যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

কুসুমদি এই অবসরে রাতের ক্লান্তি ধুয়ে ফেলে কলঘরে। খানিকটা সজীব হয়ে রান্নাঘরে এসে লোহার চাপান টা সরিয়ে দেয়। উনানের আঁচ এখন গনগনে।

জিভের ডগায় জল জমে মাটির নোনতা স্বাদ মনে করে। কুসুমদির খুব ইচ্ছে করে উনোনশালের ফেটে ওঠা দু-এক কুচি মাটি মুখে দিতে। সদ্য গর্ভবতী কোনও নারী যে স্বাদ পায

গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়

 

মাটির স্বাদ 

গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়


পাপোষে পা ঝেড়ে বিছানার কোনগুলোয় মশারিটা টানটান করে গুঁজতে থাকে কুসুমদি। তারপর বেড-সুইচটায় হাত দেয়। বড় আলো নিভিয়ে শরীরটা এলিয়ে দেয় খাটের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত। পায়ের পেশীগুলোয় আজকাল টান ধরে, হাঁটুতেও ব্যাথা,খুব তাড়াতাড়ি কিছুই করতে পারে না। অলস মন্থর হয়ে পড়ছে দিনেদিন। বয়সের কারণেই বোধহয়।

ডাঃ ঘোষ বলছিল সেদিন একথা। বলছিল রোজ সকালে একটু হাঁটতে। কুসুমদির ইচ্ছে করে না। কেমন যেন একটা আলসেমি জুড়ে বসছে শরীরটায়।

ঐ ছেলেটা কেমন যেন মনের কাছাকাছি এসে গেছে তার। অথচ ডাঃ ঘোষের সাথে তার বয়সের পার্থক্য কিছু না হলেও তিরিশ বছর তো হবেই। মাঝে মাঝেই সন্ধ্যার সময় আসে,খবর নেয়, কফি খেতে ভালোবাসে, ব্লাক কফি, কুসুমদি বানিয়ে দেয়,কখনও নিজেই গ্যাস জ্বেলে বানিয়ে নেয়।

এই এক মুশকিল,ঘর ভর্তি মৃদু নীল আলো, যা কুসুমদির খুব প্রিয়, তবু ঘুম আসে না,যতো হিজিবিজি চিন্তা। শরীর নিয়ে খুব বেশি বাড়াবাড়ি নেই, ভারি অসুখ ও তেমন হয়েছে বলে মনে পড়ে না। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারর ধকল ও কম নয়,দিব্যি টেনে এসেছে,শুধু মাঝে মধ্যে টুকটাক ওষুধ খেতে হয়েছে বৈকি। তবে সেটুকু ওই হাসপাতালের ডাক্তার বাবুদের বাইরে কিছুই নয়। এখনও রিটায়ারমেন্ট এর চারবছর বাকি। অযত্নের নিমগাছের মতো সব ঠিকই ছিল এতদিন। এইবার পেশীর টান, ঘাড়, কোমর, হাঁটুর ব্যাথা, যত্তসব আপদ বাড়ছে। পাশ ফিরে একবার পরখ করে দেখে কুসুমদি, মশারিটা ঠিকমতো গোঁজা হয়েছে তো!

হ্যাঁ,ঠিকই আছে। আসলে সব ঠিকই থাকে। তবুও কেমন যেন একটা স্বভাব হয়ে গেছে তার, কিছুতেই সন্তুষ্ট হয়না মন।

নবীন কে আজ বড্ড বেশি বলে ফেলেছে কুসুমদি, এতটা বলতে চায়নি। কোনও কাজে গাফিলতি সহ্য করতে পারেন না তিনি। আজ দশবছর অপারেশন থিয়েটার এ কাজ করছে সে, তাকে কেন প্রায় মনে করিয়ে দিতে হবে অটোক্লেভের মুখ বন্ধ করতে! হয়তো কিছু যায় আসে না,কিন্ত কুসুমদির মনে হয়, এটা ঠিক নয়। সব কিছু নিয়ম মেনে করাই ভালো। সারাটা দিন নবীন মুখ ভার করে ছিল, মনে মনে দুঃখ কুসুমদিও কম পায়নি। না আর কোনদিন এভাবে বলবে না। আজকাল কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। সেই কুসুমদির মিস্টি হাসি টা ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে দিনদিন।

পায়ের তলাটা কেমন কিড়কিড় করছে, বিছানাতেও বালি আছে মনে হচ্ছে। আবার একবার বিছানা ঝেড়ে, পাপোষে পা ভালো করে মুছে বিছানায় ওঠে। মনে হয় এবার ঠিক আছে।

ডাঃ ঘোষ কে চিত্ত বলে ডাকলেই তো হয়, অথচ ডাকে না কেন! চিত্ত ও চায় কুসুমদি তাকে নাম ধরে ডাকুক। ছেলেটা কি রকম ভাবে তাকায়, লক্ষ্য করেছে কুসুমদি। পঞ্চান্ন বছরের শরীর টার দিকে নয়,সেটা নিশ্চিত। কিন্ত একটা করুণা মিশ্রিত মায়াময় দৃষ্টি। অনান্যরাও যে কিছুটা করুণার চোখে কুসুমদিকে দেখে, সেটাও কুসুমদির অজানা নয়। তবুও অন্য সবার থেকে ডাঃ চিত্ত ঘোষের প্রতি এক অন্যরকম ভালোলাগা জন্মে গেল গত দু'বছরে।

নাহ, আজ আর ঘুম আসবেই না। আবার পাশ ফিরে দেখলো নীল আলোয় আবছা দেখা যাচ্ছে, ঘর ঠিকই বন্ধ করেছে। এতটাই খুঁতখুঁতে মন।

অন্য সবার থেকে চিত্ত কে একটু বেশিই পছন্দ  কুসুমদির। কারণটা কি, পুরোনো ফেলে আসা স্মৃতির বোঝা। হ্যাঁ,ঠিক তাই,পঁচিশ বছর আগে, ডাঃ হরেন ঘোষ কে কখনও ডাকতো ডাঃ ঘোষ বলে জনসমক্ষে, আর অন্য সময় হরেন। সব স্মৃতি হয়ে গেছে তার। এই 'ঘোষ' অংশটাই কুসুমদিকে সরিয়ে এনেছে হরেনের কাছ থেকে। নাহ, কুসুমদি সরে আসেনি, সরিয়ে দিয়েছে কুসুমদির কর্তব্যবোধ। ব্রাহ্মণত্বের এই জেদ টুকু না করলেও পারতো। কিম্বা কুসুমদিও না মানতে পারতো বাবার কথা। একটা কর্তব্যবোধ আর সংবেদনশীলতার বড় ছিল। কুসুমদি জানতো ডাঃ হরেন ঘোষ কে বিয়ে করলে বাবা একপয়সাও নিতো না, তার এই একমাত্র উপার্জনক্ষম মেয়ের কাছ থেকে। ভাইদের কাছে,আত্মীয়দের কাছে ছোট হয়ে যেত কুসুমদি।


হরেন বোধহয় ঠিকমত বুঝতে পেরেছিল কুসুমদিকে, তাই তো সবকিছুই বুঝিয়ে বলতে পেরেছিল তার বৌ পারমিতা কে। পারমিতার মনটাও ভারি সুন্দর। এই-তো গত পরশু ও পারমিতা-হরেন এসেছিল কুসুমদির কোয়ার্টার এ। কুসুমদি যত্ন করে পোলাও রান্না হরেনের ছেলেটাকে খাওয়ানোর জন্য। খেতে খেতে অনেক গল্প করছিল সবাই। কিন্ত কুসুমদির কেন জানে না কেবলই খুঁত খুঁত করছিল, রান্নাটা ভালো হয়নি,ভাতগুলো কেমন ফ্যাক্টর,মশলা টা বোধহয় কম হয়ে গেছে।মিষ্টির পরিমাণ ঠিক আছে তো! কে জানে কেন, কেবলই মনে হয় কোনও কাজটাই সম্পূর্ণ সুন্দর ভাবে করে তুলতে পারছে না। কিসের যেন একটা অভাব বোধ। 

যেমন অভাব বোধটা হতো ভাইগুলো চাকরি-বাকরি পেয়ে থিতু হওয়ার পর। বাবা মারা যাবার পর সেই তো একা সংসার টেনে ভাইদের মানুষ করেছে। যাদের কথা ভেবে বাবার কথার বিদ্রোহ করতে পারেনি,সেই ভাইরাও দিদির সুখের চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখতো না। একসময় মা ও চলে গেলেন হঠাৎই হার্ট এটাক্ এ। ভাই ও তাদের বৌ-দের অত্যধিক সহানুভূতি আর অনুকম্পা একসময় অসহ্য হতে লাগলো। কুসুমদি বাড়ি ছেড়ে চলে এল রেল হাসপাতালের এই কোয়ার্টার এ। ডিউটি যাওয়ার ও সুবিধা এখান থেকে। আর দায়দায়িত্বহীন বলে একে একে একে কোয়ার্টার এ যাবতীয় সুখের উপাদান, অবসর সময় যাপনের সব ব্যবস্থাই করেছিল একটু একটু করে। পাশাপাশি কোয়ার্টার এর সবাই ভাবতো, বাহ ভদ্রমহিলা তো বেশ সুখেই আছেন। আর কুসুমদি ভাবতে চেষ্টা করতো সুখের অভাব বোধের কারণটা।

তবুও ভাইদের জন্য কিছু করতে গিয়ে যেটুকু ভালোলাগা ছিল,এখন নিজের জন্য সুখের বাড়াবাড়ি একদম সহ্য হয়না কুসুমদির। অপারেশন থিয়েটারর কাজের মধ্যে, ঘরের আলো নিভিয়ে নির্বিকার শুয়ে থাকতে, বা সাময়িক ভাবে বাইরের বাগানের ফুল গাছগুলোর গোঁড়ায় মাটি উছলে দিতে, বা গাছগুলোয় জলের ছেটা দিতে দিতে যখন সময় কাটে, তখনই একমাত্র কুসুমদির মনে হয়, আরও কিছুদিন বাঁচলে হয়।

আচ্ছা,বাগানের আলোটা নেভাতে ভুল হয়নি তো! আলোটা বোধহয় জ্বলছে। সারারাত্তির আলোটা জ্বলবে নাকি! নাহ, আর পারা যায় না,কিছুতেই সবকিছু গুছিয়ে করা হয়ে ওঠে না।

দরজাটা খুলে, বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল সে। নাহ, আলোটা তো নেভানোই, তবে এমন কেন মনে হয়! রাত কত হবে কে জানে! আজ আর কিছুতেই ঘুম আসে না। বেতের চেয়ারটা টেনে বসলো বারান্দায়। পড়ন্ত রাতের নিভ নিভ চাঁদের আলো। শিশির করে ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে, ভোর হতে আর খুব বেশি দেরি নেই। শিউলিগাছটার ছায়া পড়েছে মাটিতে। নীচে শিউলিফুল ঝরে পড়ছে,একবার ইচ্ছে  হলো ঐ গাছটার কাছে যেতে। তবুও পারে না। একটা হালকা শীত আর হাঁটুর ব্যাথা, শরীরের জড়তা। এটা কি জড়তা নাহ বয়সজনিত স্থবিরতা। গাঁদাফুল, বেলফুল,কিছু রজনীগন্ধাও আছে। সবগুলোই ফুলের ভারে নুইয়ে পড়েছে। শিশিরের ভার লেগেছে বোধহয়। ফুলগুলো অমনিই ধরে থাকে,একসময় শুকিয়ে ঝরে যায়। ঘরে কোনও বিগ্রহ নেই যে তার পুজোয় লাগবে। আসলে কোনও ঈশ্বরবোধ নেই কুসুমদির। কে জানে কেন, হয়তো হরেনের প্রভাব আছে। তবে এখন মনে হয়, কোনও একটা বিশ্বাস নিয়ে বাঁচা বোধহয় একপ্রকার ভালোই। একবার ভেবেছিল এই চাকরি ছেড়ে কোনও পাহাড়ি এলাকার মিশনারি হাসপাতালে চলে যাবে। সাহসে কুলোয় নি। তাছাড়া এখানে সবাই তবুও তো মাঝে মাঝেই আসে, দেখা হয়। সংসারের দায়দায়িত্ব শেষ করার পরের বছরগুলো কিছু টাকাও জমেছে তার। রেলের পাশ ও আছে। তবুও কেন কোথাও বেড়াতে যেতে মন এগোয় না। সবার সাথে গেলেও তো সেই একা। এই অবসন্ন মনটা নিয়ে বড় চিন্তা তার। কিন্তু কুসুমদি বাঁচতে ভালোবাসে, আনন্দ করে দিন কাটাতে চায়, তবু পারে না। কেন পারে নাহ!

অনেক আগে একবার হরিদ্বার গেছিল, তখন অনেক ফাঁকা ফাঁকা ছিল হর-কি-পোয়ারির ঘাট। মনে পড়ে কত সুন্দর সন্ধ্যা নামলো, আরতি শুরু হলো। সবাই একে একে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বেলে ভাসিয়ে দিচ্ছিল গঙ্গার  জলে। কত সুন্দর, মনে হচ্ছিল জলে অজস্র নক্ষত্রের ছায়া। কিন্তু বড় ক্ষণিকের। সন্ধ্যা ফুরালেই এই আমেজটুকুও শেষ। তবুও এই ক্ষণিকের আবেশটুকুই ভালোবাসে কুসুমদি। ভালোলাগা, ভালোবাসা কোনোটাই বোধহয় দীর্ঘস্থায়ী হতে নেই। 

কোনোটাই আঁকড়ে ধরে আর পাঁচজনের মতো বাঁচতে শেখেনি কুসুমদি। তাই বোধহয় সেরকম ভাবে পুতুলপুজো, ঠাকুর পুজোর কোনও অভ্যাস গড়ে ওঠেনি। অনেক ভেবেছে এ-সব নিয়ে। অন্তত একটা মানসিক অবলম্বনের জন্য এই ঈশ্বরবোধ টা থাকলে ভালো হতো। সংসার নেই,একা মানুষের একটা ঈশ্বর ভাবনা অনেকটাই বাঁচতে সাহায্য করে। কিছুতেই মনের ভিতর থেকে এমন কোনও বিশ্বাস গড়ে ওঠে না তার।

এমন নয় যে সুখের লিপ্সা ষোলো,তাহলে তো ভাইদের সংসারে কর্ত্রী হয়ে থাকতে পারতো, কিম্বা তার নিজের বসতি থেকে রোজ কিছু কিছু সুখ ভোগ আদায় করতো, কিন্তু সেটা আর হলো কই! সদা নিস্পৃহ কুসুমদির ভালোলাগা বোধটাকে জোর করেই প্রতিদিন জাগিয়ে তুলতে হয়।

তার গ্রামোফোন রেকর্ডে দেরাজ ভর্তি, বইয়ের আলমারি তে অজস্র বই, সেতার ঢাকা দেওয়া, টিভির নবগুলোর পাশে রিমোট পড়ে থাকে, গাছের ফুল ফুলদানিতে ওঠে না, পিছনের সবজিবাগানের কোনও সবজি রান্নাঘরে ঢোকে না, টাকা জমে ওঠে অফিসের প্রফিডেন্ড ফান্ড বা ব্যাঙ্ক একাউন্টে। এ কোন পাপের ক্ষয় করছে কুসুমদি দিনের পর দিন।

এইসব অসংলগ্ন এলোমেলো ভাবনার মধ্যেই আনমনে দরজার দিকে এগোয় কুসুমদি। দরজার আগল বন্ধ করে আবার এলিয়ে দেয় শরীরটা বিছানায়। শারীরিক ক্লান্তি মোছাতে চেষ্টা করে। ঘুমোবার প্রচন্ড বাসনা নিয়ে চোখদুটোও বন্ধ করে দেয়। ইচ্ছে করে ধারাপাত মনে করে করে ঘুমিয়ে পড়বে। অমনি মনে পড়ে হরেনের ছেলেটার মুখ, সেদিন নামতা শুনিয়ে গেছে তাকে। পারমিতা হাসতে হাসতে বলছিল, ছেলের দুষ্টুমির কথা। অথচ কেমন যেন উজ্জ্বল দেখাচ্ছেন,তার গর্বের চোখদুটো। ছেলেটার বুধ্যাঙ্ক খুব ভাল। হবে নাই বা কেন! হরেনের বুদ্ধিও কিছু কম ছিল না।

কুসুমদির ভাইদের নিয়েও কুসুমদির গর্ব করার ছিল।  প্রত্যেকেই ভালো ভালো জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। অথচ সেটা হয়না, শুধু নিজের কথাই সাত-পাঁচ ভাবে। তবে কি পারমিতার প্রতি ঈর্ষা কুসুমদির! নাহ,না, এইসব যত আজেবাজে চিন্তা।

কেউ তো কিছু কেড়ে নেয়নি কুসুমদির কাছ থেকে। যেমন পারমিতাও করুণাভরে এগিয়ে দেয় হরেনকে অত্যন্ত সহজভাবে, দ্বিধাহীন এই অকারণ করুণা কুসুমদিকে কুঁড়ে খায়। এখন তো আর নতুন করে কিছুই চাওয়ার নেই,যে না পেয়ে অবসাদ আসবে মনে! হ্যাঁ,ছিল, সে তো পঁচিশ বছর আগে, কিন্তু কেউ তো কিছুই কেড়ে নেইনি, সে তো স্বেচ্ছায় নির্বাসন দিয়েছে সবকিছুই ভাইদের কথা ভেবে।

এমনি অবস্থায় কখন অসাড় অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়েছে  কুসুমদি। সমস্ত এলোমেলো ভাবনা হারিয়ে গেছে অচেতন গভীর ঘুমে। বেশ দেরি হল ঘুম ভাঙ্গতে। আজ ডে-অফ। চিন্তা নেই। চূড়ান্ত অবসাদ নিয়ে ঘুম ভাঙ্গলো, রোজ যেমনটা সকাল হয়। আলসেমি শরীরটা কোনোমতে টেনে তোলে বিছানা থেকে। রোজকার কাজকর্ম একে একে সারতে থাকে ধীর মন্থর পায়ে। 

রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে মনে পড়ে আজ কমলি'র মা আসবে না। রাতের এঁটো বাসনগুলো পড়ে আছে এক কোনে শীতের আমড়া গাছটার মতো। উনোনে দুধের পাত্র চাপানোই আছে, নামিয়ে ফ্রিজে রাখতে ভুলে গেছে। কড়াইয়ে লেপ্টে রয়েছে সমস্ত দুধটা। একপাশে নামিয়ে রেখে উনানের ছাই সরাতে থাকে। গ্যাস-ওভেন থাকলেও কুসুমদির এই কয়লার উনুনের রান্নাই পছন্দ। রেল কোয়ার্টার এ সে ব্যবস্থা ভালোই।

পারেও বটে কমলি'র মা, দিনের পর দিন, একই কাজ,একই নিয়মে করে যায়। যেমন রোজ রাতে নিয়মিত ঝগড়ার পর মাতাল স্বামীকে ঘরে বসিয়ে ভাত বেড়ে খেতে দেয়, হাড়-জিরজিরে কোলের বাচ্ছাটাকে বুকের দুধ দিতে দিতে আদর করে। কুসুমদি উনানে আগুন দেয়, তারপর লোহার চাপান দিয়ে চিমনি'র সঙ্গে জুড়ে দেয় উনানের মুখ। চাপানের পাশ চুঁইয়ে অল্প অল্প ধোঁয়ার কুন্ডলী ছড়িয়ে পড়ে রান্নাঘরের আনাচে কানাচে।

কুসুমদি এই অবসরে রাতের ক্লান্তি ধুয়ে ফেলে কলঘরে। খানিকটা সজীব হয়ে রান্নাঘরে এসে লোহার চাপান টা সরিয়ে দেয়। উনানের আঁচ এখন গনগনে।

কুসুমদি ভিজে কাপড় বদলে রান্নাঘরে আসে। মাটির গোলা দিয়ে গরম উনানের চারপাশ পরিস্কার করে নিকিয়ে নেয়। ভিজে মাটির ভাঁপ নাকে এসে লাগে এই শুদ্ধ সকালে। বাহ, বেশ মিষ্টি গন্ধ। জিভের ডগায় জল জমে মাটির নোনতা স্বাদ মনে করে। কুসুমদির খুব ইচ্ছে করে উনোনশালের ফেটে ওঠা দু-এক কুচি মাটি মুখে দিতে। সদ্য গর্ভবতী কোনও নারী যে স্বাদ পায়,ঐ মাটি খেয়ে, কুসুমদির জিভে সেই নোনতা স্বাদ।


- গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়। ০৬,০৩,২০২২।

Post a Comment