যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

কথা উঠেছে, আমি নাকি অবৈধ প্রেমে লিপ্ত ছিলাম । খুব সস্তা অভিযোগ । কিন্তু এটাই তো বোধগম্য নয় কোনটা বৈধ আর কোনটা অবৈধ ?

মরতে আমি ভয় পাইনা । কিন্তু আমি যে একজন মা । ভয় পাচ্ছি আমার ছেলেকে নিয়ে । সে প্রায় একমাস আমার সঙ্গে ভালো করে কথা বলেনি । ভালো করে খাওয়াও হচ্ছেনা তার ।

 

Story and Article

লাঞ্ছিতার জবানবন্দি 

কলমে রথীন্দ্রনাথ রায়


ভদ্রমহিলা ধরাগলায় আবার বলতে শুরু করলেন, কি লাভ আমার লাঞ্ছনার কথা আপনাদের চ্যানেলে তুলে ধরে  ? তাতে আপনাদের চ্যানেলের টিআরপি হয়তো বাড়বে । কিন্তু আমার লাঞ্ছনা বাড়বে বৈ কমবে না । আমাদের দেশে প্রতিমুহূর্তে কতো মেয়ে লাঞ্ছিতা হচ্ছে, তার খবর রাখেন  ? আসলে আমাদের সমাজে মেয়েদের স্বাধীনভাবে মাথা তুলে দাঁড়াবার ক্ষেত্রে হাজারো প্রতিবন্ধকতা । সে শিক্ষিতা হোক অথবা অশিক্ষিতা । যাই হোক না কেন পুরুষের ইচ্ছেয় বাধা দিতে পারেনা । চারপাশের হ্যাংলামির মধ্যে আমার মতো সহায় সম্বলহীনার পক্ষে লড়াই করা সম্ভব ছিলনা । বলতে পারেন, এটাই আমার দুর্বলতা । স্বামীর মৃত্যুর পর অবলম্বন বলতে কিছু ছিলনা । কোলে ছমাসের ছেলে ।সেইসময় ছেলের মুখে তুলে দেবার একদানা খাবারও আমার ঘরে ছিলনা । আমি একজন মা । আমি পারিনি নিজেকে সংযত রাখতে । একমাত্র সন্তানকে বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত  -- আপনি বলছেন, আমি লড়াই করতে প্রস্তুত ছিলামনা । কিন্তু কি করে বোঝাই আপনাকে যে মেয়েদের শরীরটাই তাদের কাছে একটা বোঝা । সমাজ নামক এই হৃদয়হীন যণ্ত্রটা সেকথা বুঝতে চায়না । ছেলেকে বাঁচাতে সেই হৃদয়হীন যণ্ত্রের কাছে নিজেকে বাজি রেখেছিলাম । হেরে গেছি । আমি জানি আমি কোনো অপরাধ করিনি । অপরাধ যদি কোথাও হয়ে থাকে সে এই সমাজ ব্যবস্থার জন্যই । যেখানেই গেছি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে পরোপকারীর দল । বিনিময়ে চেয়েছে --

আই অ্যাম আনএবেল টু সে মোর । এক্সকিউজ মি । কথা উঠেছে, আমি নাকি অবৈধ প্রেমে লিপ্ত ছিলাম । খুব সস্তা অভিযোগ । কিন্তু এটাই তো বোধগম্য নয় কোনটা বৈধ আর কোনটা অবৈধ  ? বিবরকেন্দ্রিক পুরুষশাসিত সমাজে মেয়েদের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার পথে এত বেশি অন্তরায় যে গুলোকে অতিক্রম করা সহজ হয়ে ওঠেনা । অক্টোপাসের মতো চারপাশ থেকে তাদেরকে পিষে ফেলা হচ্ছে । কোনো একজন স্বাধীনচেতা মেয়ে যখন রুখে দাঁড়ায় তখনই শুরু হয় আক্রমণ । শালীনতার সীমা অতিক্রম করে তার ওপর বর্ষিত হয় অসংখ্য অশ্লীল গালাগালি । আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি । তাই আবার বলছি, কেন এসব  ? অন্ধকারেই হারিয়ে যাকনা আরো একজন লাঞ্ছিতার বোবাকান্না । কথা বলতে বলতে চোখদুটো জলে ভরে এসেছে । আপনার মনে হতে পারে এটাও বুঝি মেকি । কিন্তু বিশ্বাস করুন , এই চোখের জল ফেলা ছাড়া কীই বা করার আছে আমার  ? 

যেদিন আমি ধর্ষিতা হলাম, মানে গণধর্ষিতা হলাম  -- সেদিনের কথা আপনাদের চ্যানেলেও  তুলে ধরা হল বেশ বেশ রসিয়ে রসিয়ে । টিআরপি বাড়ল । বলতে পারছিনা এমন অনেক কথা বলা হয়েছিল সেই প্রতিবেদনে । এক ধর্ষিতা মেয়ের গল্প জেনে আদিরসে আপ্লুত হয়েছে আপনাদের দর্শকরা ।মহিলা সংগঠনগুলিও ক'দিন চিৎকার চেঁচামেচি করল । পুলিশ তদন্তের নামে আমাকে অনেক টানাহ্যাঁচড়া করল । তারপর কোনও এক অদৃশ্য অঙ্গুলিহেলনে সব থেমে গেল । আজ একমাস পরেও অভিযুক্তদের ধরতে পারলনা । যেহেতু তারা একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সদস্য ।এই যদি অবস্থা হয় তাহলে কি  আপনাদের চ্যানেলে আমার জবানবন্দি প্রকাশের দরকার আছে  ? ওই রাজনৈতিক দলের তরফে আমার চরিত্রে কালি লাগিয়ে দোষীদের আড়াল করার চেষ্টা চলছে । খুনের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে আমাকে । মরতে আমি ভয় পাইনা । কিন্তু আমি যে একজন মা । ভয় পাচ্ছি আমার ছেলেকে নিয়ে । সে প্রায় একমাস আমার সঙ্গে ভালো করে কথা বলেনি । ভালো করে খাওয়াও হচ্ছেনা তার । ওর জানা দরকার যে ওর মায়ের কোনও দোষ ছিলনা । ওর জানা দরকার যে ওর মা এই সমাজের কয়েকজন লোভী মানুষের দ্বারা লাঞ্ছিতা, ধর্ষিতা । আপনারাই পারেন এক ধর্ষিতার বোবাকান্নার ভাষা বুঝতে । 

এর বেশি আর কি বলার আছে আমার  ? 



11/01/2022


Post a Comment