যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

অ্যাবসার্ড কবিতায় কবিমনের এক ঘোর স্বপ্নচারিতার বিচরণ থাকলেও চেতনমনই অবচেতনকে চালিত করে

অ্যাবসার্ড কবিতায় কবিমনের এক ঘোর স্বপ্নচারিতার বিচরণ থাকলেও চেতনমনই অবচেতনকে চালিত করে

   

Story and Article

অ্যাবসার্ড কবিতা বা অবচেতনের প্রবাহই সোমনাথ বেনিয়ার কবিতা

🍁

 তৈমুর খান

  💥

শূন্য দশকের কবি সোমনাথ বেনিয়া বাংলা কবিতায় একটি নিজস্ব পথের সন্ধান করেছেন। এত ভিড়ের মধ্যেও তাঁর স্বর আলাদা করে চেনাবার প্রয়াস চারখানি কাব্যগ্রন্থেই টের পেলাম। এই চারখানি কাব্যগ্রন্থ  'সাইকেল শেখার বয়স'(প্রথম প্রকাশ বইমেলা ২০১৭), 'ব্যক্তিগত ধূসর'(প্রথম প্রকাশ ডিসেম্বর ২০১৮), 'স্যার শূন্য দিলেন'(প্রথম প্রকাশ কলকাতা বইমেলা ২০১৮) এবং 'বাদাম বিস্কুট' (প্রথম প্রকাশ ২০১৯)। তিন বছরের মধ্যে চারখানি সমৃদ্ধ কাব্যগ্রন্থ একজন কবিকে সহজেই পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু সোমনাথের কবিতার পাঠক যে খুব বিরল হবেন একথা বলাই যায়। তাঁর কবিতাকে সহ্য করার মতো মানসিকতাসম্পন্ন কবিতার পাঠককে অবশ্যই তৈরি হতে হবে। যা এখনো বাঙালি পাঠকেরা হয়ে উঠতে পারেননি।


Story and Article


     সোমনাথ বেনিয়ার কবিতা এক চেতনাপ্রবাহ। অদৃশ্য উত্তরণ। যে চেতনার বলে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎকে তিনি চোখের সামনে তুলে আনতে পারেন। আবার কখনও কখনও নিখুঁত বর্ণনাও দিতে পারেন। তাঁর সমগ্র বোধের মধ্যেই এই আত্মবৃত্তের গভীর পর্যটন চলতে থাকে। ব্যক্তি প্রচ্ছদের আড়ালে নৈর্ব্যক্তিক ক্রিয়ায় অতিচেতনার প্রাবল্যে তিনি বাস্তবতাকেও অতিক্রম করেন। এমন এক জগতের উপলব্ধির কাছে আমাদের নিয়ে যান, যে জগতের ঠিকানা আমাদের জানার মধ্যেও অজানার দিগন্ত স্পর্শ করে। ফলে চেনার মধ্যেও অচেনার বিবরণ পাওয়া যায়। আসলে সোমনাথ বেনিয়ার কবিতায় অ্যাবসার্ডবাদের প্রভাব লক্ষ করা যায়। আর এই অ্যাবসার্ডবাদের মধ্যেই রয়েছে প্রকাশবাদ বা Expressionism এবং পরাবাস্তববাদ বা Surrealism. প্রকাশবাদ বা অভিব্যক্তিবাদে জীবনের আভ্যন্তরীণ রহস্য প্রকাশের প্রসঙ্গকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাস্তববাদের বিরুদ্ধে এক বিপ্লবাত্মক বিদ্রোহ বলা যায়। মানুষের মনের গহীনে আরও এক বিশ্ব আছে যা বাইরের বস্তুবিশ্বের মতো নয়। সেই মনের গহীনে যে প্রতিবেদন সৃষ্টি করে— সেই অন্তর্গত অভিজ্ঞতাকেই রূপ দিয়েছেন সোমনাথ বেনিয়া। অন্তর্গত প্রতিবেদনের রূপদানের ক্ষেত্রে চড়া আবেগ, উদার কল্পনা অথবা সংরাগে তীব্র প্রতীক ব্যবহার করে অতিশয়োক্তিকেও প্রশ্রয় দিয়েছেন। সুনির্বাচিত বিশেষণ প্রয়োগ করে বক্তব্যকে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম এবং শব্দ নির্বাচনকে সুনিয়ন্ত্রিত ও উদ্দেশ্যমুখী করার ব্যাপারেও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। আবার পরাবাস্তববাদের প্রভাবে অবচেতন মনকে বেশি সক্রিয় করে তুলেছেন। অবচেতন মন যা নীরবে আমাদের সচেতন মনকেও অনেকখানি নিয়ন্ত্রিত করে। সুতরাং যা মানবজীবন এবং কর্মের ক্ষেত্রে অতীব শক্তিশালী— সেই অবচেতন মনের ক্রিয়া-বিক্রিয়াকে বিভিন্ন প্রতীক ব্যবহারের সাহায্যে অথবা চিন্তা প্রক্রিয়ার উপর যুক্তির নিয়ন্ত্রণকে অস্বীকার করে কেবল চিন্তা পদ্ধতির সূত্র অবলম্বনে নতুন ধরনের কবিতা লিখতে চেয়েছেন সোমনাথ। যার কারণে তাঁর সৃষ্টির জগৎ এক অপরিমেয় সম্ভাবনার দিকে অগ্রসর হয়েছে। অবচেতন মন এবং যুক্তিহীন বিমুক্ত চিন্তন তাঁর কবিতার নির্মাণকে প্রথা বিরুদ্ধ মুক্তির জগতে পৌঁছে দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর কবিতায় এসেছে বিশৃংখলতা, প্রসঙ্গহীনতা, যুক্তিহীনতা, ক্রমহীনতা, স্বপ্নালুতা, তমসাচ্ছন্নতা এবং অদ্ভুত প্রতীকের সহাবস্থানে, সংঘাতী কিংবা অসম্পৃক্ত ইমেজের সমবায়ে গড়ে ওঠা বাক্যবন্ধ।


Story and Article



    অ্যাবসার্ডবাদের জন্ম হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে বিস্ময় বিমূঢ় বিভ্রান্ত নাগরিক সমাজ যখন সমস্ত অবলম্বন অনিশ্চিত মনে করেছিল। তাদের জীবনের সংগতি হারিয়ে ফেলেছিল। মানুষের চিন্তারাজ্য গড়ে ওঠার আগেই তা সাংঘর্ষিক বিপন্নতায় ঝরে পড়ছিল। জীবন সম্পর্কে কোনও সরল সত্য আদর্শ বা মূল্যবোধ উঠে আসছিল না, তখনই মানুষ এক বিশাল 'নেতি' বা নাথিংনেস্ এর সম্মুখীন হয়েছিল। মানুষ তার অন্তর্মুখী অথবা আত্মগত আশ্রয়েই তার ভাঙচুর অনুধাবন করছিল। আলবার্ট কামু এবং জাঁ-পল সার্ত্রে তাঁদের সৃষ্টিতে যে অস্তিত্ববাদী দর্শন নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন তা মূলত অ্যাবসার্ডবাদেরই মূল কথা। ক্ষুব্ধ হতাশ দিশেহারা নিরুপায় অন্তর্জীবনের প্রকাশই তাঁদের শিল্পের একটি বৈশিষ্ট্য। পরে স্যামুয়েল বেকেটও 'ওয়েটিং ফর গেডো' লিখে অ্যাবসার্ডবাদের চূড়ান্ত পরিচয় দিয়েছেন।


 সোমনাথ বেনিয়া তাঁর প্রথম কাব্য 'সাইকেল শেখার বয়স'-এর কাব্যের নাম কবিতায় লিখেছেন:


"ঠিক তখনই একটা উড়ন্ত ঈগল তার দুরন্ত গলায় জিজ্ঞাসা করল, 'যে তলিয়ে গেল তার তো জল, স্থল বা অন্তরীক্ষ বলে কিছু একটা থাকবে, কিন্তু তোমার চারপাশে এইযে ধু-ধু মহাশূন্যতা তার মাহাত্ম্য কিছু বোঝো কি!' আমি মুচকি হেসেছিলাম। এখন ধুলোয় ভরা পরিত্যক্ত সাইকেলটা আমাকে দেখলেই অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে, কারণ যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ এইসব চিহ্ন নিয়ে নিজের সঙ্গে যখনই পাজল টেস্ট খেলি, প্রতিবারই খেলার শেষে একটি করে বুদবুদ বের হয় যাকে তীক্ষ্ণ ঠোঁট দিয়ে ফাটিয়ে দেয় সেই ঈগল, যার ফেটে যাওয়ার ক্ষীণ  আওয়াজে সেই মেয়েটির ভেসে আসা আর্তি এখনও আমাকে চায় আর আমার একাউন্টে একটু-একটু করে শুধু শূন্যতা জমে যায়…!"


Story and Article




  প্রেমের মূল বিভাবকে পুঁজি করে যে শূন্যতার নিরবধি নাথিংনেস জমা হয়েছে তা অন্তর্জীবনেরই ভাবনায় জারিত। মহাশূন্যতার মাহাত্ম্য বুঝতে বুঝতে পরিত্যক্ত সাইকেলের অট্টহাস্য এবং পাজল টেস্ট খেলা, তারপর বুদবুদের উদ্গম এবং তীক্ষ্ণ ঠোঁটের ঈগলের আবির্ভাব বোধের এইসব উপলব্ধিকে অ্যাবসার্ড করে তুলেছে। যেখানে মানসিক মুক্তি আছে, কিন্তু যৌক্তিকতা নেই। এই কাব্যের 'যেকোনো শবকেই আমার ঈশ্বর বলে মনে হয়' কবিতায় লিখেছেন:

"এই নিঃসাড় অস্তিত্ব আমার আড়ালে থাকা অনুভূতি

যার স্পন্দন আমার জঙ্ঘায় জেগে ওঠে

ওদিকে আমি তখন নিলডাউন ভীষণ আত্মসুখে


ঘরের কোণায় লাট হয়ে পড়ে থাকা কাপড়চোপড়

অচেনা রহস্য নিয়ে শুয়ে থাকে

কোনো গিঁট নেই...সরল পঙক্তি... আলগা রাস্তা

অথচ কোথাও জল অপেক্ষা করে

                             এককোষ উল্লাস নিয়ে

রহস্য দূর করতে-করতে সূর্যটা গোল সাবানের মতো

                                  নিঃশব্দে ফুরিয়ে যায়"


Story and Article




   নিঃসাড় অস্তিত্ব, আড়ালে থাকা অনুভূতির স্পন্দন জেগে ওঠা জঙ্ঘা, আত্মসুখের নিলডাউন বাস্তবতার নিরিখে তা বিচার্য নয়। তেমনি অচেনা রহস্য নিয়ে পড়ে থাকা গিঁটহীন কাপড়-চোপড়ের সরল পংক্তি, আলগা রাস্তা, জলের অপেক্ষা, সূর্যের গোল সাবানে রূপান্তর এবং নিঃশব্দে ফুরিয়ে যাওয়া সর্বদা বাস্তবতাকেই উল্লংঘন করে অতিবাস্তবের মুক্ত জগতে আমাদের নিয়ে যায়। যা প্রসঙ্গছিন্ন, তমসাচ্ছন্ন এক স্বপ্নের জগৎ। গোল সাবানের অসম্পৃক্ত ইমেজও এই পরাবাস্তবতার চেতনাকে তীব্র করে তুলেছে। এই কাব্যে ছড়িয়ে আছে এমন প্রচুর চিত্রকল্প। জিরাফের গলার মতো মিছিল, বুকের ভিতর অন্ধকার প্ল্যাটফর্ম, শরীরের মধ্যে বহু রাস্তা, অন্তঃসত্ত্বা নদী,  চাঁদের হাটে মৃত আলো ফেরি করা জোনাকি, আহ্নিকগতি জুড়ে উত্তম পুরুষ স্পর্শক, ফুটপাথের দিনের ঢোক গিলতে গিলতে রাত পার হওয়া, ঢেউয়ের শীর্ষ ছোঁয়া নৌকার আস্পর্ধা ইত্যাদি আরও কত। 'স্যার শূন্য দিলেন' কাব্যের কবিতাগুলিতেও তাঁর সৃষ্টির ধারা প্রবহমান। এই কাব্যের 'বি.বা.দী বাগ চত্বরে এক গাছ শালিক-সন্ধ্যা' কবিতায় লিখেছেন:


 "এখানে ফুটপাথ আছে, আছে রাজপথ। শুধু এলোমেলো গন্তব্যগুলি কখনো পার্কিং জোনে পাশাপাশি থাকে, কখনো-বা নো এন্ট্রি বোর্ডে অসহায় সমর্থনে থামে। এখানে ব্যস্ততার একটি নিজস্ব অধিকারবোধ এমনভাবে জন্মে গেছে, যে তার স্থিরগুলির একটু-আধটু দেখা মেলে মন্দির চত্বরে। ওইতো গাছের গোড়ায় পাথর। সেওতো ঈশ্বরের অংশগ্রাহী রূপভেদ হয়ে পুজো নিচ্ছে। চূড়ান্ত স্তব্ধতায় দেখছে—এই শহরের কতশত মানুষের ছায়ার ভিতরে রাখা তার জন্য সাজানো নৈবেদ্যর চেয়ে—অনেক বড়ো সেইসব পূণ্যার্থীদের শরীরী প্রত্যাশা। এখন এই চত্বরে যে সন্ধ্যা নামে, তা কি ওই পাগলীর মাথা চুলকানো হাসিটা…"


Story and Article




   ফুটপাথ রাজপথ এলোমেলো গন্তব্য সব মিলে পার্কিং জোনের অসহায় এন্ট্রি বোর্ডে থেমে যাওয়া জীবনযাত্রাকে কবি ভেতরের আলো দিয়ে দেখতে চেয়েছেন। কেননা প্রত্যেকটি জীবনের ছায়ার ভিতরে নৈবেদ্য সাজানো আছে। আর এই নৈবদ্যের মধ্যে চূড়ান্ত আদিমতার রূপটিই সত্য হয়ে উঠেছে। শুধু বাইরের সত্য নয়, ভেতরের সত্যটিকেই অন্বেষণ করা অটোমেটিক রাইটিং এর মধ্যেই পড়ে। অবচেতনার প্রশ্রয়ে সরাসরি উপস্থাপন করা। আর এই অবচেতনার বিষয় মনের অন্ধকার অর্থাৎ আদিম প্রবাহ, যেখানে যৌনতারই অভিব্যক্তি। তাই পাগলীর মাথা চুলকানো হাসিতেই সন্ধ্যার আগমন সূচিত হয়। এই কাব্যের কবিতাগুলিতে কবি অন্তর্জীবনের প্রজ্ঞাই শিল্পের উৎস হয়ে উঠেছে। তাই ভারতবর্ষ 'কলমিশাক'-এর রূপ পেয়েছে। পানের বরজের রূপকথা থেকে এঁদো পুকুরের গন্ধ ফিরে এসেছে অবচেতনে। আবার এই কাব্যেই যাবতীয় সংলাপ সযত্নে শুঁয়োপোকা হয়ে উপচে পড়েছে বসন্তকালীন চিরায়ত কথোপকথনে। 'সোমনাথ বেনিয়ার একটি সাধারণ প্রেম কাহিনি' নামের কবিতায় 'শূন্য ভাঁড়ের এক ছটাক হাহাকার অনামিকায় মেখে/ নিজের স্বরযন্ত্রে শব্দহীনতার মানসিক রোগ রেখে' প্রেমিকার বাসনার বিষণ্ন ঝাউগাছে আশ্রয় চেয়েছেন। প্রেমের অভিকর্ষজ বল বোধ পরীক্ষণের মুহূর্ত উপস্থিত করেছে যার সমীকরণ সাজিয়েছেন 'স্যার শূন্য দিলেন' কবিতায়। তবুও আমাদের 'সংখ্যাবাচক লাইফ' যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ এর হরেক রকম সমীকরণে ছেয়ে আছে। জনারণ্যে ঘুরে বেড়াবার স্মার্ট কার্ডও পেয়ে যাবার আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত? কবি লিখেছেন সেই 'নামতা' সকলেরই জানা:



"এরপর

উড়ন্ত চৌখুপির মধ্যে নিজের চার প্রহরের—

                       সমস্ত সমীকরণ জমা রেখে,

শূন্য সংখ্যার টোকেনটা নিয়ে—

আড়াই প্যাঁচ থেকে ওঠা কুকুরের মতো—

গা ঝাড়া দিয়ে এগিয়ে যাস মহাপ্রস্থানের দিকে" (নামতা)

 আর একটি কবিতায় লিখেছেন:

"নিবিড় সম্পর্কে মরচে পড়া দাগ মুছতে মুছতে—

শেষ হয় বেলা…

এরপর

শূন্য পেরোতে-পেরোতে মৃত্যুর দায় কাঁধে নিয়ে—

হেঁটে যায় বিষণ্ন রোদ!"(ফিসফিস)


 মৃত্যুর কাছেই সমর্পণের আয়োজন চলতে থাকে। আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু ঘটলে ভবিষ্যৎও আর ধরা দেয় না। তখন অবেলার বিষণ্ন রোদ মহাপ্রস্থানের আমন্ত্রণ জানায়। মৃত্যুর দায় কাঁধে নিয়ে পথপরিক্রমা শুধু।



ফরাসী দার্শনিক, লেখক এবং সাংবাদিক ১৯৫৭ সালে ৪৪ বছর বয়সে, নোবেল ইতিহাসের দ্বিতীয়-কনিষ্ঠতম প্রাপক অ্যালবার্ট কামুও(১৯১৩-১৯৬০) এই প্রসঙ্গে বলেছেন :

"A man devoid of hope and conscious of being so has ceased to belong to the future." 

(Albert Camus, The Myth of Sisyphus and Other Essays) 


অর্থাৎ একজন মানুষ আশাহীন এবং তাই হতে সচেতন ভবিষ্যতে অন্তর্গত হওয়া বন্ধ করেন। এই পরিক্রমণটিই বারবার ফিরে এসেছে 'ব্যক্তিগত ধূসর' কাব্যে। এই কাব্যে এসে কবি তাঁর 'চুমু' হারিয়ে ফেলেছেন। যে চুমু সম্পর্কের চাবি হয়ে মায়ের কাছে ছেলে, বোনের কাছে দাদা, বউয়ের কাছে স্বামী এবং মেয়ের কাছে বাবা হয়ে উঠেছেন। এই পৃথিবী গোল বলে অসংখ্য বিভ্রান্তি নিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে। তাই চুমু খুঁজতে যাওয়া আরও এক বিভ্রান্তি। সম্পর্কের রহস্যগুলি জটিল ও আশ্চর্য হয়ে ওঠে, যখন কবি দেখেন: "সেই চুমু নিয়ে মা ইহলোক ত্যাগ করেছে, বোন অন্যত্র সংসার পেতেছে, বউ রিহ্যাবে আছে আর মেয়ে রঙিন সন্ধ্যা হয়ে গেছে…." এই বিভ্রান্তির রহস্যঘন আত্মযাপনে যে 'পলিমাটি' জেগে উঠেছে সেখানে চুমুতেও বিষাদ লেগে গেছে। অক্ষরেখা পেরিয়ে গেছে দিঘি। ঘুমের স্বাদ তেতো হয়ে গেছে। ছায়ার সঙ্গে এক বিঘতের তফাত রেখে কবি রাস্তা হেঁটেছেন। 'উঠোন' কবিতায় লিখেছেন:


 "আমার কোনো উঠোন নেই!


 অগত্যা নিজের ছায়াকে উঠোন হতে বলেছি

 শীতলপাটি পেতে একটু শোবো

 আমার দিনকে ধোপার মতো কাচে শহর

 রাতকে ঝিয়ের মতো ঘর

 অবশেষে আমি ডালের তলানি

 আঙুলের টোকায় গা গুলিয়ে ভুস করে ভেসে,

 উঁকি দিয়ে, যেই-কে-সেই…

 পরপর চুমুক আসে

 কোনো এক দুরন্ত চুমুকে আমি নিঃস্ব হবো

 তখন তো আমার একটি উঠোনের দরকার পড়বে, বলো?"


 নিজের কাছে বারবার ফিরে আসা, আশ্রয় চাওয়া এবং আত্মদর্শনে নিবিষ্ট হওয়া এই কবির মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। এক অস্থিরতার অভিনিবেশে কেবল গড়াতে চেয়েছেন। 'আগা-গোড়া ছন্দ কেটে যাওয়া উপকরণগুলি'র কথা লিখতে গিয়ে মায়া-ছায়ার সত্য-মিথ্যায় হোঁচট খেয়েছেন। পাথর কাঁদার ধূসরতায় মরুভূমির ক্যাক্টাস জন্ম দেখেছেন। মন উড়ু উড়ু প্রেমের নিবেদনে রাসলীলার যাত্রাপালায় চৈতন্যময় দহন সহ্য করেছেন। অবশেষে নীরবের আদর্শ ধরে একটি ব্যক্তিগত ধূসর খুঁজেছেন উঠোনের মরা পেয়ারা গাছে টিয়ার বিষণ্ন ঠোঁটে।



    'বাদাম বিস্কুট' কাব্যের কবিতাগুলি আরও তীব্র ও প্রখর হয়ে উঠেছে। এই কাব্যে কবির নৈবেদ্য 'এই যে ভাষা বলতে আর্তনাদ বুঝি'...


 ঝরে পড়া পাতার  বাতাসচুম্বন এবং শিহরনে কাঁপা রক্তকণা নিয়ে 'হৃদয়ের নিজস্ব গলনাঙ্ক'কে শব্দরূপ দিতে চেয়েছেন। আর প্রতিনিয়ত ধাক্কা খেয়ে তা উথলে উঠেছে। ছিটকে পড়েছে। চেতনমনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া অবচেতনের ছায়াপ্রবাহে দীর্ঘ হয়ে উঠেছে। কখনো কখনো অস্বাভাবিকতা এবং অযৌক্তিকতা ভিন্নজগতের পরিক্রমায় তার মুক্তি রচনা করেছে। কবি বলেছেন 'উজ্জ্বল হলুদ তার ভিনগ্রহের মধ্যাহ্ন।' যেখানে 'অচেনা গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান।' অবিন্যস্ত মানসিক বোধের বিস্তারে বিক্রিয়াগুলিও এলোমেলো হয়ে গেছে। ট্রাম লাইন, রাত্রি, চাঁদ, ক্ষেত্রফল, হতাশ্বাস, দুপুর, বিস্ময় ঘুঘুর বিরহী ডাক সব একাকার হয়ে গেছে। 'নুনভাতবৃত্তান্ত' কবিতায় লিখেছেন:



 "ভালোবাসা কম পড়লে প্রেমিকার স্তনে আকাশ খুঁজি, উড়ে যাওয়া, সীমানাহীন, কাঁটাতারের স্পর্ধা ভুলে। কোনো পিছুটান নেই, নিদেনপক্ষে বৃষ্টি ভেজা মাছরাঙার অপেক্ষা নিয়ে বইয়ের স্পাইনে হাত বোলাতে-বোলাতে ভূমিকায় রেখে যাওয়া ধূসর স্পর্শকাতর যন্ত্রণা। ঘুম কম হলে মিথুন মাখিয়ে স্বপ্নকে রোদে শুকোতে দিই।ম্যাড়মেড়ে, খড়খড়ে, ভেঙে যাওয়ার শব্দে পুনর্জন্ম। বালিশের ভিতরে শহর জেগে ওঠে, কোলাহল, অবিন্যস্ত দৌড়, প্রান্তিক ক্ষেত্রফলে হালকা সঞ্চয়। প্রিয় ঠোঁটে আবেগ কম দেখে হতাশ্বাস বুক বাঁধিয়ে দেয়ে জানালা থেকে, দুপুর ফেরি করে যার কাতর বিস্ময় ঘুঘুর বিরহী ডাকে…."



 কেমন এলোমেলো এক নিঃসীম নিঃস্বতায় নেতিবাচক বিপন্নতা আমাদের গ্রাস করে। 'আস্তে আস্তে ডুবে যাওয়া মনের খেয়ালী চোরাবালিতে' টের পাই। মুহূর্ত যাপন করতে দেখি মুহূর্তকে খেয়ে। সোমনাথের কবিতা পড়তে পড়তে মনে পড়ে যায় বিখ্যাত চিত্রশিল্পী, কবি এবং 'লাল দরজা' পত্রিকার সম্পাদক পাবলো সাবোরিও(জন্ম:কোস্টারিকার সান জোসে ১৯৮২ সালে) এর কবিতা।  তিনি নিজেই নিজের সম্পর্কে বলেছেন:আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন, জার্মানিতে বসবাস করেছি এবং বর্তমানে আমি বসবাস করছি ডেনমার্কে এবং কোপেনহেগেনে মাস্কিনার আর্টসের একজন সদস্য। আমি ছোটবেলা থেকেই কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করেছি এবং একটি 'উজ্জ্বল ক্যারিয়ার' থাকার ধারণাকে প্রতিহত করেছি। আমি এই মুহূর্তের জন্য সত্তার অস্থিরতাকে আলিঙ্গন করতে পছন্দ করি। কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা হলাম:



"Unknown currents inside a vast, incomprehensible ocean" 

 অর্থাৎ বিশাল, বোধগম্য সমুদ্রের ভিতরে অজানা স্রোত।


 তাঁর অযৌক্তিক কবিতা বা ভাষার বাইরে কবিতা যা স্বয়ংক্রিয় বা absurd poem হয়ে উঠেছে। তাঁর এই কবিতার সঙ্গে সোমনাথ বেনিয়ার কবিতাও একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বোধগম্য সমুদ্রের ভিতরে অজানা স্রোত। এই স্রোতকে আমরা অনুধাবন করতে পারি না। প্রচলিত সচেতন ভাষায় ব্যাখ্যাও করতে পারি না। অথচ এড়িয়ে যাবারও উপায় নেই। কেননা স্রোতের উত্থান ও জন্ম আমাদের জীবনের উৎস থেকেই। সোমনাথ এই উৎসেরই মূলে পৌঁছেছেন। 'প্রেমসংহিতা'য় লিখেছেন:



"তুমি চাও না আর কেউ এখানে আসুক! কেন? উত্তরে ঠোঁট যতটা না 

বলেছিল, তার চেয়েও অনেক বেশি চোখের ছটফটানিতে বলেছিলাম-

 তোমার জন্য কৃষ্ণগহ্বর পরিমাপের নতুন কোনো একক হতে পারে! এই

 অভিবাদনের সম্মানে আসমুদ্রহিমাচলে চিত্রার্পিত হয়ে গেছে আমার

 সমস্ত শব্দবোধ। এখন মিউকাস পর্দায় অসংখ্য বালিয়াড়ি। জল নেই।

 জল নেই। তুমি তখনই ঢেউ হয়ে দুলে উঠলে। আমি স্রোতস্বিনী নদী

 দেখলাম, দেখলাম ঢেউয়ের উথাল পাথাল। তবে ভাসিয়ে দিই নৌকা।"

  সোমনাথের এই চিত্রার্পিত শব্দবোধ পাবলো সাবোরিওর BEYOND LANGUAGE POETRY  অর্থাৎ

ভাষার বাইরে কবিতার(অযৌক্তিক কবিতার) কাছে আমাদের নিয়ে যাই:

"mystery is a heavy mist

pounded on our eyes


love sits

with cold legs

and the emptiness of the sand


those fingers

to carve in the skin of this earth

the folded name;


the forgotten

labyrinth of him." (and the Emptiness of)

  

 অর্থাৎ প্রেম চেতনার প্রবাহ থেকেই অবচেতনার ক্রিয়ায় উপলব্ধির এই বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। সোমনাথের চোখের ছটফটানি, কৃষ্ণগহ্বর, মিউকাস পর্দা যে রহস্য সৃষ্টি করেছে, সেই রহস্য পাবলো সাবোরিওর কবিতাতেও। তাঁর কবিতায়ও রহস্য হল আমাদের চোখে ভারাক্রান্ত কুয়াশা। সোমনাথের বালিয়াড়ি এবং জল হীনতা, পাবলোর কবিতায় ভালবাসা শীতল পা এবং বালির শূন্যতা নিয়ে বসে থাকা। সোমনাথের কবিতায় 'তুমি'র ঢেউ হয়ে দুলে ওঠা, পাবলোর কবিতায় সেই 'তুমি'রই আঙুলগুলো এই পৃথিবীর চামড়ায় খোদাই করা নাম ভাঁজ। সোমনাথের কবিতায় নৌকা ভাসিয়ে দেওয়া, পাবলোর কবিতায়: তার ভুলে যাওয়া গোলকধাঁধা। এভাবেই দুই কবিরই অভিমুখ এবং উৎসভূমির সন্ধান পাওয়া সম্ভব। যেখানে প্রেমই অভিভব হয়ে বিক্ষিপ্ততায় ভাষাহীন হতে চেয়েছে। আর একটি কবিতায় সোমনাথ লিখেছেন:



"হাঁটতে হাঁটতে কুড়িয়ে পেয়েছি ক্ষমা

পাপ বলতে কচিপাতায় পোকা,পুণ্য,পোকার প্রোটিন

 মৃদু হাসি নদীর পাড়, মুক্তি মোহনার বিস্তার

 এখন কোনো দেওয়াল নেই,পথকাটার বিড়াল,থুতু

পারাপার রোদ আকাশ পোহাতে-পোহাতে শিকড়ের

                                  কৌষিক জলে রাখে,

 নতমাথার প্রতিবিম্ব, আত্মজ…" (সংশয়গাছ)

 সংশয়গাছ তখন জীবনের প্রতিলিপি রচনা করে চলে। নদীর পাড়, মুক্তি মোহনার বিস্তার এবং দেওয়ালহীনতা, পথকাটার বিড়াল,থুতু, পারাপার রোদ আকাশ পোহাতে পোহাতে শিকড়ের কৌষিক জলে রাখে নতমাথার প্রতিবিম্ব যা কবির 'আত্মজ'। ভাষা এবং চিত্রকল্প যেমন সংগতি হারিয়েছে, তেমনি বিক্ষিপ্ত চেতনার বিমূঢ়তায় উৎক্ষিপ্ত হয়েছে জীবনও। পাবলো সাবোরিওর আর একটি কবিতায় দেখতে পাই জীবনের এই অসঙ্গতি:



"Life is quite explicit.

Like a fly that lands

unexpectedly

on a piece of paper.


Thought is quite intricate.

Like the Rorschach blot

a fly produces when smacked

on a piece of paper." (simple analogy)

 এখানেও  বলা হয়েছে ,জীবন বেশ স্পষ্ট। কাগজের টুকরোতে অপ্রত্যাশিতভাবে অবতরণ করা মাছির মতো।

চিন্তা বেশ জটিল।Rorschach blot-এর মতো কাগজের টুকরোতে আঘাত করলে একটি মাছি উৎপন্ন হয়।



 কবিতার নাম 'সহজ উপমা' যা 'কুড়িয়ে পাওয়া ক্ষমা'র মতোই সহজ কিন্তু অপরিচিত। রহস্যময়ও। সোমনাথ জানেন "নিজের ভিতরে ঝরতে-ঝরতে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে দিনযাপনের পাণ্ডুলিপি। কিছু ধুঁকতে থাকা কথাবার্তা আউটগোয়িং এসএমএস এর মতো মুখ বাড়িয়ে আছে"। উত্তাপের অনুরণনে উনান হয়ে যাওয়া বোধের তীব্র ঝাঁকুনি মেরুদণ্ড পুড়িয়ে আত্মসমাধি নেওয়ার মুহূর্ত। 'অসুখসংহিতায়' অসংখ্য কম্পন নিয়ে দিনকে রাতের মুখে তুলে দিয়েছেন আর নতজানু হাঁটুর ভিতর পথের শেষ কথা নিজের কাঁধে নিজের ভার হয়ে বসেছে। এক গভীর নির্জনতায় আত্মসমীক্ষার বিষণ্নতা থেকেই আশ্চর্য উত্থানকে আঁকড়ে ধরেছেন। কাব্য সৃষ্টির এই মুহূর্তটি অনুধাবন করেই জার্মান ঔপন্যাসিক, ছোট গল্প লেখক, প্রাবন্ধিক, সমাজ সমালোচক ও মানব-হিতৈষী পাউল টমাস মান(১৮৭৫-১৯৫৫) বলেছেন:


"Solitude gives birth to the original in us, to beauty unfamiliar and perilous - to poetry. But also, it gives birth to the opposite: to the perverse, the illicit, the absurd."

(Thomas Mann, Death in Venice and Other Tales) 

অর্থাৎ নির্জনতা আমাদের মধ্যে মূলের জন্ম দেয়, অপরিচিত এবং বিপজ্জনক সৌন্দর্যের-কবিতার। কিন্তু এছাড়াও, এটি বিপরীতের জন্ম দেয়: বিকৃত, অবৈধ, অযৌক্তিক। সুতরাং সোমনাথের কবিতায় মূল এর উৎস সন্ধান যেমন আছে, তেমনি অপরিচিত এবং বিপজ্জনক সৌন্দর্যও আছে। কখনো কখনো বৈপরীত্যের ভেতর দিয়ে তিনি যেমন 'প্রেমের ত্রিকোণমিতি' রচনা করেছেন, তেমনি অন্ধকারের সংজ্ঞায় দেখেছেন সূর্যের কান মলে  দেওয়া ক্লোরোফিল। অপত্যস্নেহের ডাকে কখনো কখনো আয়ু দশমিক হয়ে গেছে। তাঁর কবিতায় দিন ফুরানোর আর্তনাদনামা থেকে জ্যোৎস্না রাতে শামুক কুড়ানোর আয়োজনেও কখনো কখনো বিকৃত এবং অবৈধের জন্ম হয়েছে। যেখানে আগুনমেঘ এবং জলবালিকাও জেগে উঠেছে। অ্যাবসার্ড কবিতায় কবিমনের এক ঘোর স্বপ্নচারিতার বিচরণ থাকলেও চেতনমনই অবচেতনকে চালিত করে এবং অবচেতনই সৃষ্টির বৃহৎ অংশে বিরাজ করে। সোমনাথের কবিতায়ও তার ব্যতিক্রম হয়নি।









সোমনাথ বেনিয়া ও তাঁর চারখানা কাব্যগ্রন্থ 

Post a Comment