যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

সরলা বেশ হাসি খুশি, ছেলে মেয়ে আর ঘরসংসার নিয়েই আনন্দিত।

SUDIP DAS Burnpur. Paschim burdwan. এক্ষেত্রে কৌরব পান্ডব,দুপক্ষই অনড়। ফয়সালা_’তোমাদের যা ইচ্ছা হয় করো, সে ও কী আর তার এই সাধের সংসার ছেড়ে শান্

সুদীপ দাস



“দানাং কাথা”।

(গুপ্ত কথা)

সুদীপ দাস

খামটা খুলে চিঠিটা বের করতেই একটা সুমধুর সুবাস ভেসে এলো নাকে । মনে হলো ঠিক মহুলবনের কোনো বুনোফুলের গন্ধ যেন। চিঠির ভাঁজ খুলতেই, দেখলাম তার ভাঁজে গোঁজা একখানি পাঁপড়ি। তার গন্ধই ভাসছিল হয়তো। চিঠিটা অলচিকি ভাষায় লেখা। আমি অলচিকি জানতাম, তবে চর্চার অভ্যাস না থাকায় লেখাটা সম্পূর্ণ পড়া হয়ে উঠলো না। ছোট কয়েকটি লাইনের একটি পত্র। প্রথমে ভেবেছিলাম আমার কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী পাঠক হয়তো প্রশংসাজনিত কোনো আবেগ প্রেরণ করেছে, কারণ সাধারণত এরকম চিঠি অগণিত ঘনঘন আসে এই ঠিকানায়।

কিন্তু অলচিকি ভাষায় ? পত্রখানি এরূপ___”আম ইং দুলার মিয়াই । ইঞ মেতামকানা। খোকা রা:এদা এ।আড়গাৎরে হিজু:মে।আলে আ:। ভুল করে আমার ঠিকানায় চলে এসেছে ভেবে খামের মধ্যে ভাঁজ করা চিঠিটা ঢোকাতে যাব, খামের উপর লেখা ঠিকানায় নজর পড়লো। ঠিকানাটা আমার বাড়িরই। কী জানি কেউ হয়তো মজাক করেছে আমার সঙ্গে। ড্রয়ার খুলে চিঠিটা ওর মধ্যে রেখে দিলাম।

নতুন একখানি উপন্যাস ধরেছি,তাহাই লিখতে বসলাম। সরলা এক কাপ কফি আর চারটে কুকিজ নিয়ে এলো। এমনিতে সরলা বেশ হাসি খুশি, ছেলে মেয়ে আর ঘরসংসার নিয়েই আনন্দিত। দোষের মধ্যে দোষ বদমেজাজি ও একগুঁয়ে।রাগটাগ খুব একটা করে না, যেটুকুও বা করে তাও আবার আমাদের তিনজনের দোষে। লেখালেখি করে যা আয় হয় তাতে আমাদের চারজনের দিব্যি চলে যায়। সেবার তো ছেলের উপর রাগ করে দিন পনেরো বাপের বাড়ি চলে গেছিলো। অনেক করে প্রায় হাতে পায়ে ধরে ফিরিয়ে আনা হয়। ঘটনা হলো, ছেলের এক বান্ধবী এসেছিল বাড়িতে, তার সঙ্গে দরজা বন্ধ করে নোটস লিখছিল। মা তাতে আপত্তি জানায় আর যোগ্য ছেলের সম্মানে বাধে,ব্যাস মায়েপোয়ে তুমুল অশান্তি।

মায়ের হিসেবে দরজা বন্ধ কেন? পোয়ের যুক্তি নিস্তব্ধে মনোযোগ সহকারে পড়ার জন্য বন্ধ করা। এক্ষেত্রে কৌরব পান্ডব,দুপক্ষই অনড়। ফয়সালা_’তোমাদের যা ইচ্ছা হয় করো, আমি তো সবার চক্ষুশূল। সংসারের জন্য দিন রাত হাড় খাটুনি খাটবো,তাও কারোর মন পাবোনা, জলাঞ্জলী যাক সংসারের, আমার আর ভালো লাগে না এসব, চললাম। সেই যে চললাম বলা তো, আর পিছু হটার উপায় নেই।জেদ আর ইগোর লড়াই। এক্ষেত্রে আমি ভিজে বেড়াল, এক্কেবারে স্পিকটি নট। সে ও কী আর তার এই সাধের সংসার ছেড়ে শান্তিতে থাকতে পারে,অন্তর ব্যাকুল,নয়ন ভারী হয়ে যায়__এটি তখন বোঝা যায় যখন ভালোবেসে একটি বার ডাকলেই গুটিসুটি মেরে চোখমুখ ফুলিয়ে এই আস্তানায়।

আজ বাজার করে ফেরার সময় পথে সনাতন বাবুর সঙ্গে দেখা। অনেক দিন পর দেখা হলো। কারণ উনি মাসখানেকের জন্য দেশের বাড়ি পুরুলিয়া গিয়েছিলেন। আমার পাড়াতেই উনার বাসা। চাকরি সূত্রে পুরুলিয়া থেকে এখানে উঠে এসেছেন। দেশের বাড়ির কথা শুনতে শুনতে হঠাৎ করে সেই চিঠিটার কথা মনে পড়ে গেল।আউট অফ সাইট আউট অফ মাইন্ড হয়ে গেছিল ব্যাপারটা।

সনাতন বাবু কে দেখে চিঠিটার কথা মনে হওয়ার কারণ উনি জাতিতে সা৺ওতাল । পুরো নাম সনাতন টুডু। পিটানো গড়ন, গায়ের রং বেশ চা৺পা , আর চোখদুটো উজ্জ্বল।

ব্যাপারটা উনাকে বলে সন্ধ্যায় একবার আমার বাসায় আসতে বললাম, আরেকবার ঝালিয়ে নিতে।

আমার ঘরের এককোনে শোবার খা৺ট, তার পাশে কাঠের আলমারি,আর বিপরীতে আমার লেখার সরঞ্জাম। লেখার সরঞ্জাম বলতে একটা টেবিল, দুটি চেয়ার,খাতা ও কাগজপত্র আর বিভিন্ন রং এর ফাউন্টেন পেন।

দুটি চেয়ারে দু'জন বসলাম। ড্রয়ার থেকে চিঠিটা বের করে ওনার হাতে দিলাম। খাম খুলে চিঠিটা বের করে যা পড়লেন, তাতে আমার সমস্ত পিঠে ফো৺টা ফো৺টা বিন্দুর ন্যায় ঘাম একত্রিত হতে লাগলো। এটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না, যদিও অপ্রত্যাশিত নয়। ষড়যন্ত্র ______তাই বা কী করে সম্ভব?


সনাতন বাবু বললেন, “আমি তোমাকে ভালোবাসি, কথা আছে । খোকা কাঁদে আমাদের।কখন আসবে? সকালে আসিও।“


অশিক্ষিত মানুষের মতন অগোছালো লেখাগুলো। অর্থাৎ শিক্ষিত কারোর কাজ নয়, এটা পরিষ্কার।


ক্ষণিকের ভ্রম কাটিয়ে মনে পড়লো, চরিত্র ও প্লটের খোঁজে আমাকে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন চরিত্রের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতে হয়।তার ই কোনো এক চরিত্র এটি।

মেয়েটির নাম ঝিমলি। সেই যেবার মানভুম গিয়েছিলাম, সেবারের ঘটনা ,বা বলা চলে দূর্ঘটনা। দূর্ঘটনা কেন বললাম এবার সেটাই বলছি______বেশ মিষ্টি মেয়ে এই ঝিমলি। বয়স আনুমানিক বাইশ কি তেইশ হবে। সুঠাম গড়ন, মেদহীন মসৃন উদর, সুডৌল স্তনের আকৃতি,পিঠ যেন তেল মালিশ সদৃশ মখমল,কালো গায়ের রঙ এর আস্তরণে মিশ কালো একগোছা চুল,চিতল হরিণের মতো চক্ষু। চোখের দৃষ্টি ই যেন প্রেমের ধারাপাত বয়ে নিয়ে আসে অন্তরে। ব্লাউজ হীন গ্ৰাম্য রীতি অনুযায়ী জড়ানো শাড়ির তলে সর্বত্র মোহমায়াময় আকর্ষণ।

আমি ছিলাম মুল গ্ৰাম হইতে অদূরবর্তী এক পোড়ো টাইপের পরিত্যক্ত বাড়িতে।গ্ৰামপ্রধানের ঐকান্তিক নিষেধ স্বত্ত্বেও আমার একান্তই শব্দহীন নিরিবিলি পরিবেশ প্রয়োজন ছিল, তাই দ্বিরুক্তি না করে এটিকেই পছন্দ করেছিলাম। যদিও দেহাতি এই সাঁওতাল অধ্যুষিত এলাকায় পোড়ো বাড়ি মানেই অশরিরীর উৎপাত আছে বলেই কথিত।

এদিকে আমার আবার ভুত প্রেত এসবে বিশ্বাস খুবই ক্ষীণ। আমার যুক্তি বিজ্ঞান বলে মানুষের শরীর হলো গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন যন্ত্রের সংমিশ্রণ।শিরা-উপশিরা,এগুলি হলো গিয়ে তার ওয়ারিং।সমস্ত টাই অটোমেটিক মেশিন। বিদ্যুৎ সরবরাহের ন্যায় রক্ত সরবরাহ হয়। বিদ্যুৎ এর অভাবে যেমন আধা৺র নেমে আসে তেমনই রক্তের অভাবে জীবন স্তব্ধ হয়ে যায়। এরমধ্যে আত্মা বা অনাত্মা কোন কিছুর অবস্থান নেই । সব ই মায়া আর কুসংস্কার । ভ্রান্ত ধারণা, প্রমাণহীন চেতনা, আদিবাসী জগতে আবার এর প্রভাব যথেষ্ট।

গ্রাম হইতে বাস রাস্তার দূরত্ব খুব বেশি নয় ।এই রাস্তার উপর দিয়েই রাচি- নেতারহাট পথ ,তাই সারাদিনে বেশ গাড়ি ,বাসের ব্যস্ততা বর্তমান, তৎসঙ্গে দোকানপাটেরত্ত অনাধিক্য নেই। রাস্তার ধারের এক ধাবা থেকে দু বেলার ভোজন আসত। প্রথম কদিন একটি অল্প বয়স্ক ছেলে এসে খাবার দিয়ে যেত, সুস্বাদু না হলেও চলনসই। কাকিলা মাছের ঝাল, হাঁসের মাংস, কাছিমের মাংস ইত্যাদি ব্যঞ্জন সমৃদ্ধ। আশ্চর্যজনকভাবে একদিন কাজলি মাছের পিয়াজ বাটা ঝোল খেলাম।

আমার আবার প্রত্যহ রাত্রে হুইস্কি খা খাওয়ার অভ্যাস প্রাচীন, ফলে সকালে ঘুম ভাঙতে দেরি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয় ।এরকমই একদিন সকালে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে একটু অবাক হয়েই খিল খুলতেই দেখি একটি সুন্দরী মেয়ে। অবাক দৃষ্টিতে বেশ কিছুক্ষন চেয়ে রইলাম। সদ্যস্নাতা রিক্ত কেশী কাজলা নারী কপালে নীল টিপ ।

পশ্চাতে সুবর্ণ প্রভার ছটা এলোকেশী ভেজা চুলে ঠিকরে চিকচিক করছে, হাতে কাঞ্জি ,মানে পান্তা ভাতের জল। কানে কানন কুসুম। মৃদু স্বরে বলল,” বাবু কাঞ্জি এনেছি।“

বললাম _কি হবে ওটা দিয়ে? আর তুমিই বা কে ?কোথা থেকে আসছ? বাড়ি কোথায় এই গ্রামেই?

হু, বলে আমাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। আমি ফিরে অবাক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলাম, তারপর কাছে গিয়ে তার নাম জানতে চাইলাম।

সেরূপ কোমল কন্ঠে উত্তর_ ঝিমলি। এটা খেয়ে নিন বাবু, খুব উপকারী।

আমি বললাম, এত সকালে কেন? এত সকালে তো কেউ আসে না।

মৃদু ,মুচকি হেসে বলল ,আমি আসি। আজ থেকে রোজ আমি আসবো। যখন ইচ্ছে হবে তখন আসবো ।যা ইচ্ছে হবে তাই করবো ,তুমি কিন্তু বাধা দেবে না বাবু।

আমি খানিক ইতস্তত হয়ে বললাম ,কিন্তু তুমি আসবে কেন? আমার তো প্রয়োজন নেই তোমাকে। কি বলল কিছু বুঝলাম না। হয়তো প্রাচীন আদিবাসী কোন ভাষা হবে_____ তাই।

নারীর উপস্থিতি যে কোন পুরুষ মানুষের জীবনে নিগূঢ় সুখানুভূতির বসন্ত বাহার আনয়ন করে, আমারও অনুরূপ মাধ্বি আক্রান্ত হল।

বাবু, আমার একটা অনুরোধ আবদার আছে।

আমি বললাম, তুমি তো জাতিতে সাঁওতাল আদিবাসী, তাহলে এত ভালো বাংলা বলো কি করে?

শিখেছি।

কার কাছে?

দশ বছর বয়স থেকে আমি বর্ধমানে ধান রুইতে যাই, সেখান থেকেই।

তোমার পরিবার, মানে বাবা-মা ভাই বোন?

কেউ নেই বাবু। এক দুর্ঘটনায় সবাই মারা যায়। বাবু আমার আবদার?

ও_ হ্যাঁ, বলো তোমার কি আবদার?

বাবু তোমাকে আর ওই হোটেলের খাবার খেতে হবে না। ও খাবার ভালো নয়। ও খেলে শরীর খারাপ হবে। আর……

আর কি ঝিমলি ?এই নামটাই তো বললে না?

হ্যাঁ বাবু, আমার বাবু ভালোবেসে নামটা রেখেছিল।

আচ্ছা__ কি যেন দুর্ঘটনার কথা বলছিলে?

ও কিছু না।

কথাগুলো বলতে বলতে সিমলি আমার রুমটা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে টিপটপ করে দিল।

এমনি করে দিনপাত হতে লাগল। ঝিমলি সকালে আসে আর রাত্রে চলে যায়। সারাদিন মক্ষিকার ন্যায় সারাঘর বিচরণ করে। কখনো কথা বলে আবার কখনো গুন গুন করে গান গায়, যেন পৃথিবীর সমস্ত গন্ধাধিবাস একত্রিত হয়ে ঝিমলির পবিত্র মনে আবিষ্ট হয়েছে। বিহঙ্গের কাকলি সকল অন্তরে প্রবেশিয়া গুঞ্জরণ করিতেছে, ঝরনার কলকল তাহার অন্তরে বহিতেছে, গাঙ্গুড়ের স্রোতধারা অতি সন্তর্পনে কোমল ধারায় বহিতেছে ,গিরিমল্লিকা তাহার পুষ্প সকল প্রস্ফুটিত করিতেছে।

ঝিমলির প্রতি মায়া ক্রমবর্ধমান হতে লাগলো। রাত্রে মদ খেলেও ভোরের প্রভাতের সমকালীন নিদ্রাভঙ্গ হতে লাগল ।লেখালেখির অধঃপতন শুরু হলো। দিবারাত্র মাথায় শুধু ঝিমলি। মনে মনে গুঞ্জন ঝিমলি, ও _ঝিমলি, তুমি কখন আসবে ?তোমায় ছাড়া যে চলছে না আর।

ভাবতে ভাবতেই দরজায় ঝিমলির নুপুর ধ্বনি। আজ তাহলে নূপুর পরে এসেছে। নুপুরের শব্দ আমার ভীষণ প্রিয়। দ্রুত পায়ে প্রায় দৌড়ে দরজা খুললাম, ঝিমলি ঘরে ঢুকলো। আজ ওকে বেশি আকর্ষণীয় মনে হল। মনের ভিতরটা উথলে উঠলো। নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলাম না, ওকে জড়িয়ে ধরলাম____ হ্যাঁ ওকে বুকের মধ্যে নিংড়ে ধরলাম।

ঝিমলি ও বাধা দিলো না, শুধু গুণ্ঠিত হয়ে বুকের সঙ্গে লেপ্টে থাকলো। বোধ হয় আকস্মিকতায় বিহ্বল।

হঠাৎ আমার সম্বিৎ ফিরতেই ছিটকে দূরে সরে এলাম। অপরাধীর মত মনে হল, ক্ষমা চাইলাম।

ঝিমলি নিরুত্তর রইল।

দেখলাম ওর সমস্ত শরীর ঘনরসে সিক্ত। মানে, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে ।এতক্ষণ খেয়ালই করিনি। বারান্দায় বেরিয়ে দেখলাম বাইরে অঝোর পাত।

সলজ্জ ভঙ্গিতে বললাম, আরে তুমিতো সম্পূর্ণ ভিজে গেছ ।যাও পোশাক পাল্টে নাও।

না তার দরকার নেই, কিচ্ছু হবে না আমার।

না, আমি তোমাকে এই অবস্থায় থাকতে দেব না। অসুস্থ হয়ে যাবে।

ঈষৎ ঠোঁটদুটি বেঁকিয়ে বলল, বললাম তো আমার কিচ্ছু হবে না, এরকম কত ভিজি আমি। বৃষ্টি হলেই আমি ছুট্টে বেরিয়ে যাই,

আর…….

আর কি?

কিছু না।

কেমন হঠাৎ মন মরা হয়ে গেল উচ্ছ্বল যৌবনা যুবতী ।মুগ্ধ নয়নে দেখলাম, সিক্ত বসনে ও আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

বাইরের কালো আকাশ দিনারম্ভেই কেমন যেন সায়ংকাল বয়ে নিয়ে এসেছে। ঘুমপাড়ানি পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। ধরা হয়তো শীতল হচ্ছে, মলিন বস্ত্র পরিত্যাগ করে নব পল্লবে নববস্ত্রে আরঞ্জিত হচ্ছে।

রান্নাঘর থেকে ঘৃতান্নর সুবাস ভেসে আসছে বাইরে ঘূর্ণি বৃষ্টি অবিরাম চলছে। যেন বহুকালের শোক, দুঃখ, বেদনা, যাতনা ,যন্ত্রনা সব ধুয়ে মুছে পরিশুদ্ধ হচ্ছে।

বিছানায় বসে এসব ভাবছি, ঝিমলি পাশে এসে বসলো ।ওর কোমল হাত আমার কঠিন হাতে ছো৺য়ালো। কি আনন্দ ,কি পরম সুখ, কি অমলিন সেই স্পর্শ।

ঝিমলি কানের কাছে ঠোঁট জোড়া এনে ফিসফিসিয়ে বললো, বাবু তুমি আমাকে খুব ভালোবাসো… না?..

কানের মধ্যে উষ্ণ বাতাস আর ফড়ফড় শব্দ অনুভব করলাম। হঠাৎ ও আমার কানের লতিতে হাল্কা একটা কামড় দিয়ে পালিয়ে গেল।

রান্নাঘর থেকে বিহানের মিঠে সুর ভেসে এলো। বুঝলাম বহুদিন পর কেউ অপার আনন্দ অনুভব করলে এরকম মিহি সুরে গান গাইতে পারে।

এভাবেই কয়েক মাস কেটে গেল।এ পোড়ো বাড়ি এখন আমার কাছে আশীর্বাদ স্বরূপ মনে হতে লাগলো। ঝিমলির প্রতি দূর্বলতা এতটাই প্রখর হতে লাগল যে এখন আর রাতে ওর চলে যাওয়া আমার পক্ষে অসহনীয় হয়ে উঠছে। মদ খাওয়ার পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ঝিমলির চোখ,ওষ্ঠ,অধর,বক্ষ ,পিঠ, তার সমস্ত শরীর সর্বদা চোখের সামনে ভেসে বেড়াতে লাগল। ওকে একান্ত নিজের করে পাওয়ার পিপাসায় মনপ্রাণ আকুল হয়ে উদভ্রান্ত হলো। আমি ব্যাকুল…. আমি পিপাসিত।

বাবু, তুই আমায় বিয়ে করবি ? আমার সোয়ামি হবি ?

বিয়ে! কিছুক্ষণ চেয়ে ভেবে বললাম তা কী করে সম্ভব?

আদুরে গলায় বলল, তুই তো আমায় খুউউউব ভালোবাসিস, তাহলে করতে পারবি না কেন ?


মিনিট খানেক নিরুত্তর থেকে মনে মনে বললাম, করতে পারবো না কেন! কী করে বোঝাই তোকে ঝিমলি।

আমার সাথে খালি সোহাগ করবি বাবু?

আরো কিছুক্ষন কোনো কথা বলতে পারলাম না, অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বসে থাকলাম।


ঝিমলি কি বুঝলো জানিনা। শুধু সজল চোখে চেয়ে থেকে বলল, তুই আমার জন্য কষ্ট পাস না বাবু , আমি কষ্ট সইতে পারি না।

বলতে বলতেই মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টির মতো দু নয়ন বেয়ে ঝর্ণা ঝরে পড়লো। দৌড়ে রান্নাঘরে চলে গেল।

আমি ধীরপদে ওর কাছে গিয়ে কা৺ধে হাত রেখে ওকে তুলে ধরলাম , তারপর গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে জাপটে ধরে আদর করতে লাগলাম। এক সময় সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে এক হয়ে গেলাম।

তারপর বহুবার হয়েছি, ঝিমলি কোনো বারও বা৺ধা দেয়নি । নিস্পাপ মনে নিজেকে স৺পে দিয়েছে। সেবার তো ও বলেই বসলো , বাবু তোকে এক মূহুর্ত না দেখলে আমি বিহ্বল হয়ে পড়ি । তারপর আহ্লাদের ঢঙে গলা জড়িয়ে বলল, “আমদ দারে দে দাড়ে আম” ।

আমি অবুঝের মতো তাকিয়ে রইলাম। আমার অবস্থা দেখে ওর সে কি হাসি। মুক্তোর মত ঝকঝকে সাদা দাঁতের ফাঁকে ঈষৎ হেসে বলল, “তুই গাছে চড়তে পারিস ?”

আমি বোকার মতো তাকিয়ে বললাম, না, কখনো চড়ি নি । কিরে বাবু তুই কেমনে, গাছে চড়তে পারিস না।

সেদিন রাতে দু’জনে খুব মদ খেয়েছিলাম। নেশা বিভোর স্বরে বলে ছিল, “বে জাএ বুল আকানা এ”।(খুব নেশা হয়েছে)।

আমি দূর্বলতায় অতি সক্রিয় হয়ে বলেছিলাম, আমার প্রিয়া__ আমার প্রেম। আমার বিবি।

ঝিমলি তার দুবাহু দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে আদুরে ভাব নিয়ে বলেছিল “ইঞরেন্ হেরেল “।(আমার স্বামী)। বার কয়েক কপালে চুম্বন করে বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে রইল।

অপ্রত্যাশিত ঘটনা টা হয়তো সেদিনই ঘটেছিল। সেদিন আমরা দু’জনেই বেহেড ছিলাম।

সকালে নেশা কাটলে বলেছিলাম, আমাকে তোদের ভাষা শেখাবি ..শেখাবি আমাকে ? আমি তোর সঙ্গে তোদের মত করে কথা বলবো ।
হো হো করে হেসে উঠলো।বললো, তুই আমার সঙ্গে আমাদের ভাষায় কথা বলবি ? দুহাতের চুড়ির ঝনঝন শব্দ করে বাইরে বেরিয়ে গেল।

আমি চিৎকার করে বললাম, তোর চুড়িগুলো আমার খুব পছন্দ হয়েছে রে ঝিমলি। আমাকে তুই খুব ভালোবাসিস না রে ঝিমলি?

“ বাঞ্ রড়া.. তা বলবো না”।

“আম্ ইঞ্ এম দুলাড়্ ইদিংকানা”?

“হে৺ঞ ইঞ্ দুলাড়্ এৎ মে আ ।“

“ দুলাড়৺তে দোহে কিনমে্ !”

তুমি আমাকে ভালবাস ?

হা৺ বাসি ।

প্রেমে রাখিও ।

পুকুর ধারে বসে দু’জন কত রাত কাটিয়েছি। কত দুপুর গড়িয়ে সূর্যাস্ত হয়ে গেছে, কারোর খেয়ালই হয় নি।শাল পিয়ালের বনে বনে হাতে হাত রেখে কতবার ঘুরে বেড়িয়েছি ।কত রকম পাখির কলকাকলিতে আমাদের প্রেমের বন্ধন সুদৃঢ় হয়েছে। বন্য নদী পাড় ধরে বিস্তৃত জমির আল ধরে হেলতে দুলতে মনের কথা বলতে বলতে পথ হে৺টেছি ।কতশত ছোট বড়ো কাটকোম(কা৺কড়া) ধরেছি, আবার তাদের টলমলে জলেই ছেড়ে দিয়েছি। রামড়া(মাষকলাই),বাটরা (মটর),বুটু(ছোলা) ক্ষেত থেকে ফলন্ত গাছের শাখ হতে ফল পেড়ে খেয়েছি। জোন্ড্রা(ভূট্টা) ঝোপের আড়ালে দু’জন দুজনকে জড়িয়ে ধরে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়েছি।

রাজবাহা (করবী),দাতরেবাহা (ধুতরা) ফুল তুলে ঝিমলির খো৺পায় গুঁজে দিয়েছি।পাউরা হান্ডি পান করে বেসামাল অবস্থায় বাড়ি ফিরেছি। সন্ধ্যের উজ্জ্বল চন্দ্র কিরণের তলে নদী তীরে অব্যবহৃত লাউকায় (ডিঙি) বসে পান করেছি।আর ঝিমলির উত্তপ্ত ঘ্রাণ আহরণরত নিদ্রা গিয়েছি।

দোয়েল,কাক, বনমোরগ,ছাতারে,রবিন, মৌটুসী,পোয়াই,রামগঙ্গা এদের সুরে সুর মিলিয়ে জিগির তুলেছি। নোঙ্গর ছেঁড়ার মতো উদ্যাম অনুষ্ঠিত অগোপন অনপত্য দিনযাপন করেছি। ঝিমলির জীবনের সব বৃত্তান্ত গোচর করেছি।

ঘনিষ্ঠ মূহুর্তে ওর বুকের মধ্যে ওঠা ধড়ফড় শব্দ আমার পিপাসার্ত জীবনের তৃষা বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। জোৎস্নালোকে বারান্দায় বসে যখন মহুয়াকে সঙ্গী করে থাকত, তখন ওর ঢুলুঢুলু আলুলায়িত নেত্র আমার পানে এমনভাবে চেয়ে থাকত দেখে মনে হত এমন ই সঙ্গীসখার নিমিও এই বিশাল পৃথিবীর এক অতি ক্ষুদ্র গাঁয়ে দীর্ঘ কাল অপেক্ষারতা রজঃসলা এক অতি মানবী।

আমি কতবার বলেছি,চল ঝিমলি আমার দেশে, আমার শহরে। ওখানে কতকিছু আছে। রেলগাড়ি,ট্রামগাড়ী, বিশাল সুসজ্জিত মল, সিনেমা, থিয়েটার,রাইড আরো কতো কি।ও কিছুতেই রাজি হত না। বলতো, ছোটবেলায় কয়েকবার রেলে চড়েছি কিন্তু এখন আর ইচ্ছে করে না। ওই যে বার রেলে চড়ে কাজ থেকে ফিরছিলাম, তখনই তো সবাই…………..

আর কিছু বলল না ঝিমলি, শুধু ওর নয়ন আমার নয়নে স্থির হয়ে রইল।

আমি বলতাম তোর এই মায়াদৃষ্টিই আমাকে তোর কাছ থেকে দূরে সরে থাকতে দেবে না। “মায়াবী হরিণী”।শুনে খিলখিল করে হেসে উঠত ঝিমলি। হাসলে গালে যে টোল পড়ত, তাতে কি ভারি সুন্দর যে ওকে দেখাত, যেন পর্বত শৃঙ্গের উপর থেকে ঝরে পড়া ঝরণায় স্নানরত সিক্ত বসনা কৌমুদি।

ঝিমলি ওর সমস্ত মনপ্রাণ যৌবন দিয়ে আমাকে পাগলের মত ভালোবাসত । কিন্তু একদিন পত্র এল সরলার বেজায় অসুখ করেছে। ম্যালেরিয়া বা টাইফয়েড জাতীয় কিছু হবে সম্ভবত।জ্বর কিছুতেই কমে না।

যে কটা মাস এখানে ছিলাম ঘরসংসার, সরলা, ছেলেমেয়ে কারোর কথাই সেভাবে মনে পড়েনি। আমি যেন কালাপানির কোনো কয়েদি, বহু বছর পর ছাড়া পেয়ে মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় সুখানন্দে বিভোর। জীবনকে উপভোগ করার, তার সুমিষ্ট রসাস্বাদন গ্ৰহন করার উদগ্ৰ বাসনায় অবিরাম মত্ত। অজানা অচেনা সরল সাধাসিধে অমায়িক এই রূপের স্বাদ আকন্ঠ পানে নির্বাপিত।

অনিবার্য কারণে পত্র পাওয়ার পর দিন ই আমাকে চলে আসতে হলো। আমার ঝিমলির সকরুণ দৃষ্টি আজ আমাকে দ্বিতীয় বার আর্দ্র করল।

আজ প্রায় বছর খানেকের বেশি হবে আমি আবার সেই পথে।যার সঙ্গে এত দীর্ঘ গভীর সময় ব্যয় করেছি, তাকে এভাবে ভুলে যাওয়াতে নিজের প্রতি চরম ঘৃণার উদ্রেক হল। জানিনা সরল অবলা ঝিমলি এতদিন কিভাবে পিপাসার্ত চাতকের মতো আমার পথ চেয়ে বসে আছে।

কী বলব গিয়ে? বলেছিলাম খুব শিগগিরই আবার তোর কাছে ফিরে আসব, কিন্তু চিঠিটা না এলে তো………..

ওর মায়াবী সরল চোখে চোখ রেখে কী জবাব দেব?কেনো আসিনি এতদিন?কেন তাকে ভুলে ছিলাম?কেন ওঁর প্রতি এত অবহেলা করলাম? বক দেখানো ভালোবাসা করলাম ?

শরীর প্রতিক্ষায় প্রতিক্ষিত হয়তো ঝিমলি।হয়ত চারিদিকে ঢি ঢি। পড়ে গেছে,ওর টেকাই দায় হয়েছে।

বড় রাস্তা ছেড়ে গ্ৰাম্য কা৺চা পথ ধরল অ্যাম্বাসেডর টি। জানলা দিয়ে সেই পুরনো ক্ষেতজমি, জলাভূমি, নদী সবই চোখে পড়ল। রোমাঞ্চিত হলাম, ভয়ে না আনন্দে, বুঝলাম না।আমিই ছিলাম ঝিমলির 'কানু ছাড়া গীত নাই'।

আর আজ কোন মুখ নিয়ে এলাম? কী ভীষণ অপরাধবোধ হতে লাগল।গ্ৰামের সমস্ত খড় ছাওয়া কা৺চা বাড়ি পেরিয়ে যখন পোড়ো বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামলো, অনুভব করলাম পা দুটো থরথর করে কা৺পছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম একত্রিত হয়েছে। কানের পেছনে ঘাম ঝরে পড়ছে।

নেমে সম্মুখে দৃষ্টি পড়তেই মাথায় যেন বাজ পড়ল। এ কি অবস্থা! বাড়িটা নিশ্চিহ্ন। দেওয়াল, দরজা-জানলা, ইট-পাথর সব ঝোপের মধ্যে ধুলিস্যাৎ, উই ধরা একটি প্রাচীন পালঙ্ক,জং ধরা কখানি বাসনপত্র, দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া আলমারি, পা ভাঙ্গা বেতের দুখানি চেয়ার গাছের ভাঙা ডালে হেলান দিয়ে আছড়ে পড়ে। গাড়া থেকে জল বয়ে যাওয়ার ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে।

বিস্ময় বিহ্বল নেত্রে চেয়ে আছি, হঠাৎ মনে হল কানের কাছে কেউ ফিসফিস করে বলে উঠলো__” ফাসিআড়া”।_____“মিথ্যেবাদী”, চমকে উঠলাম।

কাইঃ(অপরাধী)-এর মতন নীরবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। দূর থেকে কারোর গলা পেয়ে নীরবতা ভঙ্গ হলো, তাকিয়ে দেখি গ্রামপ্রধান, আমাকে দেখে এদিকেই এগিয়ে আসছে ,সঙ্গে একটি বছর বারোর ছোড়া।

বাবু,' বগে্ বাড়াগি আম?’ অর্থাৎ ভালো আছো?


বললাম, ‘বগেগি আঞ্,আমদ্ চেয়ে লেকা।‘?

ভালো আছি, তুমি কেমন আছো? আচ্ছা, ঝিমলি কোথায় ?জানতে চাইলাম।

প্রশ্নটা শুনে যেন চমকে উঠল মোড়ল, কাঁপা কাঁপা গলায় বললো ঝিমলি?

হ্যাঁ.. হ্যাঁ.. ঝিমলি। এই বাড়িতেই তো থাকতো। আমার সঙ্গে কতদিন দেখা হয়েছে। সবকিছু আর জানালাম না।

শুনে বেশ অবাক হল বুড়ো।বলল, আজ বিশ বছরের উপর হয়ে গেল এই পোড়োবাড়িতে কেউ থাকে না। এ কুখ্যাত ডাকাত বিধু কো৺ড়ার বাসা ছিল। আমি বিধু কো৺ড়ারকে কে বৃদ্ধ বয়সে দেখেছি। কুড়ি বছরেরও বেশি হবে, তখন আমি এই চল্লিশ হব হয়তো।

শুনে বিশ্বাস করতে পারলাম না। প্রতিবাদের স্বরে বললাম সে কি করে সম্ভব ?এক বছর আগেই তো আমি আর ঝিমলি………।

চলুন বাবু আমার দাওয়ায় গিয়ে একটু জিরোবেন।

দাওয়ায় দড়ির খাটিয়ায় বসলাম। প্রধান বাড়ির অন্দরের উদ্দেশ্যে বলল, 'পেড়াহড়্ হেঃই আকানাএ'(কুটুম এসেছে),’টুইলা ওকারে'?(টুইলা কোথায়)।

ভেতর থেকে নারী কণ্ঠ ভেসে এলো,”ওড়াঃরে বানুঃগিআ”।( বাসায় নেই)।

গাই ঞাম্।।(গরু খুঁজতে)আবার সেই নারী কন্ঠ,”বাঞমেন দাড়ে আঃ আ”।(বলতে পারব না) বিদ্যুৎ ঝলকের ন্যায় চমকে গেলাম নারী কন্ঠ শুনে ,একদম ঝিমলি। অবিশ্বাস্য।

মনের মধ্যে নারীকে দেখার বাসনা প্রবল হল। ভাবতে ভাবতেই আচ্ছন্ন ভাব কাটলো যখন দেখলাম ব্লাউজহীন অর্ধ উলঙ্গ এক নারী মূর্তি মাথায় ঘোমটা টেনে বেরিয়ে এলো। হাতে একখানি লোটা আর দুটো গ্লাস। লোটা থেকে দাহের (দই) শরবত ঢেলে একখানি গেলাস হাতে করে আমার সামনে মাথা নিচু করে দিল, ঘোমটার তলা থেকে মুখখানি দেখে বেহুশ হওয়ার মত পুনরাচ্ছন্ন হলাম।

কে….? ঝিমলি না ?,বলতে গিয়েও ওষ্ঠদ্বয় আলগা হলো না।

আমার বউমা কাজোরি, গতবছর বিবাহ দিলাম,,বলল প্রধান।

মনে মনে বললাম, না এ কাজরি নয়.. ঝিমলি। ব্যগ্ৰচিত্তে প্রশ্ন করলাম, ঝিমলি কে?

মোড়ল এক দীর্ঘ নিশ্বাস ছেলে বলল, বিধু কো৺ড়ারের নাতনি।বিধুর মৃত্যুর পর ওদের পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। ওর ছেলে, বৌমা ,নাতি সবাই শহরে গিয়ে বাবুদের জমিতে চাষের কাজ করতে লাগলো। ধীরে ধীরে বেশ টাকা পয়সাও জমালো। তিন কানি জমিও খরিদ করল।বছরে দুবার করে ওরা শহরের বাবুদের কাছে জন খাটতে যেত। কিন্তু একদিন সংবাদ এল কোথায় যেন রেল দুর্ঘটনায় বিধু ছাড়া পরিবারের সকলেই মারা গেছে। ঝিমলির বয়স তখন বিশ হবে হয়তো ।ওর বিয়াও ঠিক হয়েছিল পাশের গ্রামের মধুর সঙ্গে ।কিন্তু তার আগেই সবশেষ। ও আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলো না, সেই রাতেই গলায় দড়ি দিল। সে তো আজ বিশ বছর আগের ঘটনা।

আমি অবসন্নের মত মাথা নিচু করে বসে আছি, হঠাৎ খেয়াল হলো বেলা অনেক হয়েছে। বাড়ি ফিরতে হবে । উঠলাম…

বললাম,'বের্ হোয়এনা,ইঞদ্ চালাঃ কানাঞ।‘ বেলা হয়েছে, আমি যাই।

উঠতে যাব হাসির শব্দে মুখ ফেরালাম, দেখলাম দরজার আড়ালে রমণী দাঁড়িয়ে বা৺শের খুঁটি ধরে। ঘোমটার নিচে ওষ্ঠ দুটি মুচকি্ মুচকি্ হাসছে। আরো অবাক হলাম দু পা এগিয়ে, ঘরের ভেতর থেকে বাচ্চার কান্নার শব্দ ভেসে আসছে, শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম কিছুক্ষণ।

দ্বিতীয়বার মুখ ফেরাতেই সেই মুখ চোখে পড়ল….., দরজার আড়ালে ঘোমটাহীন সেই মায়াবী নেত্রজ্যোতির পল্লব ,টোল আর ঠোঁট এর কোণে মৃদু হাসির রেখা। কপালে নীল টিপ, কানন কুসুম ঝুলছে দুকান বেয়ে।

দ্রুতপদে ফিরে চললাম গাড়ির দিকে। বড় রাস্তার উপরে মৃদু লম্ফ দিয়ে গাড়িটা উঠতেই, কিসের শব্দে বিভোর কাটলো। মনে হল টুংটাং শব্দ করে কিছু একটা গাড়ির সিট থেকে পায়ের কাছে এসে পড়ল ।মাথা নিচু করে হাতে তুলে নিলাম।

মেরুদন্ড দিয়ে শীতল তরঙ্গ ঝড়ের বেগে নিচের দিকে চলে গেল । নির্বাক ও অবাক দৃষ্টিতে দেখলাম একগোছা লিপুর( নুপুর ),যা দেখেছিলাম বছর খানেক আগে ঝিমলির পা -এ।

চক্ষু বেয়ে অশ্রু ধারা সবেগে গলায় নেমে এসে জাপটে ধরলো। কানের কাছে কেউ যেন ফিসফিস করে বলল,” ফাসিআড়া…ফাসিআড়া ।“

SUDIP DAS..
Phone no-7908417644
Burnpur... Paschim burdwan.


Post a Comment