যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

'ভারতবর্ষ' ও 'হিন্দু' বলে কিছু ছিল না। আর 'মুসলমান'-এর তো অস্তিত্বই ছিল না।

বুদ্ধদেবের জীবৎকালে এই উপমহাদেশ প্রথম ইতিহাসের আলোকে আসে। তখন ছিল ষোড়শ মহাজনপদ। 'ভারতবর্ষ' ও 'হিন্দু' বলে কিছু ছিল না। আর 'মুসলমান'-এর তো অস্তিত্বই ছ

 

Story and Article


'হিন্দু', 'হিন্দুস্তান', 'ভারতবর্ষ'— শব্দগুলির উৎপত্তি

নিয়ে ইতিহাস কী বলে

নবিউল ইসলাম

'হিন্দু' শব্দটি ধর্মীয় পরিচয়-জ্ঞাপক হয়ে উঠত না, যদি না ইতিহাসের তথ্যকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ব্যাখ্যা না করা হত। 'হিন্দু' শব্দটি প্রথমে ছিল ভৌগলিক পরিচয়-জ্ঞাপক। এবং 'হিন্দুস্তান' ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত পরিস্কারভাবেই ভৌগলিক সংজ্ঞার মধ্যেই থেকেছে। 'হিন্দুস্তান' যে ভারতবর্ষের সমার্থক শব্দ তা বোধ করি ইকবালের 'সারে জাঁহা সে আচ্ছা হিন্দুস্তান হমারা'-তে স্পষ্ট। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে হিন্দুজাতি নামক এক পৃথক জাতি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন হয় এবং বিপরীতে মুসলমানদের মধ্যেও মুসলমান জাতি গঠনের ধারণা জন্মলাড করে। এই পর্যায়ে ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের শেখানো তত্ত্বকে জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকগণ আঁকড়ে ধরে বলে গেলেন, প্রাচীন ভারতবর্ষের আদর্শ ও ঐতিহ্যময় হিন্দুজাতির কাছ থেকে মুসলমানরা তরবারির জোরে শাসন ক্ষমতা দখল করেছিল। সুতরাং মুসলমানদের কাছ থেকে ইংরেজদের ক্ষমতা দখল নায্য ও যুক্তিসঙ্গত। যে ব্রিটিশ ঐতিহাসিকগণ বললেন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন দৈবানুগ্রহ, তাতে জাতীয় ঐতিহাসিকগণের ওই ব্যাখ্যা আরও বেশি শক্তি জোগাল। যে উদ্দেশ্য নিয়ে ইংরেজ ঐতিহাসিকগণ ভারতবর্ষের ইতিহাসের ধারাকে প্রাচীন যুগের পরিবর্তে হিন্দুযুগ এবং মধ্যযুগের পরিবর্তে মুসলিম যুগ বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন, জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকগণ তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করায় ইংরেজ ঐতিহাসিকগণের চক্রান্তমূলক ইতিহাস ব্যাখ্যা অনেকখানি সফল হয়ে যায়। জেমস্ মিলের রচিত ভারত-ইতিহাসে শুধু সাম্রাজ্যবাদী অহংবোধই নেই, আছে তথ্যের বিভ্রান্তিও। যা পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকদের দ্বারা সমর্থিত হওয়ায় শিক্ষিত মহলও ইতিহাসগত চিন্তার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির বেড়াজালে আঁটকে পড়ে। যার জের আজও চলছে সমানে।

জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক গোষ্ঠীর প্রাণপুরুষ বলা যায় রমেশচন্দ্র মজুমদারকে। এছাড়া জি এস ঘুরে, আশীর্বাদলাল শ্রীবাস্তব প্রমুখ জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকগণ ছিলেন এই তত্ত্বের অনুসারী। বাংলার ইতিহাস চর্চাতেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তারাকৃষ্ণ হালদার এবং ভোলানাথ চক্রবর্তী ১৮৭৬-এ 'যবন' শাসনের কুফল এবং ব্রিটিশ শাসনের মঙ্গলদায়ী সুফলের ধারাবিবরণী তাঁদের রচনায় দিয়েছেন। ১৮৭৮ সালে তারিণীচরণ চট্টোপাধ্যায় তাঁর রচনায় প্রাচীন যুগের প্রভূত জয়গান করেছেন। এই ঐতিহাসিকগণই তাঁদের ইতিহাস চর্চাকে 'নতুন ছক' এবং 'জাতীয় ইতিহাস' বলে দাবী করেন।

যে তিনটি পর্বে ভারতীয় ইতিহাসকে ভাগ করা হয়েছে তার প্রথমটি প্রাচীন যুগ বা হিন্দু যুগ। খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ সাল থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই সময়কালকে হিন্দুযুগ বলার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সেই সময় উপমহাদেশের শাসকগণ সবাই ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এখানে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, রাজবংশের নিরীখে কি সবাই হিন্দু ছিলেন? মৌর্য, ইন্দো-গ্রীসিয়, শক, কুষাণ প্রভৃতি রাজবংশ অহিন্দু ছিল। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন অনেকে। হিন্দু বিদ্বেষী না হলেও তাঁরা বৌদ্ধ পরিচয়ে অবিচল থাকতেন। পর্ব ভাগের যুক্তিতেই বলতে হয়, তাহলে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সাল থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই সময়কালকে বৌদ্ধযুগ বলা উচিত ছিল। ভারতে যেহেতু বৌদ্ধধর্ম সেভাবে প্রতিষ্ঠা পায়নি, না হলে হয়তো বা এই দাবিও জোরালো হয়ে উঠতো।

হিন্দুযুগ বা হিন্দুজাতি বা হিন্দুধর্ম এই শব্দগুলি ব্যবহারের ক্ষেত্রে 'হিন্দু' শব্দটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য কি সেটা বুঝলেই 'হিন্দুযুগ' হিসেবে ইতিহাসের পর্বভাগ যে অযৌক্তিক, অসার, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও আরোপিত তা স্পষ্ট হয়ে যায়। সাম্প্রতিক ইতিহাস গবেষণায় প্রাচীন যুগ সম্পর্কে অনেক তথ্যই পরিষ্কারভাবে জানা যাচ্ছে। জানা যাচ্ছে 'হিন্দু' শব্দটির উৎপত্তি সম্পর্কেও।

বুদ্ধদেবের জীবৎকালে এই উপমহাদেশ প্রথম ইতিহাসের আলোকে আসে। তখন ছিল ষোড়শ মহাজনপদ। 'ভারতবর্ষ' ও 'হিন্দু' বলে কিছু ছিল না। আর 'মুসলমান'-এর তো অস্তিত্বই ছিল না। 'ভারতবর্ষ' ও 'হিন্দু' নামকরণ হয়ে ওঠার আভাস আগে হয়তো থেকে থাকতে পারে, কিন্তু নাম দু'টি তখন ছিল না। 'হিন্দু'র'র আগে ভারতবর্ষ নামের ইতিহাস পাওয়া যায়। ১০৩০ খ্রিস্টাব্দে আল বিরুনী 'আল হিনদ্' নামক ভারতবর্ষের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার আগে এদেশের লোকেরা নিজেদের দেশকে 'ভারতবর্ষ' এবং নিজেদেরকে 'ভারতী' ('ভারতীয়' নয়) বলে পরিচয় দিত। ঐতিহাসিকরা বলছেন, এই ভাবে পরিচয় দেওয়াটা এবং 'ভারতবর্ষ' নামের উৎপত্তি হয় এদেশে মুসলমানদের আগমনের আনুমানিক সাতশো বছর আগে। আর মুসলমানদের আগমনের পরে 'হিন্দু' নামের উৎপত্তি। মুসলমানরাই প্রথম 'হিন্দু' নামকরণ করেন। 'হিনদ্' থেকে 'হিন্দু'। তবে 'হিনদ্' শব্দটির পেছনের ইতিহাস সম্বন্ধে মুসলমানরা তখনও ওয়াকিবহাল ছিলেন না। ভারতবর্ষের প্রাচীনতম গ্রন্থ 'ঋক সংহিতা'র প্রচার সিন্ধুনদের ও তার অববাহিকা অঞ্চল জুড়ে পাওয়া যায়। ওই গ্রন্থে সিন্ধুনদের উল্লেখ আছে 'সপ্তসিন্ধবঃ' নামে। আর জেন্দাবেস্তায় তার উচ্চারণ হয়েছে 'হপ্তহিন্দু' নামে। প্রাচীনকালের কোন এক সময় এই উপত্যকা ছিল ইরানের দুই প্রধান রাজবংশ হখামনীশ ও সামানদের দখলে। হখামনীশদের শিলালিপিতে পাওয়া যায় '(হি (ন্) দু) শব্দটি। আর 'হিন্দুস্তান' শব্দটি পাওয়া যায় সামানদের শিলালিপিতে। 'হিন্দু' বা 'হিন্দুস্তান' ছিল প্রাচীন ইরান সাম্রাজ্যের সিন্ধুপ্রদেশ। গ্রীক ভাষায় 'হিন্দু' উচ্চারণ হত 'ইন্দোই' বা 'হিন্দোই' নামে। আর ল্যাটিন ভাষায় যার উচ্চারণ হয় 'ইন্ডা'। 'ইন্ডা' অপভ্রংশ হয়ে পরবর্তীতে 'ইন্ডিয়া' রূপ নেয়। সামানদের হটিয়ে যখন আরবরা ইরান দখল করে, তখন 'হিন্দস্তান' শব্দটি আরবি ভাষায় প্রবেশ করে। আল বিরুনী ভারতবর্ষ সম্বন্ধে তাঁর রচনা লেখার সময় হিন্দস্তানের মানুষদের 'হিন্দু' বলে উল্লেখ করেন। তাই এটা পরিস্কার যে, আজকে 'হিন্দু' বা 'হিন্দুধর্ম' বলতে যা বোঝানো হচ্ছে তার কোন অস্তিত্বই ছিল না। তাই, জেমস্ মিল ভারতীয় ইতিহাসের যে পর্ব ভাগ করেছেন তা আদৌ সঠিক নয়। সাম্প্রতিক ইতিহাস গবেষণা সেটাই প্রমাণ করে।

প্রায় সাড়ে সাতশো বছরের শাসনকালকে দিব্যি বলা যেত মধ্যযুগ। তা না বলে বলা হল মুসলমান যুগ বা মুসলমান আমল। এই শব্দগুলির ব্যবহারে এখনও খামতি নেই। এখনও মুসলমানদের মধ্যে গোঁড়া আর ইসলাম ধর্মের টেন্ডারধারীরা আত্মপ্রসাদ লাভ করে এই দীর্ঘ শাসনকাল তাদের মনে করে। অপর দিকে ওরকম হিন্দুরা 'যবন' নেড়েদের হাতে দীর্ঘকাল 'পবিত্রভূমি'র শাসন ক্ষমতা থাকাটাকে নিজেদের লজ্জা ভেবে মুসলমানদের শাপসাপান্ত করে যাচ্ছে। উভয় ধর্মের এই গোঁড়াদের ভুল ঐতিহাসিক তথ্যই আজ জন্ম দিযে চলেছে বিভৎস সম্প্রদায়গত সংকট।


--------------------------

# ক্রম পর্যায়ে এই সিরিজে আরও কিছু লেখা প্রকাশিত হবে। অংশ/৩

Post a Comment