যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

২৮ শে জানুয়ারী কবি তৈমুর খানের জন্মদিন উপলক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি

 

Story and Article


মোসাম্মত সামশুন নেহার

আজ কবি তৈমুর খানের জন্মদিন 

শুভ জন্মদিন কবি   -এই দিনটি বারবার ফিরে ফিরে আসুক তব জীবনে 

             আপনার কলমের প্রত্যেক আঁচড়ে অভিভূত হোক সমুদয় পাঠককুল 

                         সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের নিকট এই প্রার্থনা মম।।

‘‘চোখগুলি বেড়ে উঠছে,  

            মুখগুলি বেড়ে উঠছে 

               হাত-পাগুলি বেড়ে উঠছে

ছোট হয়ে যাচ্ছে ঘর,ছোট হয়ে যাচ্ছে রাস্তা 

                   ছোট হয়ে যাচ্ছে পৃথিবী 

দীর্ঘ হতে আরও দীর্ঘ হয়ে উঠছি—  

এত শীর্ণ নদী জল কই আমার স্নান হবে?

এত সংকীর্ণ রাস্তা কোথায় পা রাখি? 

মানুষগুলি লেন্সের কাচে উড়ে বেড়াচ্ছে

এখন সূর্যের সঙ্গে কথা বলতে বলতে জেনে নিচ্ছি 

তাকেও একটি ফুয়ে নেভানো যায় কিনা ’’   

অনেক দীর্ঘ হয়ে গেল কিন্তু সম্পূর্ণ কবিতা দেওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। কবি তৈমুর খানের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের [কোথায় পা রাখি’ (১৯৯৪)] প্রথম কবিতা –অপ্রাকৃত স্বপ্ন।কবি তাঁর নিজের অনুভূতি,বেড়ে উঠা ও আত্মপ্রকাশের কথা ব্যক্ত করেছেন কবিতায়। কবি লিখেছেন—‘সৃষ্টির আদিকাল থেকে কবিতা গড়ার খান্তি নেই। আমাদের  দিন যাচ্ছে।বয়স যাচ্ছে।শুকনো পাতার মতো ঝরেও পড়ছি।কিন্তু ঝড়ার আগে পর্যন্ত যে বুদবুদ ভাবতরঙ্গে জেগে উঠছে  তাকেই লিখে রাখছি কবিতায়। তৈমুর খান বলেন মানুষই আমার পরিচয়, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো একটি মাত্র পরিচয় আমার আছে কবিমাত্র, সে কথা তাঁর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নয় কি? আমার একজন স্যার বলতেন -- তৈমুর স্যার ট্রেনে যেতে যেতেও মনে কোন ভাবের উদয় হলে সেই ভাব কবিতায় রূপান্তরিত হয়। তাঁর কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা কুড়িটি, প্রবন্ধগ্রন্থ ছয়টি,গল্পগ্রন্থ একটি এবং উপন্যাস একটি। তিনি নিরলস সাধনায় মগ্ন, সৃষ্টি করে চলেছেন একের পর এক কালোত্তীর্ন গ্রন্থ এবং নিরন্তর অফুরান মনের রসদ যোগান দিয়ে চলেছেন তাঁর পাঠকগোষ্ঠীর নিমিত্ত। তৈমুর খানের কবিতা পড়তে গিয়ে মনে  হয়েছে তিনি সেই কবিদের দলে যাদের সম্পর্কে দীপ্তি ত্রিপাঠী বলেছেন--- ‘‘তাঁরা চাইলেন বিদগ্ধ পাঠকগোষ্ঠী, যাঁরা তাদের এই নতুন পরীক্ষাকে উপলব্ধি করবেন।ললিতকাব্য-লালিত সাধরণ পাঠক, বিশ্বসংস্কৃতির বিচিত্র ঐশ্বর্য সমন্ধে অজ্ঞ,যে no longer cares to feel the keen edge of life, to have freshness in vision or zest and savour in the sensesতার জন্য আধুনিক কবিরা কাব্য লেখেননি।তাঁদের আশা ছিল যে আলোচনা ও কাব্যপাঠের মাধ্যমে বিদগ্ধ গোষ্ঠী সাধারণকেও কাব্যাস্বাদনের শিক্ষা দেবেন। অর্থাৎ কাব্যপাঠের জন্য প্রয়োজন শিক্ষার, যেমন শিক্ষার প্রয়োজন শিল্পকলার অন্যান্য ক্ষেত্র চিত্র, ভাস্কর্য, কিংবা মার্গসঙ্গীত উপভোগের জন্য।কবিই শুধু সর্বজনবোধ্য কাব্য রচনা করবেন তা নয়, পাঠককেও তার রস সম্যক উপলব্ধি করবার জন্য সচেষ্ট হতে হবে।’’ 

 তাই কবি লেখেন --- ‘‘ শহরে এসে দেখি,সব মানুষের পিতলের হাত 

                        রুপোর মুখে বড় যান্ত্রিক হাসি 

                        আর পাগুলি লোহার, টায়ারের সঙ্গে 

                        গড়াতে গড়াতে গোল হয়ে গেছে পিচের রাস্তায়’’ (ভুল সময়)                                                              

রোমান্টিক কবিমন মাত্রই প্রকৃতির নিশ্চিন্ত,নিরুপদ্রব,শান্তিময় জীবন প্রত্যাশা করে।কবি ইয়েট্‌স একসময় লিখেছিলেন – take life easy,as the grass grows on the weirs  ’  প্রকৃতিপ্রিয় কবি তৈমুর খানের কাছে শহর তাই ধাতব এবং বড় কৃত্রিম আকার ধারণ করেছে।কবি মনে করেছেন তিনি ভুল সময়ে এসে পড়েছেন।প্রশ্ন করেছেন—এই সময় কাউকে ডাকা যায়? নব্বই দশকের কবি তৈমুর খান, তাঁর ব্যক্তিগত মতামত হলো এই সময় এক অস্তিত্বের সংকটের তীব্র ঝাকুনিতে পাক খেয়ে মানুষ ঐতিহ্য-উত্তরাধিকারের মানবীয় বাতাবরণ ভেঙ্গে ফেলতে বাধ্য হয়েছে কারণ এই দশকে কোন আলো ছিল  না।প্রেমহীন মানুষ হতাশার ধোঁয়াশায় ডুবে গিয়েও সমস্ত যুগদৈন্য ও দোলাচল চিত্ততাকে আত্মস্থ করেই এক স্থির মানবীয় পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছিল। যা আজও অধরাই থেকে গিয়েছে। 

কবির কলম লিখেছে— ‘‘জানালায় হাঃ হাঃ ছড়িয়ে পড়ে

                         আমি মৃতুনবিশী প্রেক্ষাগৃহে ধাতুর গলন দেখে

                                                         বিস্মিত হই 

                        নিজেই করি মৃত্যুবর্ষ উদযাপন---  ’’              (পর্যটন) 

জীবনানন্দের সর্ব ইন্দ্রিয় দিয়ে জীবনের পাত্রে মৃত্যসুধা পান নয়,বদলে যাওয়া সময়ে মানুষের হতাশা, অসহায়তা,একাকীত্ব সবটুকু প্রকাশ করেন কবি কী নিবিড় যত্নের সঙ্গে। পরের লাইনে লেখেন কবি—দারিদ্র্যপুজোয় বাবা-মা বিক্রি হয়,বিবেক এক খুনি যন্ত্রযুগের কুশ্রিতা, নিষ্পেষণ ও অসংগতি জীবনানন্দকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিল –অন্ধকারের স্তনের ভিতর যোনির ভিতর অনন্ত মৃত্যুর ভিতর মতো মিশে /থাকতে চেয়েছি।একবিংশ শতাব্দীতে এসে বদলে যায় অন্ধকারের পরিভাষা। কাব্যের নামখা শূন্য আমাকে খাতৈমুর খানের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ এইটি।বর্তমান অন্ধকার যুগের মানুষের সত্ত্বার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারের খোঁজ পেয়েছিলেন কবি। 

তাইপরিভাষা কবিতায় লিখলেন  --‘‘ কত রকমের অন্ধকার আছে পৃথিবীতে।

                                     অন্ধকার শব্দটি আজ বিজ্ঞাপন

                                      অন্ধকার অর্থে আমাদের চারপাশে

                                      এক একটা মানুষ চলাফেরা করে।  ’’

 তাঁর কাছে জীবনের রহস্য, সত্য, ভালোবাসা সব কিছু কবিতার মধ্য দিয়ে ব্যঞ্জনা লাভ করেছে।কল্লোল পরবর্তী যুগের কবিদের কবিতায় চাঁদকে কেন্দ্র করে যেটুকু বিলাসিতা বাকি ছিল তা লুপ্ত হয়েছিল নব্বই দশকের কবিদের কবিতায়।অসুস্থ সভ্যতার ছোঁয়াচ লেগে জীবনে বিষাদ নেমে এসেছে কবির,তাই জ্যোৎস্নাস্নিগ্ধ রাত্রীতেও প্রিয় নারীর প্রতি প্রেমাসক্ত হননি।ক্লান্ত কবির কাছে প্রেম শরীরেই আঁটকে থেকেছে। 

তাই কবি লিখেছেন--  ‘‘এই বারান্দা থেকে আর দেখি নাকো চাঁদ 

                        রাত জেগে শুনি নাকো জ্যোৎস্নার গান

                        ক্লান্ত বিষাদে শুধু ঘুম পায় 

                        ভুলে যায় প্রিয় নারী,প্রেম

                        রাত্রীর বুকে শুধু মাংসল মৈথুন’’ (জীবনানন্দ বুকের ওপর) 

মনে পড়ে যায় জীবনানন্দকে আবার অন্য কবিতায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে মনে পড়ে যায়। মধ্যবিত্ত ভীরু প্রেম দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে পারে না --‘‘সারারাস্তা তোমার পাশেই তবু কথা হয়নি

                           হাতের উপর হাত রাখতে ইচ্ছে ছিল 

                           ***        ***       ***    ***

                           অথচ কেউ জানবে না

                           নীরবে আরও একটি সোনার মাছি খুন হয়ে যাবে

                          এই রোদ্দুরের ম্যাজিক সকালে ’’ (সোনার মাছি) 

 কখনো পুরাণের পাতা থেকে উঠে আসে নারী তাঁর কবিতায়।দেবী দুর্গা মাটির আবেষ্টন ত্যাগ করে মানবীয় রূপ লাভ করে।  

‘‘একটু নিরভিমান আলো

  দুর্গার মতন নিরক্ত প্রতিমা’’ (দাঁড়াবার জায়গা নেই) 

কিংবা আজকের নারীচেতনা বোধের আলোকে পুনর্বার পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়

‘‘ মাটির ভেতর চলে গেছে আমাদের সীতা

  মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে আমাদের 

  পুরুষতান্ত্রিক যুগ যায়’’ (পুরুষতান্ত্রিক)

তবে তৈমুর খানের সবচেয়ে বেশি আলোচিত কবিতাটি হল ঘাসকাটাযে কবিতার বিখ্যাত চরণ---

‘‘ আরও একটু  দাঁড়াও কার্ল মার্কস

  কয়েক শতাব্দী আরও কেটে নিই ঘাস’’  এই কবিতাটি কবির আত্মজীবনের নির্যাস স্বরূপ। অন্তরের অন্তস্থলে লুক্কায়িত যন্ত্রণার ফসল। এই নির্ভেজাল কবিতাটি কবির স্বরূপ চিনতে সহায়তা করে । বোঝা যায় কবি তাঁর সমস্ত সৃষ্টিটুকুতেই উজাড় করে দিয়েছেন নিজেকে। কবি এ প্রসঙ্গেই হয়তো বলেছেন—কবিতা জীবনচুয়ানো ভাষায় লেখা হতে থাকে। প্রকৃত কবিতায় কখনো ছলনা চলে না।যে আত্মদহন ব্যক্তির মধ্যে ক্রিয়াশীল, কবিতা সেই দহনকেই গ্রথিত করতে জানে।জীবনের ছায়ায় জীবনের দোসর হয়েই তার বেড়ে ওঠা। 

কুড়িটি কাব্যগ্রন্থের মালিক তৈমুর খান।আমার এই স্বল্প পরিসরে তার আলোচনা অসম্ভব। বাংলা কাব্যভুবনের একনিষ্ট এই পূজারী শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে নব নব চিত্রকল্প নির্মাণ করে দক্ষ শিল্পীর ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।বাংলা সাহিত্য সম্ভার আলোকিত হোক তাঁর সৃষ্টির আলোয়। শুরু করেছিলাম কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা দিয়ে,শেষ করবো প্রথম কাব্যগ্রন্থ ছাপার আনন্দময় অনুভূতি দিয়ে। এই আলোচনার শিরোনাম কবি দিয়েছিলেন--শব্দ-সন্তানের পিতার আনন্দ  প্রথম সন্তান প্রসবে পিতার আনন্দ ছিল অফুরান – কবিতার জগতে এই উৎসাহ, এই অপার্থিব আনন্দবোধের ক্রিয়া যে কীরকম হতে পারে তা সেদিনই টের পেয়েছিলাম। অন্তরাত্মা স্পন্দিত চলেছিল। অস্তিত্ব বারবার ঘোষণা করেছিল; আমি আসছি!আমি আসছি!আমার মতন আর কেউ নয়!    

মনে হয়েছিল,আমি এক অসাধারণ আমি। অনন্য আমি।বিরাট আমি ও বিস্ময়কর আমি।প্রথম কাব্য প্রকাশের অনেকদিন পর চাকরি পেয়েও যে আনন্দ উপলব্ধি করেছিলাম তা কাব্য প্রকাশের আনন্দের মতো ছিল না।কাব্য প্রকাশের আনন্দ ছিল অলৌকিক ঐশ্বর্যের মতো।এক দার্শনিক বোধ পার্থিব আসক্তি সরিয়ে বিশ্বচৈতন্যের দরজায় আমাকে উপনীত করেছিল।আমরা জানি অমৃত হ্রদে মক্ষিকা পড়লেও অমরত্ব পায়।যে অন্ধ হোমার মহাকাব্য রচনা করেছিলেন,তিনি সব ঐশ্বর্য ত্যাগ করেও মহান ঐশ্বর্যে ধনী হয়েছিলেন হয়তো এই আনন্দের কারণেই।’’ বাংলা সাহিত্যের আর এক কবি বুদ্ধদেব বসুর তাঁর কবিতায় এরকম করেই বলেছিলেন---

‘‘ মনে পড়লো সারারাত জেগে এই বই যখন শেষ করেছিলুম। 

  নিজেকে মনে হয়েছিলো দেবতা,কী অপরূপ!

  যেন এই শাদা পাতাগুলো দিয়ে ছোটো একটি সূর্য আমি তৈরী করেছি,

  একটি সূর্য আমারই প্রাণে জলন্ত।

              

         আর সেই কাক-ভোরে

          বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ

          ঘুমাতে পারেনি আনন্দে।

***      ***     ***      ***

 ভেবেছিলুম একটা মির‍্যকল ঘটবে, ঘটলো না

 ফেটে পড়লো না আমার ছোট সূর্য, দারুণ বিস্ফোরণে।’’   (পাণ্ডুলিপি) 

    

                                                     

     


Post a Comment