যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

দিদিমণি গুনগুন করে গান করে চলেছে। কিছুক্ষণ পরে বলেন, সন্ধ্যা, চা খাবি?

ছুটির দিনগুলোতে একটু বেলা করে যায় সন্ধ্যা। দিদিমণি বলেছিল, ছুটির দিনগুলোতে একটু বেলা অবধি ঘুমোই আমরা। তাই তুমি দেরি করে আসবে। কিন্তু সন্ধ্যার যে অন্য

 

Story and Article

মন

জয়নারায়ণ সরকার

দিন আনি দিন খাই সংসারে সব সময় ব্যস্ত সন্ধ্যা। সকালে কয়েকটা বাড়িতে ঠিকে কাজ নিয়েছে সে। না হলে তো সংসারটা ভেসে যাবে। বিয়ের পরে মনে কত স্বপ্ন উঁকি দিয়েছিল। সাধন সব কিছুতেই নির্বিকার। আনন্দ-দুঃখ কিছুই স্পর্শ করে না। জোগালের কাজে খাটুনি বেশি, তাই রাতে বিছানায় শরীরটাকে এলিয়ে দিলেই ঘুম এসে জাপটে ধরে তাকে। সন্ধ্যা দু'চোখের পাতা এক করতে পারে না। কাল কী হবে ভেবে ভেবে চোখ দুটো গর্তে ঢুকে গেছে। কোনও সন্তান না হওয়ায় আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরা দায়ী করেছিল‌ তাকে। মাঝে মাঝে মনটা ভার হলেও, ওসব নিয়ে ভাবতে চায় না। কিন্তু মনটাকে তো আর বেঁধে রাখতে পারে না। তাই নিজেকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে রাখে। ক্রমশ আবছা হতে থাকে স্বপ্নগুলো।


সাতদিন হল একটা বাড়িতে কাজ নিয়েছে। বাসন মাজা আর ঘর মোছার। বড় ফ্ল্যাটে দাদাবাবু আর দিদিমণি। দুজনেই চাকরি করেন। তাই একটু সকাল-সকাল ওই বাড়িতে যেতে হয় তাকে। একটু বেলা হলেই তালা বন্ধ হয়ে যায় ফ্ল্যাটের দরজা।

সন্ধ্যা অবাক চোখে দেখে তাদের। দুজন দুজনের মতো থাকে। দাদাবাবু খুব একটা কথা বলেন না। আবার দিদিমণি একটার পর একটা প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে তাকে। এসবে কিছু মনে করে না সন্ধ্যা। হয়তো দিদিমণির কথা বলার কেউ নেই, তাই হয়তো... আবার পরক্ষণেই ভাবে, কেন দাদাবাবু তো আছেন। তার সঙ্গে তো বলতে পারেন। দাদাবাবু তো স্বপনের মতো কাজ করেন না, যে একটুতেই ঘুমিয়ে পড়েন।


ছুটির দিনগুলোতে একটু বেলা করে যায় সন্ধ্যা। দিদিমণি বলেছিল, ছুটির দিনগুলোতে একটু বেলা অবধি ঘুমোই আমরা। তাই তুমি দেরি করে আসবে। কিন্তু সন্ধ্যার যে অন্যান্য বাড়িগুলোর কাজের সময় যে ঠিক করা আছে। একটু এদিক-ওদিক হলেই সব কিছু উলোটপালোট হয়ে যায়। তবুও সে ওই দিনগুলোতে অন্য বাড়িতে তাড়াতাড়ি যায়।


এক ছুটির দিনে একটু বেলা করে যায় সন্ধ্যা। প্রথমে রান্নাঘরে বাসন মাজার জন্য ঢুকে অবাক হয়। একটাও বাসন নেই। সে তড়িঘড়ি বেরিয়ে আসে। ওকে ওভাবে বেরিয়ে আসতে দেখে দিদিমণি হেসে বলে, তোর দাদাবাবু অফিসের কাজে বাইরে গেছে। তাই কাল রাতে অফিস থেকে ফেরার পথে খাবার কিনে নিয়ে এসেছিলাম। ওই একটা বাসন, আমি মেজে রেখেছি।

সন্ধ্যার চোখ-মুখ বিস্ময়ে ছেয়ে ফেলে। এত বড় ফ্ল্যাটটায় দিদিমণি একা একা থাকে! অন্যদিকে দিদিমণি গুনগুন করে গান করে চলেছে। কিছুক্ষণ পরে বলেন, সন্ধ্যা, চা খাবি?
সন্ধ্যা অস্ফুটে হ্যাঁ বলে।


বাড়ি ফিরে দ্যাখে স্বপন বিছানায় শুয়ে। তড়িঘড়ি সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে উৎকন্ঠা মেশানো গলায় বলে, কি হল? শরীর খারাপ নাকি?
স্বপন উলটো দিকে ঘুরতে ঘুরতে বলে, আজ আর কাজ নেই। তাই...
স্বপনের মুখ থেকে কেমন ভোঁটকা গন্ধ এসে নাকে লাগে। গা-টা কেমন যেন করে ওঠে।

সন্ধ্যা আর কথা না বলে দু'বাড়ি থেকে পাওয়া খাবারের ব্যাগটা ঘরের কোণে রাখে। পাশের কলের ঘরে গিয়ে স্নান করে বেরিয়ে আসে। তখনও স্বপন গভীর ঘুমে। বিছানার কাছে গিয়ে ঠেলা দেয় স্বপনকে। একটু দূর থেকে গলা ছেড়ে ডাকতে থাকে। কিন্তু কোনও সাড়া পায় না। প্যাকেটগুলো পড়ে থাকে। সন্ধ্যা একবারের জন্যও ফিরে তাকায় না। প্লাস্টিকের ক্যান থেকে এক গ্লাস জল নিয়ে ঢকঢক করে গলায় ঢালে। তারপর বিষণ্ণ মনে বিছানায় গিয়ে বসে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন স্বপনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর কাঁথা টেনে গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়ে সন্ধ্যা।


ভোরবেলা ঘুম ভাঙলে দেখে স্বপন তখনও বেহুঁশের মতো ঘুমোচ্ছে। সন্ধ্যা আর দেরি করে না। কাজের বাড়ি যেতে হবে। হঠাৎ করে বদলে যাওয়া স্বপনের ওপর রাগ হয় তার। কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারে না। রাতের খাবারের প্যাকেটগুলো মেঝেতেই পড়ে থাকে। সে কোনও দিকে না তাকিয়ে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। আজ আর ভাল লাগছে না সন্ধ্যার। বুকের ভেতরটা যেন একটা কষ্ট দলা পাকিয়ে আছে। চোখ দুটো জ্বালা করছে। একবার মাঝ রাস্তা থেকে বাড়ি ফিরে যেতে চায়। কিন্তু না, কাজ না করলে যে বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে। স্বপনের ওপর ভীষণ রাগ হয়। কেন যে এ রকম করছে বুঝতে পারে না।


দুটো বাড়ির কাজ কোনওভাবে শেষ করে বউদির ফ্ল্যাটে গিয়ে হাজির হয়। বেলের সুইচে হাত দেয়। ঘরের ভেতরে কোকিল ডেকে ওঠে। সন্ধ্যার মনটা আবার ব্যাকুল হয়ে ওঠে। কাজের মধ্যে থাকলেও স্বপনের ব্যবহার কিছুতেই মাথা থেকে যাচ্ছে না। সিঁড়ির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে দরজার দিকে। গত রাতের ঘটনা মনে পড়তেই চোখের কোণে জল জমে। আবার বেল বাজায় সন্ধ্যা। কয়েক সেকেন্ড পরে বউদি দরজা খুলে দাঁড়ায়। এক লহমায় বউদির মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে। মুখটা শুকিয়ে গেছে। রাত-জাগা চোখ দুটো টকটকে লাল। দরজা খুলে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে বউদি।


সন্ধ্যা পাশ‌ ঘরে ঢুকে পড়ার সময় বউদি কোনও কথা বলে না। সন্ধ্যা রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে কাজ করতে থাকে। আজও তিন-চারটে বাসন পড়েছে মাজার জন্য। স্কচবাইটে ভিমবার নিয়ে বাসনে ঘষতেই একটা আর্তনাদ ভেসে আসে। ঘর থেকে বউদির গলা পায়।


সন্ধ্যা বাসন ফেলে জোরে হেঁটে বউদির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কানে ধরা মোবাইল। সন্ধ্যার কিছু বুঝে ওঠার আগেই হাউহাউ করে কাঁদতে থাকে বউদি। সন্ধ্যা ভাব্যাচাকা খেয়ে তড়িঘড়ি বিছানায় বসে থাকা বউদিকে পেছন থেকে জাপটে ধরে। তখনও কেঁদে চলেছে বউদি।

কান্না জড়ানো গলায় বলে, এভাবে চলে যেতে পারলে? এতক্ষণে সন্ধ্যা বুঝতে পারে ফোনের ওপারে দাদাবাবু। তারপর একনাগাড়ে বউদি বলতে থাকে, কতদিন আর মিথ্যে বলে থাকা যায়! এখন সবাই বিশ্বাস করছে। এর পরে... আমি কী নিয়ে বাঁচব...

ফোনটা বিছানার ওপর আছড়ে ফেলে। ভেতর থেকে গোঙানির মতো আওয়াজ বেরিয়ে আসছে বউদির মুখ থেকে। সন্ধ্যা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, বেশি চিন্তা কোরো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।


কান্না থামিয়ে ঘুরে বসে ওর দিকে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকে। দু'গাল ভিজে উঠেছে চোখের জলে। সন্ধ্যা তড়িঘড়ি একটা গ্লাসে জল নিয়ে বউদির সামনে ধরে বলে, জল খেয়ে নাও, গলা তো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।


বউদির কোনও পরিবর্তন চোখে পড়ে না তার। এক ঝটকায় গ্লাসটা নিয়ে এক চুমুকে শেষ করে আবার সন্ধ্যার হাতে ফিরিয়ে দেন। সন্ধ্যা গ্লাসটা হাতে নিয়ে ফিরে আসে রান্নাঘরে। চটপট কাজ শেষ করে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। লোকজন, গাড়ি তেমন নেই। একটু বেশি ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তার মনের ভেতরটাও কেমন ফাঁকা মনে হয়। চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে। স্বপনের মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ঊর্ধ্বশ্বাসে হাঁটতে থাকে সন্ধ্যা।



Post a Comment