যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

শুধু দুনিয়া নয়, জীবনও বদলে গেছে অনেক খানি, সরস্বতী পুজো এলেই নতুন বালক সঙ্ঘের স্মৃতি নতুন করে জেগে ওঠে।

শুধু দুনিয়া নয়, জীবনও বদলে গেছে অনেক খানি, সরস্বতী পুজো এলেই নতুন বালক সঙ্ঘের স্মৃতি নতুন করে জেগে ওঠে।

Story and Article


স্মৃতি কথা-- সরস্বতী বানান ঠিক লিখলে চাঁদা পাবে ! 

কলমে -- অভিষেক সাহা 


সময়টা ছিল  আশির  দশকের এক্কেবারে শেষের দিকে। কয়েক জন সমবয়সী বন্ধু মিলে ঠিক করলাম সরস্বতী পুজো করব। যারা মিলে ঠিক করলাম তাদের মধ্যে কয়েকজনের বাড়িতেও সরস্বতী পুজো হত।আমার বাড়িতে তো হতই । তবু বন্ধুরা মিলে, পাড়া ঘুরে চাঁদা তুলে, নিজেদের হাতে প্যান্ডেল করে ( তা সে যেমন ই হোক !), প্রতিমা এনে, ফল কেটে,  পুজো করা থেকে প্রসাদ বিতরণ, প্রতিমা বিসর্জন সব কিছু করার আনন্দের স্বাদ নেওয়ার ইচ্ছা আমাদের মধ্যে জেগে উঠেছিল।সে সময়টা এখনকার সময়ের থেকে অনেকটাই আলাদা ছিল। তখন কম্পিউটার ছিল না, স্মার্টফোন ছিল না, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব কিচ্ছু ছিল না। টিভিও খুব কম লোকেরই বাড়িতে ছিল।আর চ্যানেল ছিল অতি সামান্য। তবে রেডিও প্রায় সবার বাড়িতেই ছিল।  


       আমি তখন ক্লাস সিক্স। বন্ধুরাও প্রায় তাই। হয়ত বা কেউ এক ক্লাস উপরে বা নিচে পড়ত, এখন আর সবটা ঠিক মনে নেই। তবে সবাই বন্ধু। ' তুই' সম্পর্ক।পুজো যখন করব তখন তো একটা সঙ্ঘের দরকার। তাও হয়ে গেল। সরকারি নয়, আমাদের সব বন্ধুদের মনের খাতায় রেজিস্ট্রেশন হল। নাম ছিল, " নতুন বালক সঙ্ঘ"। বালক সঙ্ঘ নাম হলেও আমাদের সাথে দু-এক জন বালিকাও  ছিল !  আর ছিলেন আমাদের বাড়ির গুরুজনরা। যাঁরা নিজেদের শত অসুবিধা সহ্য করেও আমাদের এই আনন্দের স্বাদ নিতে সাহায্য করেছিলেন।

 

       নিজেদের প্রতিষ্ঠিত সঙ্ঘের নামে চাঁদার রসিদ ছাপানোর মত আর্থিক অবস্থা আমাদের ছিল না। তাই ছাপানো বিল কিনেই শুরু হয়েছিল চাঁদা তোলার কাজ। পড়াশোনার ক্ষতি না করে, সবার স্কুল বজায় রেখে, কোন দিন সকালে , কোনদিন বিকেল বা সন্ধ্যাবেলায় খেলার সময় কাটছাঁট করে যেদিন যেমন সুবিধা হত,  চাঁদা তোলার কাজ করতাম। শুধু পাড়ার মধ্যে নয়, বাড়ির অনুমতি নিয়ে একটু দূরে গিয়েও চলত চাঁদা সংগ্রহের কাজ। তখন বেশিরভাগই এক টাকা বা দু'টাকা চাঁদা দিত।কেউ আবার আট আনা মানে পঞ্চাশ পয়সা দিত । তখন যদি কেউ  পাঁচ টাকা চাঁদা দিত,  মনে আনন্দের ঝর্ণা বয়ে যেত। 


             চাঁদা তোলা মোটেও সহজ কাজ ছিল না। কেউ কেউ খুশি মনেই যা দেওয়ার দিয়ে দিত, কেউ আবার চশমার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে নানা রকম প্রশ্ন বাণে বিদ্ধ করত। যার মধ্যে বেশির ভাগই ছিল, সরস্বতী বানান ঠিক মত লিখতে পারলে চাঁদা পাবে! কেউ কেউ আবার এসবের চেয়ে এককাঠি উপরে ছিল। একবার এক ভদ্রলোক বলেছিলেন আমার নাম শিবশঙ্কর ভটকরকর, এটা সঠিক লিখতে পারলে দশ টাকা চাঁদা দেবেন! আমরা জানতাম এটা ওনার আসল নাম নয়। তবু আমরা   চ্যালেঞ্জ নিয়ে ছিলাম এবং জিতেছিলাম। 


            আমাদের বাড়ির সামনে ছোট্ট ফাঁকা জায়গায় নিজেদের হাতে বাঁশ- কাপড় -খবরের কাগজ- রঙিন কাগজ  দিয়ে করা প্যান্ডেলে চাঁদা তুলে পুজোটা মাত্র তিন বছর করতে পেরেছিলাম। ক্লাস নাইনে উঠতেই পড়াশোনার চাপ সহ অন্যান্য কারণে পুজোটা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সেই আনন্দের রেশ আজও মনে চির সবুজ। এখনও , এই এত বছর পরেও, যখন শুধু দুনিয়া নয়, জীবনও বদলে গেছে অনেক খানি, সরস্বতী পুজো এলেই নতুন বালক সঙ্ঘের স্মৃতি নতুন করে জেগে ওঠে। নিজেদের হাতে প্যান্ডেল বানানো, প্রতিমা সাজানো, ফল কাটার সুখ স্মৃতিগুলো এখনকার  শত চিন্তা, খারাপ লাগার  মাঝেও মনে আনন্দের মিষ্টি বাতাস বয়ে নিয়ে আসে।



 

Post a Comment