যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

ঝিনুকের চোখে মুক্তা জল :বিকাশ চন্দ, কবিতিকা প্রকাশন, খড়্গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, মূল্য ২০০ টাকা। কবির সাথে যোগাযোগ :৯৪৭৪৫০৭৮৭৫, প্রচ্ছদ :বিষ্ণু সামন্ত।

ঝিনুকের চোখে মুক্তা জল :বিকাশ চন্দ, কবিতিকা প্রকাশন, খড়্গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, মূল্য ২০০ টাকা। কবির সাথে যোগাযোগ :৯৪৭৪৫০৭৮৭৫, প্রচ্ছদ :বিষ্ণু সামন্

Story and Article

'ঝিনুকের চোখে মুক্তা জল' একটি সার্থক কাব্যনাট্য

🐋

তৈমুর খান 
🐟

  বিকাশ চন্দের প্রথম কাব্যনাট্য 'ঝিনুকের চোখে মুক্তা জল' একটি রোমান্টিক বেদনার নাট্যকাব্য— যেখানে প্রেম এবং জীবিকার বাস্তব সংঘাত দুর্মর হয়ে উঠেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আনন্দময়তায় এর সমাপ্তি ঘটেছে। এত সহজ সাবলীল গতিসম্পন্ন উক্তি-প্রত্যেকটির মাধ্যমে আপনি কাহিনি বিন্যাস উপস্থাপন করেছেন যে মুগ্ধ না হয়ে পারিনি। সমুদ্র উপকূলবর্তী জীবনের কী টানাপোড়েন এবং তার সঙ্গে প্রকৃতির কী অনুপম হাতছানি তা যথাযথ চিত্রকল্পে আপনি তুলে ধরতে পেরেছেন। চরিত্রগুলি জলের ঢেউ এর মতো উচ্ছল, প্রকৃতির মতো স্নিগ্ধ এবং আবেগে তরঙ্গায়িত তথা স্পন্দিত হতে পেরেছে। মাঝে মাঝে তারা দার্শনিকও হয়ে গেছে। প্রকৃতিপ্রেমের সঙ্গে মানবপ্রেমেরও গভীর সাদৃশ্য ফুটে উঠেছে। উজানের সংলাপ দিয়ে যখন শুরু হয় কাব্য নাটকটি তখন মনে হয় উজানও কত পরিণত! উজান বলেছে:

"দেখো একটা উল্টো ঢাউস কড়াইয়ের পিঠের মতো স্থির সমুদ্র

 আর এক থালা পান্তাভাতে সূর্য মাখে নুন

 কে খেলো আর নাই বা খেলো

 কার ফুরোলো পান্তা আবার কার ফুরোলো নুন।"

 মেঘ বলেছে:

"জানিস উজান, দধীচির হাড় ছিল বোধহয় হাড়ের ভেতর মজ্জা

ঐ হাড়ে কি কলম হলো হৃদয় ছেঁড়া কথা জন্মকাল

সমুদ্র উত্তাল হাওয়ায় উড়ে যায় জল মাটি—" 

 নীল বলেছে:

"জড়িয়ে থাকে সতীন মুখে পরকীয়া প্রেমে মজে—

 সকাল সন্ধ্যা গাঙশালিকের ঝাঁক আঁকে

গিরিয়া শাকের সবুজ আদর মায়ের আঁচল—

আদর বোঝে কেমন করে চর আঁচলের পাখি।"

   আলোক বলেছে:

"এখানে কখনো বা থমকে থাকে নিবিষ্ট মহাকাল"

 সমস্ত চরিত্রগুলিই কবির বহু সত্তায় বিভক্ত হয়ে এক একটি রূপ ধারণ করেছে। তাই প্রতিটি চরিত্রের মধ্যেই তীব্র তীক্ষ্ণ বোধের বিস্তার ঘটেছে। সাহিত্য-পুরাণ-সংস্কৃতি এবং জীবন-জীবিকার লড়াইয়ে তাদের ক্লান্তিহীন প্রাণাবেগের প্রাচুর্য মহিমান্বিত হয়ে উঠেছে। দারিদ্র্যের নোনা স্বাদের সঙ্গে সামুদ্রিক নোনা বাতাসেরও উচ্ছ্বাস মিশে গেছে। কিন্তু হৃদয়ের রোমান্স কখনো ফুরিয়ে যায়নি। ঝিনুক যখন বলে:

"পড়ন্ত বিকেলে তখন দেখবেন সোনা গলা রোদ

 সৈকত জুড়ে পোয়াতি লাল কাঁকড়ার বুক

 চুপি চুপি গর্তে ফেরে ত্রস্ত পায়ে—

 ওরাও বোঝে সভ্যতার যন্ত্র চাকায়

প্রতিদিনই নির্বিবাদে বেড়ে ওঠে অকাল মৃত্যু অসুখ।"

 তখন আমাদের মনে হয় এ তো শুধু কাঁকড়া নয়, মানুষেরও কথা। মন্দারমণিতে শুধু সৌন্দর্যের গোপন রহস্যই উন্মোচিত হয় না, যন্ত্রণার এবং দুঃখের কথাও ভাষা পায়। বুকের ভেতর নিথর বোবা পাথরের ক্রন্দন আমরা শুনতে পাই। ঝিনুকের চপলতা, সরলতা, মায়াময়তায় সকলেই আকৃষ্ট হয়। ঝিনুক জলের গন্ধ চেনে। হৃদয়ের প্রতিধ্বনিও শুনতে পায়। তার চোখ দিয়েই ধরা পড়ে মৎস্যকন্যার দেশের কথা। মৌন বিষণ্ণতার মাঝেও তার আনন্দ জাগে মোটা চালের ভাত-ডাল-চচ্চড়িতে। শরীরও গরম হয়।

 পার্শ্বচরিত্রগুলিও যথাযথ পূর্ণতা নিয়ে এসেছে। প্রশান্ত যেমন ইতিহাস জানে, তেমনি বাস্তবতাও অনুধাবন করতে পারে। তেমনি বুধন, ফুলকিও স্বাভাবিক। অসম্ভব আঞ্চলিকতাবোধ তাদের মধ্য দিয়েই বিকশিত হয়েছে। শহুরে ব্যবসায়ীর শোষণ-পীড়নও কতখানি লুব্ধতায় এবং হিংস্রতায় পরিপূর্ণ তা সুকৌশলে কবি ইঙ্গিতবহ করে তুলেছেন। নাটকের শেষে তাই ঝিনুকের মতোই আমাদের চোখেও আনন্দাশ্রু নির্গত হয়। পাঠ করার পরিশ্রমও আনন্দে পূর্ণ হয়ে ওঠে পূর্ণ বাবুর মতোই।

 কাব্যময় এই রচনায় নাট্যগুণ এর প্রাধান্য যথেষ্টই দৃষ্টিগোচর হয়। বিষয়বস্তু, চরিত্র চিত্রায়ন, সংলাপ, সিকোয়েন্স, অনুভূতি এবং উদ্দেশ্য সবগুলি পারম্পর্যপূর্ণ নাটকীয় বাতাবরণে বিকশিত হয়েছে। বিকাশ চন্দ যে সার্থক একজন কাব্যনাট্যকার তা বলাই বাহুল্য।

🦈

ঝিনুকের চোখে মুক্তা জল :বিকাশ চন্দ, কবিতিকা প্রকাশন, খড়্গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, মূল্য ২০০ টাকা।

কবির সাথে যোগাযোগ :৯৪৭৪৫০৭৮৭৫, প্রচ্ছদ :বিষ্ণু সামন্ত।



ছবিতে বিকাশ চন্দ 

Story and Article

বিকাশ চন্দ
বিকাশ চন্দ


Post a Comment