যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

উপন্যাস - গোলমালপুরের গোলকধাঁধা - পর্ব - ২

সুব্রত মজুমদার - কালুয়া সর্দার দাঁত খিঁচিয়ে উঠে বলল,"ওসব তেরো ফেরো আমি বুঝি না, চিঠি গিয়েছে জবান গিয়েছে। কালুয়া সর্দারের জবানের দাম আছে। লুঠ আজই হ

 

webtostory

গোলমালপুরের গোলকধাঁধা

 পর্ব ২  

সুব্রত মজুমদার

               গাছের তলায় ঢিল হাতে  তর্জনগর্জ করতে থাকে ভজন। হনুমান একটু ঘোল খায় আর দাঁত দেখায়। এরকমই চলছিল। কিন্তু যেই ভজন হনুমানকে লক্ষ্য করে একখানা ঢিল ছুঁড়েছে অমনি গাছের তলায় হাজির গোলমালপুর থানার অফিসার-ইনচার্জ চপল চট্টরাজ। আর ভজনের ঢিল লেগে ঘোলের ঘটি সোজা বড়বাবুর মাথায় ।


                      বড়বাবু প্রথমটায় কিছু বুঝতে পারেননি, ভেবেছিলেন পাখি টাখিতে পটি করে দিয়েছে হয়তো, কিন্তু হনুমানের হাত হতে ঘোলের ঘটি পড়তে দেখে রাগে ফেটে পড়লেন । আর রাগবেনই নাই বা কেন, ঘটিখানা যে ঠং শব্দে বড়বাবুর টাঁক মাথার উপর আছড়ে পড়ল। 

বড়বাবু হনুমানের দিকে সক্রোধে চেয়ে চিৎকার করে উঠলেন, "আমার মাথায় ঘোল ঢালা হচ্ছে ! অ্যাই.. অ্যাই.. কার হনু তুই ? তোর মালিক কে ?"

হঠাৎই বড়বাবুর নজর পড়ল ভজনের উপর। ভজন বড়বাবুকে দেখে হাতের ঢিলখানা ফেলে ভালোমানুষের মত একগাল হেসে বলল, "আমার নয়..... কোথা হতে এসেছে কে জানে..... খুব বদমাশ... !"


            ভজনের কথায় ভড়কে উঠলেন বড়বাবু। ঘটিটা তুলে নিয়ে একটু এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেখে বললেন,"ইয়ির্কি পেয়েছ ! ঘটির গায়ে স্পষ্ট লেখা আছে ভ-জ-ন। এই ঘটি দিয়ে ঘটিধোলাই দেব তোমাকে।  আমি চপল চট্টরাজ, আমার ভয়ে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায়, আমাকে তুমি হনু দেখাচ্ছ ?"

থানা পুলিশ কোর্ট কাছারিকে খুবই ভয় পায় ভজন। তার মোটা মাথাতে এটুকুই এল যে পালিয়ে বাঁচতে হবে। সে যেভাবেই হোক। সে আর কতবড় পালোয়ান, বিশ্বের তাবড় তাবড় পালোয়ানেরা পুলিশ দেখে কাঁপে। পুলিশ বড়ই ভয়ানক জীব, বনের বাঘ এক গ্রাসে খেয়ে ফেলে কিন্তু পুলিশে ছুলে সে ভারি ভয়ানক ব্যাপার। মাথা গুলিয়ে যায় ভজনের সে লাগায় দৌড়।


         এরপরের ঘটনা ভজনের জানা নেই। তবে বিশ্বস্ত সূত্রে সে শুনেছে যে বড়বাবু ভীষণই চটে আছেন, ভজনকে পেলে ঘটিধোলাই না করে ছাড়বেন না। আর সেজন্যই ভজনের থানা পুলিশে এত ভয়।

ভজন তার রাগ দুঃখ বেদনা ইত্যাদি যত আবেগ ছিল সবকিছু তাকে তুলে রেখে রণে ভঙ্গ দিল। মদন পাল ঘর ঢুকতে ঢুকতে বলল, "যত্তসব অনাসৃষ্টি কাণ্ড, মুরোদ নেই তো চিলচিৎকার করিস কেনো ? চিলচিৎকারে আমার কোষ্ঠের গুষ্টির ষষ্ঠী পুজো হয়ে গেল।"


                                দুই

              গোলমালপুরের পাশেই ঘন বন। রাশি রাশি শাল মহুল অর্জুন সিরিষ আর বটের গাছ। গাছের গোঁড়া হতে উঠে এসেছে অজগর সাপের মতো মোটা মোটা লতা। জঙ্গলের জায়গায় জায়গায় দৃষ্টি চলে না। লতাপাতা আর বল্লরীতে গোটা জঙ্গল আচ্ছাদিত। জঙ্গলে জানোয়ার বলতে বুনো-শুয়োর, হেড়োল, শজারু আর খরগোশের মতো কিছু জন্তুজানোয়ার। তবে ইদানিং নাকি একটা বাঘের আগমন হয়েছে। বটার মতে বাঘ একটা নয় দুটো। পঞ্চু সর্দার বিরক্ত হয়ে বলে, "নিজের চোখে দেখেছিস ?"


-"না সর্দার, নিজের চোখে দেখিনি তবে শুনেছি।"

-"বড় শোননেওয়ালা এলেন রে.... নিজের চোখে না দেখে বিশ্বাস করবি না। এতদিন এই জঙ্গলে আছি কোনোদিন একটা বাঘের লেজও চোখে পড়ল না আবার দু'দুটো !"

এই পঞ্চু সর্দার হল গোলমালপুর সহ আশেপাশের অঞ্চলের ত্রাস। একটা বড়সড় ডাকাতের দল আছে তার। চুরির আগে ফোন করে গৃহকর্তাকে আগাম জানিয়ে দেয়। ওর বাবা কালুয়া সর্দার চিঠি পাঠাতে। কিন্তু চিঠির যুগ তো আর নেই, তাছাড়া চিঠি বড় হাঙ্গামার জিনিস।


             চিঠি নিয়ে বিস্তর সমস্যা। একে তো চিঠি ঠিক সময়ে পৌঁছয় না, তার উপর মরে যাওয়ার ভয় থাকে। চিঠি মরে গেলে তো কারোর অশৌচ হয় না তাই লোকের এবিষয়ে এত অসচেতনতা। আর এর ফল ভোগ করতে হয় কালুয়ার মতো আদর্শবাদী ডাকাতদের ।

এবার সেই প্রসঙ্গেই আসি। মাধবপুরের হরিমোহন সাঁতরা ডাকসাইটে জমিদার। অনেক বিষয়সম্পত্তি। দু'দুখানা মোটরগাড়ি, তিনতলা প্রাসাদের মতো ঘর। খোচর খবর আনল হরিমোহনবাবুর তিনতলায় শোয়ার ঘরে একটা আয়রনচেস্ট আছে। সেখানা সোনাদানা হীরে জহরতে ভর্তি।


কালুয়া সর্দার বলল, "খবর ঠিক তো রে ?"

-"পাক্কা খবর সর্দার। মিথ্যে হলে গর্দান নিও।" খোচর দু' কানে হাত দিয়ে বলল।

-"তাহলে চিঠি পাঠাই। কই মুন্সী কই ?"

-"আজ্ঞে সর্দার...." মুন্সী গজানন পাকড়াশি এসে দাঁড়ায়।

-"হরিমোহন সাঁতরাকে চিঠি লেখো, আগামী ১৩ই চৈত্র আমরা তার বাড়িতে পদধুলি দেব। অপ্যায়নের ব্যবস্থা যেন করে। "

গজানন পাকড়াশি তার বাঁধাধরা গতে একখানা চিঠি লিখে দিল। কালুয়ার দলেরই একজন নিয়ে চলল পোষ্টাপিসের বাক্সে ফেলে দেওয়ার জন্য। কালুয়া সর্দার খুশিতে টগবগ করতে লাগল। একটা ছোকরা মতো ডাকাতকে ডেকে বলল, "যা মদ নিয়ে আয়। বিলিতি। আজ পারটি হবে। "


             সারারাত চলল পার্টি। সকালে ক্লান্ত ডাকাতের দল মরার মতো ঘুমোতে লাগল। সবার স্বপ্নেই শুধু টাকা আর টাকা। আর সাতদিনের অপেক্ষা, তারপরেই হরিমোহনের টাকা আর সোনাদানা ভর্তি আয়রনচেস্টটা কালুয়া সর্দারের কব্জায়।

কিন্তু কথাতেই বলে 'দাতা দেয় তো বিধাতা দেয় না'। কালুয়া সর্দারের ভাগ্যেও সেরকমকিছুই ঘটল। একজন এসে খবর দিল যে হরিমোহনের কোনও হেলদোল নেই। ডাকাতের চিঠি পেয়ে ছোটাছুটি করবে না এমন লোক পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু হরিমোহনের কি হল ? 

কালুয়া সর্দার উদ্বিগ্ন হয়ে পায়চারি করতে লাগল। তার উদ্বেগ দেখে দলের সবারই উদ্বেগ বেড়ে গেল। মুন্সীর দিকে তাকিয়ে কালুয়া বলল, "চিঠিটা ঠিকঠাক লিখেছিলেন তো ? মানে ভাষাটা নরমগোছের হয়ে যায়নি তো ?"


                   গজানন পাকড়াশি ভুঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, "তোমার কাজ কি আমি এই প্রথম করছি সর্দার ? আমার লিখতে ভুল হয় না। বিভৎস রসে আমি ওস্তাদ। এমন লিখি না পড়ে যে কেউই থরহরি কম্পমান হবে। সেই গতেই লিখেছি। আমার মনে হয় ব্যাটা লিখতে পড়তে জানে না। চিঠি খানা পেয়েই চালের বাতাতে গুঁজে রেখেছে।" 

এরকমই হাজার রকমের গবেষণা হতে হতেই সেই রাত এল। তেরোই চৈত্র । গজানন বলল," আনলাকি থার্টিন ।"


-" কি টিন? "

-" আজ্ঞে আনলাকি থার্টিন। অশুভ তেরো। তেরোর গেরোও বলতে পারেন। " 

কালুয়া সর্দার দাঁত খিঁচিয়ে উঠে বলল,"ওসব তেরো ফেরো আমি বুঝি না, চিঠি গিয়েছে জবান গিয়েছে। কালুয়া সর্দারের জবানের দাম আছে। লুঠ আজই হবে।"



(চলবে )


Post a Comment