যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

পুলক মন্ডল এর অণু গল্প - প্রত‍্যাখ‍্যান

পুলক মন্ডল - প্রথমজনার পরনে রঙিন শার্ট-প্যান্ট, গুঁজে পরা, হাতে পেটমোটা চামড়ার অফিস ব্যাগ। ইন করা জামার ওপর দিয়ে মধ্য-উদরের স্বল্প স্ফীতবস্থা দৃশ্যমা

 

webtostory


প্রত‍্যাখ‍্যান

পুলক মন্ডল


প্রায় পাঁচ বছর বাদে দু’জনের দেখা। আচমকাই। এর জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলনা। দুজনেই কর্মস্থল ফেরত। একজনের সরকারি অফিস, অপরজনের স্কুল। দুজনেই বাড়ি ফেরতের ট্রেন ধরার অপেক্ষায় স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। একজন নামার পর অন্যজনকে আরও দুটি স্টেশন যেতে হয়। আজ কোথাও অবরোধ হয়েছে, তাই ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন, তাই স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষা, উৎকণ্ঠার। প্রথমজনার পরনে  রঙিন শার্ট-প্যান্ট, গুঁজে পরা, হাতে পেটমোটা চামড়ার অফিস ব্যাগ। ইন করা জামার ওপর দিয়ে মধ্য-উদরের স্বল্প স্ফীতবস্থা দৃশ্যমান, মাথায় চুল পাতলা হয়ে এসেছে এবং তাতে ইতস্তত শুভ্রতার আভা জানান দেয় সে মধ্য-যৌবনে প্রবেশ করেছে। দ্বিতীয়জনের চুলে এখনও পাক না ধরলেও তাঁর চোখমুখ জীবনের কিছু উত্থান-পতনের সাক্ষ্য দিচ্ছে। তাঁর পরনে হাল্কা রঙের শাড়ি, কাঁধে শান্তিনিকেতনি ব্যাগ। দুজনের চোখেই পাওয়ার চশমা। 


আচমকা মুখোমুখি হয়ে দুজনেই অস্বস্তিতে। নীরবতা ভেঙে দ্বিতীয়জনই প্রথম কথা বলে- ‘কেমন আছো? তোমার বাড়ির সবাই কেমন আছে?’ 

প্রথমজন সরাসরি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কথা ঘোরায়- ‘কি আশ্চর্য দেখ! আমরা একই দিকে ফিরি, অথচ এতগুলো বছরে আগে একবারও দেখা হলনা!

‘হয়ত আমাদের এভাবেই একদিন দেখা হওয়ার কথা ছিল’- মলিন হাসিতে প্রত্যুতর দেয় দ্বিতীয়জন। 

তারপর বলে, ‘বাদ দাও ওসব কথা। তোমার বউয়ের কথা বল। সন্তান?- জিজ্ঞাস্য দৃষ্টিতে তাকায় দ্বিতীয়জন। 


প্রথমজন ফের কথা ঘোরায়। বলে, ‘তুমি যে স্কুলে চাকরী পেয়েছ সেটা আমি জানি। তোমার খোঁজ রাখি আমি। কিন্তু তুমি এখনো বিয়ে করনি কেন?’ 

দ্বিতীয়জন একটু সময় নেয়। সে আদৌ প্রথমজনের কৌতূহলের উত্তর দিত কিনা তা জানতে পারার আগেই ট্রেনের শব্দ শোনা যায়। দুজনেই যে যার কামরায় ওঠার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে, এর মধ্যেই অতি দ্রুততার সঙ্গে দুজনের ফোন নাম্বার বিনিময় হয়। 


যেতে যেতে দ্বিতীয়জন ভাবে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। তাঁর সাথে প্রথমজনের ভালোবাসার সেইসব মুহূর্তগুলোর স্মৃতি তাঁর মনে ভিড় করে আসে। তারপর......তারপর তাঁর মনে পড়ে সেই রাতের কথা, প্রথমজনের পাঠানো শেষ মেসেজটার কথা, যেখানে সে লিখেছিল যে নিতান্তই বাধ্য হয়ে তাঁকে পরিবারের পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে করতে হচ্ছে যদিও সে কোনদিন ভুলতে পারবেনা দ্বিতীয়জনকে। আচমকা এই অভাবনীয় বার্তায় সে’রাতে দিকশূন্য হয়ে পড়েছিল দ্বিতীয়জন। কোন উত্তর দিতে তাঁর রুচিতে বেধেছিল। তারপর আচমকা ঝড়ে উথালপাতাল তাঁর জীবন এখন অনেককিছুই সইয়ে নিতে শিখিয়েছে।  


প্রথমজন ভাবে ভবিষ্যতের ভাবনা। তাঁর শেষ যৌবনের পর আসতে চলা প্রৌঢ়ত্ব কিম্বা আরও দুরের বার্ধক্যের কথা ঘোরাফেরা করতে থাকে চলন্ত ট্রেনে তাঁর ভাবনাগুলো জুড়ে।  

তারপর দুজনেই যে যার ঠিকানায় ফেরে।


অনেকরাত অবধি ঘুম নামেনা দুজনেরই চোখের পাতায়। দুজনেই মাঝেমধ্যে ফোনটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখে। তারপর...আরও গভীর রাতে প্রথমজনের মেসেজ আসে দ্বিতীয়জনের ফোনে- ‘আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে। আমার কোন সন্তান নেই। আচ্ছা! তোমার-আমার সম্পর্ক কি আবার আগের মতো হতে পারেনা?’ 


দ্বিতীয়জন মেসেজটা বেশ কয়েকবার পড়ে। পাঁচ বছর আগের মতো এবারও কোন উত্তর দেয়না। তবে এবারে সে আগেরবারের মতো দিকশূন্য হয়ে পড়েনা। প্রথমে মেসেজটা ডিলিট করে, তারপর প্রথমজনের ফোন নাম্বারটা চিরকালের মতো ব্লক করে দেয়।       

-------------------------------------------------------

কলকাতা বইমেলায়(২০২২) প্রকাশিত পুলক মন্ডলের 'যাও পাখি' গল্পের বই থেকে।

Post a Comment