সঙ্গমের যাত্রায় উৎস কিন্তু পার্থিব জীবন। বাউল দর্শনে শরীরের মধ্যেই অরূপের মহাভাণ্ড উপলব্ধ হয়। মনেই থাকে মনের মানুষ। বাহির-পানে তাকে খোঁজা বৃথা। এই কবির মধ্যেও মনের মানুষ জেগে উঠেছে। তাই বাহিরের ক্রিয়াকর্মে তার আলো পড়েছে। এভাবেই তো আত্মদর্শন! বিখ্যাত নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ একটি উক্তিতে প্রকাশ করেছিলেন:


"Better keep yourself clean and bright; you are the window through which you must see the world."


 অর্থাৎ নিজেকে পরিষ্কার এবং উজ্জ্বল রাখো; তুমি সেই জানালা যেখান দিয়ে তোমাকে পৃথিবী দেখতে হবে। এই আত্মদর্শন কবি মধুমঙ্গল বিশ্বাসের আয়োজনেও প্রতিফলিত হয়েছে। নিজের মধ্য দিয়েই অনন্তকে প্রতিফলিত করেছেন।


🦋

 অরূপের প্রেম: মধুমঙ্গল বিশ্বাস, দৌড় প্রকাশনা, মিলনপল্লি, হৃদয়পুর, কলকাতা-৭০০১২৪,মূল্য-৫০ টাকা।, চলভাষ:৭৫৯৫০৬০৯৭৭, প্রচ্ছদ:নীলিমা দেব। 


(ছবিতে মধুমঙ্গল বিশ্বাস ও তাঁর কাব্যগ্রন্থ) 

Post a Comment