যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

সুখের মুখোশ ভীষণ ফরমাশি মিথ্যে ভরা আশ্বাসে নিই শ্বাস বাঁচতে তখন ভীষণ ভালোবাসি বদ্ধ জলে জিওল মাছের চাষ।

'জীবন' কবিতায় জীবনকে এভাবেই অনুভব করেছেন। জীবনকে খুঁজে পেতে এবং জীবনের স্বরূপকে অনুধাবন করতেই সময়ের ভাঙনকে সামলাতে পারেন। তাই বুক পেতে হাজারটা আমফানে

রাখহরি পাল


 অবক্ষয়যাপনের সময়কে অনুধাবন

 🍂

তৈমুর খান 

🍀



 কবি রাখহরি পালের চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ 'উদাসীন স্মৃতি'(জানুয়ারি ২০২২) একরাশ স্নিগ্ধতার পরশ এনে দিয়েছে। রাখহরি পাল অংকের স্যার ছিলেন, কিন্তু তাঁর মনের খাতায় জমা হচ্ছিল নানা স্মৃতির জ্যামিতি। অনুভূতির জ্যোৎস্নায় সেগুলি শব্দের বিন্যাস চাইছিল। আর কবি ছন্দের নিয়ন্ত্রণে এক একটি কবিতার ইমারত নির্মাণ করেছিলেন। এই কাব্যখানি আগাগোড়া সেই অক্ষরবৃত্তের চালেই গড়ে ওঠা ইমারত, যেখানে কবির শৈশব থেকে উঠে আসা সমগ্র জীবনের প্রতিচ্ছবির প্রতিধ্বনি শোনা যায়। সহজ অথচ সাবলীল প্রকাশ কাব্যের ৭২ এর অধিক কবিতায় তা মহিমান্বিত হয়ে উঠেছে।

      ইতিহাস-ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারকে আশ্রয় করেই কবি তাঁর উপলব্ধির দরজা খুলেছেন। সেখানে সম্মোহনের আকাশ, চাঁদ আর নক্ষত্রমণ্ডলীর ভেতর আত্মযাপনের নিবিড় মুহূর্তগুলি রোমান্টিক স্বপ্নজাল বিস্তার করেছে। কিন্তু মৃত্তিকাচারী জীবনকে তিনি ভুলতে পারেননি। স্মৃতির অনন্যতায় জারিত হয়ে লিখেছেন:

 "সুখের মুখোশ ভীষণ ফরমাশি

 মিথ্যে ভরা আশ্বাসে নিই শ্বাস

 বাঁচতে তখন ভীষণ ভালোবাসি

 বদ্ধ জলে জিওল মাছের চাষ।"

 'জীবন' কবিতায় জীবনকে এভাবেই অনুভব করেছেন। জীবনকে খুঁজে পেতে এবং জীবনের স্বরূপকে অনুধাবন করতেই সময়ের ভাঙনকে সামলাতে পারেন। তাই বুক পেতে হাজারটা আমফানের মোকাবেলা করতেও পারেন। জর্জ বার্নার্ড শ একবার বলেছিলেন:

"Life isn't about finding yourself. Life is about creating yourself."

 অর্থাৎ জীবন নিজেকে খুঁজে পাওয়া সম্পর্কে নয়। জীবন নিজেকে তৈরি সম্পর্কে। এখানে কবিও জীবনকে তৈরি করেছেন। আর তৈরি করেছেন বলেই এত প্রশ্নের মধ্যেও আসন্ন সংকটকালকে আশ্বাসের প্রত্যয়ভূমিতে পরিণত করেছেন। কোন্ পথে জীবনের অভিমুখ, কে তার নির্ণায়ক তা ভাবার সুযোগ যখন আসেনি, তখন কবি প্রকৃতির কাছে দাঁড়িয়ে জীবনের জোশ উপলব্ধি করেছেন। কবিতায় লিখেছেন:

 "পৃথিবীর ভূমিতটে এত যে নরম ঘাস

 বিছিয়েছো বারোমাস জীবনের আয়ু

 কোন্ রঙে হেমন্তের মুছে দেয় কাশফুল

 বুকে নিয়ে সব ভুল ছুঁয়ে দি বায়ু।"

 এই 'বায়ু' উচ্চারণটি শ্বাসবায়ু যা জীবনের অমেয় উচ্ছ্বাসের গভীর ঘোষণা। কবি যে হেরে যেতে চান না, পরমায়ু রচনা করতে চান তা বারবার উঠে এসেছে কবিতাগুলিতে। পৃথিবীব্যাপী মারণ ভাইরাস কোভিডের সংক্রমণকালেও কবির উচ্চারণ:

"হলদি নদীর মোহনায়

প্রাণ ভরে শ্বাস নেবো অতন্ত্র ম্যানগ্রোভ পাহারায়।"

 সুতরাং এই কবিকে চিনে নিতে আমাদের অসুবিধা হয় না। তিনি জীবনের কবি। তিনি পৃথিবীর কবি। তিনি মানুষের কবি। তিনি সময়ের কবি।

 কবির জীবনের বেগ অনন্তগামি প্রশ্রয়ে অগ্রসর হয়েছে। অশ্রুজলে মন ধুয়ে স্নিগ্ধ হয়েছেন। নদীর সৌরভে মেতে উঠেছেন। শরীরে ক্ষতের গন্ধ বয়ে কাঞ্চনহেম হয়ে উঠেছেন। শুধু স্বপ্নবিলাসের আমন্ত্রণে কবির পথ-পরিক্রমা নয়, ইতিহাস ও শ্রমকে সঙ্গে নিয়েই ভবিষ্যৎকে সন্ধান করা। কবিতায় উল্লেখ করেছেন:

 "সকল রাস্তা জুড়ে দুঃখের লালিত ইতিহাস

 ব্যর্থ নয়, পূর্ণ হে, আনন্দের বিপুল নির্যাস।"


 দুঃখের মধ্যেই আনন্দ আছে। ব্যর্থতার মধ্যেই পূর্ণতার আভাস আছে। তাই 'কষ্ট-সুখের প্রদীপখানি জ্বেলে/ আমরা ভাসি সুরের রোমন্থনে।' আমাদের জীবনের সুর রোমন্থন এর মধ্য দিয়েই আমাদের পুনরুজ্জীবিত করবে। রোমান্টিক বর্ণনা ভেদ করেও কবির দার্শনিক চেতনা বারবার জিজ্ঞাসু হয়ে ওঠে। বারবার ফিরে আসে বিস্ময়। তখন তা কবিতাতেও প্রকাশ করেন:

 "ক্লান্তির রোদ শয্যা বিছায় ছায়া

 ফুলের নরম বাড়ায় পথিক স্নেহ।

 কেমন করে চিতার অগ্নি দহন

 সহ্য করে মৃত্যু মলিন দেহ?"

 কিন্তু বিস্ময়ের শেষ হয় না। বিবাগী মন পথ-পরিক্রমা করতে করতেই যোগ বিয়োগের অন্ত্যমিলে পৌঁছালে দেখতে পায়:

 "এই বাহানা চিরকালীন ভুবন জুড়ে

 এই যে রীতি যোগ-বিয়োগের অন্ত্যমিলে

 সমগ্রটি কে এঁকেছে শীতের ভোরে?

 যার ছায়াটি এমন মধুর আয়না জলে।"

 প্রকৃতির এই স্নিগ্ধতা তখন ঘনীভূত হয়ে আসে। স্বচ্ছ আয়নার মতো জলে তার ছায়া পড়ে। কবি একেই মধুর ছায়া বলেছেন।

     এক আত্মিক শূন্যতার ভেতর নিজস্ব ঈশ্বরের জন্য যে আকুতি সাজান কবি, যে আলোড়নে মুগ্ধ হন, তার অলৌকিক স্পর্শ স্পন্দন তোলে ঠিকই— কিন্তু কবির হৃদয় শাশ্বত এক শূন্যতার কাছেই আত্মসমর্পণ করে। চারিপাশে বারবার খুঁজে ফেরা তাঁর 'আমি'কে। জন্মান্তর পার হয়ে যায় তাঁর চেতনালোকের অভীপ্সাগুলি। ক্লান্তিহীন আয়োজনে তবু খামতি নেই। বেদনার বৈভব হয়ে যায় সব রোমান্সের কল্পলতাগুলিও। প্রতিটি চিত্রকল্পেই ভেসে আসে বেদনার স্বর। নিরবচ্ছিন্ন গতিময়তায় সময়ের স্বাক্ষরগুলি মিলিয়ে যেতে থাকে। হৃদয়ে বহু কথা জমা থাকলেও সব কথা বলা যায় না। কথা বলার সুযোগও হয় না। প্রতিকূলতায় টাল খান কবি। তাই কথা বলবার আকুতি:


"কিছু কথা বলেছি বাকি ছিল যাবতীয়

 সব কথা বলবার সুযোগ কি দিয়েছ অত?"

 কিন্তু সেই না-বলা নিয়েই হেঁটে গেছেন একলা কবি। একাকিত্ব মন বারংবার কবিকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। সময়ের ভাঙন এবং মানুষে মানুষে দূরত্ব বাড়তে বাড়তে এই একাকিত্বের চাপ তৈরি হয়েছে। তাই বারবার মনে হয়েছে: কথা আছে, তার প্রকাশ নেই। হৃদয় আছে, তার আনন্দ নেই। রাত্রি আছে, কিন্তু ঘুম নেই। জীবন আছে, কিন্তু জীবনের স্বপ্ন নেই। চাঁদ আছে, কিন্তু চাঁদের হাসি নেই। কবি লিখেছেন:

 "কি কথা যে বলতে গিয়ে নিমেষহারা

 ঢেউ যেভাবে পিছন ফিরে থমকে তাকায়।

 হয়নি বলা। হারিয়ে গেল একটি তারা।

 সেই থেকে মন একলা হল বিষণ্নতায়।"

 নিঃস্ব রাতের বাঁশিও সুরহীন। ঢেউয়ের আঘাতে তন্ত্রী ছেঁড়া বীণা। দিনরাত্রি অবহেলায় কেটে যায়। তাই স্মৃতিও উদাসীন। এইসময়কেই উপলব্ধির ভাষায় অনুবাদ করলেন:

"প্রেম ছিল কিনা কেউ তো বলেনি ভালোলাগা অভিমানী

রাতের দুয়ারে খিল দেওয়া ছিল জনহীন রাস্তায়

 ক্ষণিকের তরে ভুল পথে এসে ঘটে গেল রাহাজানি

লুট হয়ে গেছে জীবনের দাম স্মৃতিখানি সস্তায়।"

 এই অবক্ষয়যাপনের সময়কে অনুধাবন করেই কাব্যের মূল স্রোতে কবির অবগাহন। যেখানে বিষাদ আর নিঃস্ব জীবনের উত্তাপ ছড়িয়ে আছে। তবুও জীবন আছে,জীবনের ভাষা আছে–বলেই এখনো কাব্য-কবিতা লেখা হয়।


🍃

উদাসীন স্মৃতি : রাখহরি পাল, পাঠক, ৩৬-এ কলেজ রো, কলকাতা ৭০০০০৯, প্রচ্ছদ: দেবাশিস সাহা, মূল্য-১০০ টাকা। 


(ছবি:রাখহরি পাল) 


রাখহরি পাল




রাখহরি পাল



Post a Comment