যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

মণিভূষণের কবিতা প্রণবেন্দুর কবিতার ঠিক বিপরীত পথের পথিক।

কবি শামসুল হকের কবিতায় গ্রামীন পরিবেশের কথা তো আছেই, আরো আছে শাণিত ক্রোধ আর বিদ্রূপ । শ্লেষদীপ্ত ভঙ্গিতে তিনি পাঠক চিত্রের চারদিকে আঘাত করেন।

 

Story and Article


ধারাবাহিক প্রবন্ধ :

________________________

কবিতার রূপকল্প : পর্ব: ২১
“”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””

||জীবনানন্দ পরবর্তীকাল এবং আধুনিক কবিতার আন্দোলন||
“””””””””'”””””‘””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””
সৌম্য ঘোষ
“”””””””‘”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””

পঞ্চাশ দশকের কবিদের পরবর্তী প্রজন্মে এক ঝাঁক প্রতিভাবান কবির আত্মপ্রকাশ ও সমাবেশ ঘটে বাংলা কবিতার অঙ্গনে। তাঁদের মধ্যে আছেন প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, মণিভূষণ ভট্টাচার্য, পবিত্র মুখোপাধ্যায়, গীতা চট্টোপাধ্যায়, শামসুল হক , বিজয়া মুখোপাধ্যায়, তুষার রায়, শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, নবনীতা দেবসেন, দেবদাস আচার্য, মঞ্জুস দাশগুপ্ত, সুব্রত চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, কালীকৃষ্ণ গুহ, কেতকী কুশারী ডাইসন প্রভৃতির মত খ্যাতিমান কবিগন । এঁরা সকলেই প্রায় ১৯৩৫ থেকে ১৯৪০/৪২ সাল নাগাদ জন্ম গ্ৰহন করেছেন ।

প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত
___________________
প্রণবেন্দু আত্মপ্রকাশের প্রথম থেকেই অম্লান সন্তাপহীন জীবনের কথা বলেছেন হার্দ্য নিচু স্বরে। ‘হাওয়া বয়ে যায়, নিখিল আর সদারঙ্গময় এই জীবনে।’ অতি সাধারণ তুচ্ছ ঘটনাও তাঁর কাছে সুশ্রী হয়ে ওঠে :
“দেয়ালে দেয়ালে
শ্যাওলার সবুজ আলো চোখের আরাম মনে হয়।
কে যেন বিশাল হাত বাড়িয়ে রেখেছে, ছুঁয়ে যায়-
চুমুর মতোন স্বাদ, ঠোঁটের ভেতরে ভরে ওঠে।”

প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের কবিতায় একটা পেলব মেদুরতা কবিতা পাঠকদের মুগ্ধ করে :

প্রেম
“”””””””

“প্রেম আসে, বুকের পাথর সরে যায়,
প্রেম যায়, বুকের পাথর ভিড় করে।

পৃথিবী যে কারাে কারাে কাছে
খুব সুন্দর জায়গা, তাতাে তুমি বুঝে উঠতে পারাে।
একটানা অন্ধকারে চোখ রেখে দিলে
মাঝে মাঝে দু’একটি আকার উঠে আসে।
একটি তরুণী আজ মাঝরাতে একলা বাড়িতে রয়েছে।
বেণী বাঁধবার ছলে, সমস্ত আয়নার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
কে দিয়েছে তার বুকে ঢেউ, কে তার নয়নে
আলাে জ্বেলে দিলাে ?

এ-ই প্রেম, এই শুধু আড়ালে আড়ালে
কাজ করে ; সময় ফুরােলে, খসে পড়ে।

পাথরখণ্ডগুলাে আস্তে আস্তে সরে যায়,
স্রোত পালটিয়ে গেলে ফের ফিরে আসে।।”

মণিভূষণ ভট্টাচার্য
_____________________

মণিভূষণের কবিতা প্রণবেন্দুর কবিতার ঠিক বিপরীত পথের পথিক। বন্দুক ধরতে পারেন না বলে কবিতা লেখেন এমনটা নয় । ‘কবিতার শব্দ আরো বহু দূরে যায়’। নারীর মাদকতা ও প্রকৃতির উন্মাদনা নিয়ে তিনি কবিতা লিখেছেন, আবার ‘নৈরাশ্যবাদী কথকতা’ নিয়ে বিদ্রুপের কবিতা । সত্তর দশকের রাজনীতির অভিঘাতে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে শব্দের তলোয়ার, ঘৃণার দলিল। তিনি আর ‘আত্মঘাতী শব্দের মজুর’ হয়ে থাকতে রাজি নন । তাঁর অভিমুখ ‘দীর্ঘস্থায়ী অগ্নি সাধনার দিকে ।’ শ্রীকৃষ্ণের অগ্রজ শ্রীবলরাম মণিভূষণের চোখে ভূমিহীন কৃষক নেতা :

“তাঁর দিগন্ত চিরে ফেলা লাঙ্গলের ফলায়,
সেই ক্রান্তিকালীন ইস্পাত-ফলকে ঝলসিত হতে পারে
নতুন কুরুক্ষেত্র-বিধৌত সূর্যালোক এবং
দু-এক পোঁচ কর্ষিত রক্তের দাগ ।”

অজ্ঞাতবাসের পর সশস্ত্র পান্ডবদের ফিরে আসার কথা তিনি লেখেন :
“স্বজনের হৃদপিণ্ড খেয়ে / স্বজনেরা এখন ঘুমাক–/ চেতনায় দৃপ্ত সিংহরূপে / অগ্নিপুত্র, তুই জেগে থাক্ ।”

পবিত্র মুখোপাধ্যায়
___________________

পবিত্র মুখোপাধ্যায় প্রথমদিকে অন্তর্মুখী ছিলেন। মধ্য পর্বে ‘নিঃসঙ্গ অনুভবের জগতের বাসিন্দা।’ তাঁর পরের দিকের কবিতা গুলি
বহির্জগৎ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। পবিত্রর উল্লেখযোগ্য দীর্ঘ কবিতা ‘ইবলিসের আত্মদর্শন’ । এই কবিতায় ‘ব্যক্তি চেতনাকে সামগ্রিকতার সঙ্গে একত্রে গ্রথিত’ করেছেন। তাঁর আর একটি দীর্ঘ কবিতা ‘অলর্কের উপাখ্যান’ । ‘সারাদেহ পঁচে মরণগন্ধ ওঠে,/ তবু স্বপ্নের আকাশে উড্ডীন ।’

এই সময়ের কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়। কল্পনার বৈচিত্রে, ভাষাকে সাবলীলভাবে ব্যবহারের দক্ষতা কবিতা পাঠকদের মুগ্ধ করেন। প্রচার বিমুখ রোমান্টিক কবি পরিশীলিত আবেগস্পন্দিত কবিতা রচনা করেছেন। অবয়ব দিয়েছেন আধুনিক নাগরিক জটিলতাকে ।

সতীদাহ
“””””””””””””””
“এইখানে দাহ হবি, এবার চিতায় আরোহণ
এইখানে দাহ হবি, এবার স্মৃতিতে আরোহণ
এইখানে দাহ হবি,—- রক্তওষ্ঠ, তামরস-নাভি
মুখের কাপড় তুলে শেষ দেখা দেখ্ , তোর স্বামী!”

কবি শামসুল হকের কবিতায় গ্রামীন পরিবেশের কথা তো আছেই, আরো আছে শাণিত ক্রোধ আর বিদ্রূপ । শ্লেষদীপ্ত ভঙ্গিতে তিনি পাঠক চিত্রের চারদিকে আঘাত করেন।

“রাজপুত্র চলে যায়, তার সামনে পড়ে থাকে আত্মদগ্ধ মন।”

সহৃদয় মমত্ববোধের কবিতা লেখেন বিজয়া মুখোপাধ্যায় । মেদহীন মিতভাষী তাঁর কবিতা । তিনি উপলব্ধি করেন:

“যত নির্বাসন হোক, দীর্ঘ দীর্ঘ দিন
সব পথ হয়না আঁধার ।”

অন্য কবিতা লেখেন :
“নদীতে জলের শেষ নেই / হাওয়া চিরদিন সঞ্জীবনী।”

কবিতার রূপকল্প নিয়ে উপলব্ধি করেন কবি রত্নেশ্বর হাজরা :
“যেন কিছু পাখি কিছু পোকা কিছু
সম্পূর্ণ বিবাগী
অরণ্যে আকাশে যায় আসে দেখা যায়
সকালে বিকালে—- ধরা পড়েও পড়ে না”

রত্নেশ্বরের কবিতায় সংকট বিদ্ধ জীবনের কথা আবার পথ সন্ধানের ব্যাকুলতা দেখা যায়। তাঁর দীর্ঘ কবিতা ‘তীর্থযাত্রা’য়।

কৃত্রিমতাকে ভেঙে সত্য কে খুঁজতে চেয়েছেন কবি তুষার রায় । আত্মবিদ্রুপে জর্জরিত
কবি বলেন, ‘ গুনে যাচ্ছি সুদ এবং শুয়োর ।”
এক কাতর অভিজ্ঞতার যন্ত্রণা কবিকে নিয়ে যায়, মৃত্যুবোধের দিকে :

“রেলরাস্তায় ফ্লাইওভারে অযুত হাজার
রননঝনন আত্মহনন সম্মেলন উদাত্তগান ।”

পশ্চিমবঙ্গের বাইরে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও বাংলা কবিতার যে নিবিড় চর্চা হয় তার প্রমান শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কবিতায় :

“হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কালীদহে
ডহরের ঘোর-লাগা গহণের টানে
সায়ের ঝিয়ারি যায় অনন্ত ভাসানে ।”

আধুনিক বাংলা কবিতার সার্বিক পরিসরে কলকাতা কেন্দ্রিক বাংলা কবিতার সমান্তরালে আসাম ত্রিপুরার বিপুল বাংলা সমাজকে কেন্দ্র করে  বরাক তথা বৃহত্তর বাংলায় গড়ে ওঠা কবিতার একেবারে প্রথম শ্রেনীর কবি হিসেবে মান্যতা দেওয়া যায় কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীকে।

নবনীতা দেবসেন (১৯৩৮–২০১৯)
_______________________________

বাঙালির সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক ইতিহাসে নবনীতা দেব সেন কোনও বিচ্ছিন্ন, একক ধারাপাত নন। তাঁর ঐতিহ্যে কবিদম্পতি নরেন্দ্র দেব ও রাধারাণী দেবী নিত্য বহমান।
সহজিয়া স্বাভাবিকত্বকে না বুঝলে নবনীতার জীবন ও সাহিত্যকে প্রতি পদে অস্বাভাবিক ঠেকবে। যিনি দেশ ও বিদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের সম্মানীয় অধ্যাপক, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রাধাকৃষ্ণন স্মারক বক্তৃতা দেন, তিনিই কি সরস বাংলা গদ্যে নিজেকে নিয়ে হাসির ফুলঝুরি ছড়াতেন? নরেন্দ্র ও রাধারাণী দু’জনেই ছিলেন প্রতিভাবান, আমুদে ও আড্ডাবাজ। নবনীতা এই দুই বিখ্যাত কবির একমাত্র সন্তান।
ভালবাসা তাঁর হৃদয়ে ছিল বলেই তাঁর ভ্রমণকাহিনি কখনও নিছক অ্যাডভেঞ্চার হয়ে ওঠেনি। কেদারনাথে গিয়ে গাড়িবিভ্রাট, ঘোড়াওয়ালা অনেক কিছু। তবু তারপরও মনে হয় ‘হে পূর্ণ তব চরণের কাছে’! বাংলা ভ্রমণসাহিত্যে তিনি সৈয়দ মুজতবা আলির বৈঠকি মেজাজ বা উমাপ্রসাদীয় মুগ্ধতার বাইরে বিরল ব্যতিক্রম। তাঁর বেড়ানো অনেকটা অবুঝ বাচ্চা মেয়ের মতো। ভ্রমণসংক্রান্ত শেষ ও পঞ্চদশ বইয়ের নামেই মালুম, ‘যাবোই যাবো পেরু’।
শ্রদ্ধেয় পাঠকদের জন্য নবনীতা র একটি কবিতা:

আরোগ্য
“””””””””””””””

“শুধু তুমি সুস্থ হবে।

আমি দিয়ে দেবাে আমার কোজাগরীর চাঁদ,

শাদা দেয়ালের ময়ূরকণ্ঠী আলো,

দিয়ে দেবাে বিগত বছরের মরা পাখির মমতা,

আর আগামী বছরের কলাগাছটির স্বপ্ন।

চ’লে যেতে যেতে সবাই তাে তাই বলে গেলাে।

কুন্তী নদীর গেরুয়া জল তার সবুজ ছায়া-কাপা ঠাণ্ডা গলায়
আমাকে বলেছে,
শুকনাে সােনালি গােরুর গাড়িগুলো
ক্লান্ত কাদাটে গলায় আমাকে বলেছে,
শেষ হেমন্তের বুড়ো সবুজ পাতারা
আসন্ন মৃত্যুর খস্ খসে গলাতে বলেছে

তুমি সুস্থ হলেই ওরা আবার ফিরবে ।…………”

চারিদিকে কষ্টের চিহ্নের কথা দেবদাস আচার্যের কবিতায়। মাথা উঁচু করে দেখেন “দুঃখবোধলুপ্ত মানুষেরা বেশ আছে।”

প্রেম ও প্রকৃতি মঞ্জুষ দাশগুপ্তের কবিতার প্রধান প্রসঙ্গ :
” এখন আমাকে ডেকো না তোমার কাছে
সারাটা শরীর জড়িয়েছে বল্মীক
লোভী মানুষেরা হয়ে গেছে দিনশেষ
মৃত্যুর ঘড়ি অবিরাম টিকটিক…..”

কবি সুব্রত চক্রবর্তী লিখলেন :

“কবি তো সন্ন্যাসী নয়,
ওর ঘর-গৃহস্থলী আছে–”
তিনি লিখলেন :

“ধানকল থেকে
ফিরে যাচ্ছে ইঁদুরেরা , ফিরে যাচ্ছে পুষ্যা নক্ষত্রের
অবসাদ; চিমনির কালো ধোঁয়া ছবি অক্ষরের মত
ব্যাপ্ত হয় আকাশে আকাশে।
এইসব দ্যাখো, দেখে সুখী হতে থাকো।”

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত
________________

বুদ্ধদেব যান্ত্রিক পৃথিবীর কথা বলেন, যে পৃথিবীতে মেশিন হল সবকিছু । মেশিন মা বাপ, মেশিন ভাই বোন । এই যুগকে তিনি ‘হিমযুগ’ বলতেন । এই ‘হিমযুগে’ বাস করে তিনি বস্তুপৃথিবীর কথা বলতেন।

কালীকৃষ্ণ গুহ (১৯৪৪–
___________________

তাঁর কবিতায় অনুভূতি দেশের আলো পাওয়া যায় । এক অন্তরঙ্গ নিরুদ্বেগ দলিল। কালীকৃষ্ণের তদ্গত উচ্চারণ :

“এবার ভ্রমণ শেষে মনে হলো মন্ত্র উচ্চারণ করি।

মনে হল বলি :

শালবন স্থায়ী হোক, উপরে আকাশ… ‌‌

নারী ও কাব্য থাক যুবকের পাশে, রাত্রিগুলি

অতিক্রম করে যাক মূর্তিপূজা, পাথর- মগ্নতা, দীর্ঘশ্বাস ।”

কালীকৃষ্ণ গুহের প্রকৃতির স্বপ্নিল নিকেতনে এক অনলস বিচারণের স্বাভাবিক প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। জীবনানন্দের সার্থক উত্তরাসূরী হিসেবে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও কালীকৃষ্ণ গুহকে প্রতিষ্ঠা করা বোধহয় শক্ত নয়। একজন দক্ষ কবির প্রকৃত কাজ সদা অলিখিত পাতা ভরে ফেলা, লিখিত পাতায় লেখা নয়। এই লিখিত পাতা বলতে আমি বলতে চেয়েছি অনুকরণ । তবে প্রভাবিত হওয়া স্বাভাবিক। চেতনে অবচেতনে কাব্যপাঠের মধ্য দিয়ে যে কবিসত্তা গড়ে ওঠে সেখানে অনিবার্য ভাবে প্রিয় কবির শব্দবন্ধন, চিত্রকল্প উঁকি দেয়। কবিকে সচেতন ভাবেই সেই চেনাপথ অতিক্রম করে অচেনা, অজানা গলিপথ থেকে রাজপথে যেতে হয়। আর এই যাওয়ার পথ খুব সহজ নয়। জীবনানন্দ দাশকে সামনে রেখেই কালীকৃষ্ণ গুহ কাব্যক্ষেত্রে নেমেছেন, বেশ কিছুক্ষেত্রে সফল ভাবে নিজস্ব অতিক্রম করেছেন- কাব্যপাঠে এমনই অভিজ্ঞতা জানান দেয়।
কবিতায় তিনি কী লিখতে চান, দেখে নিতে পারি নিজস্ব বক্তব্য থেকেই —

” অজস্র স্মৃতির আলোড়ন ও নির্জ্ঞান নিয়ে অভিজ্ঞতার পুরাণ ও অন্তর্নিহিত ভাঙন নিয়ে ক্ষতবিক্ষত অবচেতন নিয়ে নারী ও শূনতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর কম্পন নিয়ে নিরন্তর নাক্ষত্রিক উৎসবের কিছু অন্ধকার নিয়ে যে জীবন কাটিয়ে এসেছি তা থেকে সঞ্চারিত কিছু বেদনাবোধ আর কিছু নীরবতার প্রতিবেদন ছাড়া অধিক কিছু পাবার নেই এইসব লেখায়।“ ( ভূমিকা, শ্রেষ্ঠ কবিতা, দে’জ, পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ- ডিসেম্বর ২০১৩ )
এই ‘বেদনাবোধ’ ও ‘নীরবতার প্রতিবেদন’ ছাড়াও তাঁর কবিতায় রয়েছে প্রকৃতিচেতনা। লাভ লোকসানের হিসেব নয় তিনি কবিতায় সত্য আবিষ্কারে মত্ত। জনপ্রিয় হতে চান নি, নিমগ্ন থেকেছেন আত্মপ্রেচষ্টায়, সেখানে বিচারণ এক সত্য- “ আমরা কবিতা লিখি, আমাদের ক্ষতি কিছু হয় না”( ‘ঝড়েশ্বর বাখরা’, ঐ , পৃ. ৩২)। কবিতাই কবির পরিচয়ের শ্রেষ্ঠ ধ্রুবক।

লেখা শুরু করেছেন ছয়ের দশকে। ইতিমধ্যে বহুকাব্য প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কাব্যগুলি হল – ‘ রক্তাক্ত বেদীর পাশে’( ১৯৬৭), ‘ নির্বাসন নাম ডাকনাম’ ( ১৯৭২ ), ‘ হস্টেল থেকে লেখা কবিতা’ ( ১৯৮৪ ), ‘ হে নিদ্রাহীন’ ( ১৯৮৮), ‘ পিতামহ, খোয়াইয়ে এসেছি’ ( ১৯৯০), ‘ তোমার প্রবাহ, চৈতমাস’ ( ১৯৯১), ‘ ক্লান্তির ভিতরে এই শেষ’( ১৯৯৬), ‘ স্মৃতিহীনতার মধ্যে নিস্তব্ধ পুরাণ’ ( ১৯৯৯), ও ‘ বৃষ্টির ভ্রমণ’ ( ২০১২ )। কতগুলি পর্যায় ক্রমে আমরা তাঁর কাব্যপাঠে অগ্রসর হব।
কবি কালীকৃষ্ণ গুহ প্রকৃতির অতলন্ত পরিবেশে মিশে থাকতে ভালোবাসেন। চেনা জানা প্রকৃতির নিবিড় গহীন গাঙ থেকেই তাঁর কাব্যস্বর উচ্চারিত হয়। এক নস্টালজিক মন মৃদু স্পর্শে ভাববিশ্বে রূপায়িত হয়। সেখানে তিনি আর কোন আড়াল খোঁজেন না। অবচেতন বিশ্বে নিজস্ব স্বর থেকে বহুদূরে প্রসারিত হয়ে যায়। প্রত্যেকেরই একটি নিজস্ব স্বদেশ থাকে। তাঁর কবিতায় একটা জার্নি আছে, সেখানে প্রাপ্তি বলে কিছু নেই শুধুই অনুভূতির এক গদ্যসত্তা বিরজামান-

“ রাত্রির ভিতর দিয়ে হেঁটে গেছে মানুষ, এইতো তার ভাষা –
তার অভিজ্ঞতা এই পাথরের মধ্যে আছে,
মৃত্যু এবং জন্মদিন আছে, প্রিয়তমা নারীর মুখ আছে, রাগিণী আছে।
এইখানে এসে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে, সময়ের অস্পষ্ট শিলালিপি
পড়ে দেখতে ইচ্ছে করে, বলতে ইচ্ছে করে :”
( ‘পর্যটন’, ঐ, পৃ. ২১ )
স্বপ্ন, বিচ্ছেদ, বিশ্বাস ও বিশ্বাসভঙ্গ সমস্তকেই তিনি প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন। আকাঙ্ক্ষিত মন নিয়ে অন্ধকারে বিরজামানসত্তা এগিয়ে আসে আলোর পথে। কখনও বা শুধু স্মৃতি নির্ভর জীবনসমুদ্র মন্থনে অগ্রসর। তাঁর স্মৃতি রোমন্থনে একাকিত্ব আছে কিন্তু একাকিত্ব থেকে বাঁচতে প্রকৃতিই বড় সহচার্য হয়ে উঠেছে।

কেতকী কুশারী ডাইসন
______________________

শোনা যায় একদা নাকি শহর কলকাতায় তাঁকে নিয়ে একটি পদ্য চালু ছিল- ‘গদ্যে পদ্যে ধোপদুরস্ত/ কেতকী কুশারী ডাইসন/ ফেমিনিস্ট তিনি জবরদস্ত/ ত্রস্ত পুরুষ বাইসন’৷ পরিহাসটি যতই লঘু হোক, এ কথা অনস্বীকার্য যে ইংরেজি ও বাংলা, উভয় ভাষাতেই তাঁর ‘ধোপদুরস্ত’ লেখনীর দৌলতে তিনি অভিবাসী বঙ্গীয় সাহিত্যের উজ্জ্বলতম এক স্বর।
তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯৪০ সালে, কলকাতা শহরে৷ অবনীমোহন কুশারী তাঁর বাবা, মা অমিতা কুশারী৷ এক ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সব থেকে বড়ো কেতকী৷ কেতকীর পিতামহ ছিলেন সে যুগের এক খ্যাতনামা শিক্ষক৷ তাঁর পাণ্ডিত্যের খ্যাতির জন্য অনেকে তাঁকে ডাকতেন ‘শেক্সপিয়র কুশারী’ বলে।
পাঁচের দশকে কৃতী ছাত্রী হিসেবে কেতকী তখনই কলকাতা-খ্যাত৷ প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি ১৯৫৮ সালে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ পরীক্ষায় রেকর্ড পরিমাণ নম্বর পান৷ ১৯৬০ সালে স্কলারশিপ নিয়ে পাড়ি দেন বিলেতে৷ ১৯৬৩-তে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আবার স্নাতক পর্যায়ের ডিগ্রি অর্জন করেন৷ অক্সফোর্ড থেকে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণদের মধ্যে তিনিই প্রথম ভারতীয় নারী৷ অতঃপর কলকাতায় ফেরা ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর শিক্ষকতা৷ ১৯৬৪ সালে বিয়ে করেন রবার্ট ডাইসনকে৷ তারপর কিছু সময় ইংল্যান্ডে, বছর দেড়েক ক্যানাডায়৷ ১৯৬৯-এর শেষে অক্সফোর্ডে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা আরম্ভ করেন৷ ১৯৭৫-এ ডক্টরেট উপাধি অর্জন৷
তিনি এক বিরল দ্বিভাষিক সাহিত্য-ব্যক্তিত্ব, যিনি বাংলা ও ইংরেজি, উভয়ই নিজের মাতৃভাষা মনে করেন৷ খ্যাতনামা জীবিত বাঙালি কবিদের মধ্যে তিনিই বোধ হয় একমাত্র যিনি এই দুই ভাষাতেই সমান দক্ষতায় কবিতা লিখে চলেছেন৷ বহুপ্রজ এই সাহিত্যিক যদিও তাঁর কবি পরিচয়কেই প্রাধান্য দিতে পছন্দ করেন, কিন্তু তাঁর অনায়াস বিচরণ সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে৷ উপন্যাস, নাটক, গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, সাহিত্য সমালোচনা ও অনুবাদ- সবেতেই তিনি সমান স্বচ্ছন্দ৷

কেতকী কুশারী বাইসনের কবিতা :

মেয়েলি
“””””””””””

“ও মেয়ে,
তোমার হাঁড়িটা বড্ড উথলে উঠছে,
আঁচটা একটু কমিয়ে দাও না।
ও মেয়ে,
তোমার আনাজের কড়াইয়ে ঢাকনা নেই কেন?
গুন-ঘ্রাণ-রস উড়ে যাবে যে।
ও মেয়ে,
তোমার মাছের এপিঠ ভাজা হয়ে গেছে,
এবার উল্টে ও পিঠ ভাজো।
নুন দিতে ভুলো না,
মসলা পুড়িও না।
তেল-ঝোল-আঁচল-বাচ্চা
সামলে সুমলে
রান্না নামাবে।

খেতে বসবে কখন ?”
___________________________________________
লিখেছেন — অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ। চুঁচুড়া।
হুগলী।

Post a Comment