যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । লিঙ্ক - https://webtostory.com/to-post-the-text/

বাঘবাবাজী ঝোপের ভেতরে গা এলিয়ে শুয়ে পড়েছে ।

সুব্রত_মজুমদার - বাঘবাবাজী ঝোপের ভেতরে গা এলিয়ে শুয়ে পড়েছে । ঘুমও এসেছে। অন্যদিকে কালুয়া সর্দার ভয়ে ভয়ে রামনাম জপ করছে। হঠাৎ করেই জপ বন্ধ করে দ

webtostory




 গোলমালপুরের_গোলকধাঁধা (পর্ব ৩ )

সুব্রত_মজুমদার


                      রাত গভীর হতেই লুঠেরার দল চলল হরিমোহনের ঘরের উদ্দেশ্যে ।  তাদের এক হাতে বন্দুক আর অন্যহাতে চারবেটারি টর্চ। টর্চের আলো যেখানে পড়ে সেখানা দিনের মতো ঊজ্জ্বল হয়ে যায়। হা-রে-রে-রে  শব্দ করে হরিমোহনের বাড়িতে ঢুকে পড়ল ডাকাতের দল। ডাকাত দেখে তো হরিমোহন বেজায় অবাক। সে জানে কালুসর্দারের দল চিঠি না দিয়ে আসে না। কিন্তু  হঠাৎ বিনাপত্রে কালুর দল এসে হাজির হল কেন ?


         কথাটা পাড়তেই কালুয়া সর্দার বন্দুক তুলে শূন্যে গুলি চালায়।  "আমার চোখের সামনে চিঠি লেখা হয়েছে। চিঠি পাননি মানে ? ইয়ার্কি হচ্ছে ?"


হরিমোহন যতই বোঝাবার চেষ্টা করে কালুয়া সর্দার ততই রেগে যায়। আর ততই শূন্যে গুলি ছুড়তে থাকে। দেখাদেখি অন্যান্য ডাকাতেরাও আস্ফালন করতে থাকে। কিন্তু তখনই ঘটল সেই বিপত্তি। কালুয়া সর্দারের গুলি গিয়ে লাগল আমগাছের একটা শুকনো ডালে। ডালটা ভেঙ্গে পড়ল গাছে ঘুমিয়ে থাকা এলাকার সবচেয়ে ত্যাঁদড় হনুমানটার মাথায়।


                 সারাদিন গোটাপাড়া জ্বালিয়ে রাতের বেলা আমগাছের ডালের উপর আরাম করে শুয়ে ঘুমোচ্ছিল হনুমানটা। হঠাৎই মাথার উপর শুকনো ডালটা পড়ায় ভীষণই চটে গেল সেটা। উঁকি মেরে দেখল কতগুলো লোক উঠোনে দাঁড়িয়ে বাঁদরামো করছে। আরে ভাই বাঁদরামো তো তার ভাই বেরাদরির কর্ম, তাহলে কি মানুষেরা তাদের পেশাতেও হাত বাড়াচ্ছে ? আর চুপ করে বসে থাকলে হবে না।


               হনুমানটা প্রবল প্রতিহিংসা নিয়ে উঠে বসল। তারপর এডাল ওডাল ঘুরতে লাগল আর আম ছিঁড়ে ঢিল মারতে লাগল। হঠাৎই এমন গেরিলা আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল কালুয়া সর্দারের দল। প্রায় প্রত্যেকেই কমবেশি আহত হল। সর্দারের অবস্থা তো আরও খারাপ। হঠাৎ করে হাঁই তুলতে যেতেই একটা পেল্লাই আম মুখের ভেতর সেঁধিয়ে গেল। একদম হাঁ বন্ধ। আরেকটা আম এসে পড়ল কালুয়া সর্দারের মাথায়। কালুয়া সর্দার অজ্ঞান। দলের অন্য ডাকাতেরা তাকে তুলে নিয়ে ডেরায় ফিরে গেল।


      জ্ঞান ফিরলেও মুখ হতে আমখানা আর বের হয়নি।  ফলে কালুয়া সর্দারের ছেলে পঞ্চু হল দলের সর্দার। সে সর্দার হয়েই চিঠিপ্রথা তুলে দেয়। গজানন পাকড়াশিরও চাকরি যায়। 

পঞ্চু এখন একখানা অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল কিনেছে। আইআইটি পালানো এক ছাত্রের কাছে মোবাইল চালানো শিখে  হোয়াটস অ্যাপ মারফত ম্যাসেজ পাঠায় কালুয়া সর্দার। দুটো নীল টিক এলে তবেই ডাকাতিতে বের হয় পঞ্চু। তবে হ্যাঁ, সেই পোস্টমাষ্টারের উপর ডাকাত বিভাগীয় তদন্ত চলছে। মাঝে মাঝেই ওই পোস্ট মাস্টারকে উঠিয়ে এনে জেরা করা হয়। আর চলে থার্ড ডিগ্রী।


-"তুমি কষ্ট পেয়ো না বাবা, ওই পোস্টমাষ্টারের পেট হতে সব কথা বের করে আনবো। একদিন না একদিন চিঠির হদিস মিলবেই। তবে তুমি সাবধানে থেকো, জঙ্গলে নাকি বাঘ বেরিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি না। তবে যদি সত্যি হয় ! "


               কালুয়া সর্দার হাতমুখ নেড়ে কিছু বলার চেষ্টা কিন্তু শব্দ বের হয়ে আসে না। ছেলের দিকে কটমট করে তাকায়। যেন বলতে চায় -" হতভাগা, মুখে নাহয় আম ঢুকে আছে তা বলে কি হাত পা গুলোও পড়ে গেছে নাকি ? ওরকম চারচারটে বাঘ আমি দু'হাতে পিষে মারতে পারি।"


                     ঠিক এসময়ই বাঘের গর্জন শোনা যায়। পঞ্চু সর্দার চট্ করে একটা বড়সড় গাছের উপর চড়ে বসে। বাকি ডাকাতেরাও তাকে অনুসরণ করে। বাঘের আওয়াজ শুনেই কালুয়া সর্দার ধুতি ভিজিয়ে ফেলেছিল। এমন বিপদের দিনে সবাইকে কেটে পড়তে দেখে অদৃষ্টকে গালাগালি করতে করতে বড়সড় একটা ঝোপ দেখে লুকিয়ে পড়ল সে।


কিন্তু বিপদ কি পিছু ছাড়ে ! বাঘবাবাজী একটা পেল্লাই হরিণ সাবাড় করে ওই ঝোপেই ঢুকেছে বিশ্রাম নিতে। ঝোপের ভেতর এখন দুটো প্রাণী, কালুয়া সর্দার আর বাঘ। একে অপরের দিকে পিঠ করে বসে আছে। কেউ কাউকে দেখেনি। দুজনার নাকি সর্দি। কেউ কারোর গন্ধই পাচ্ছে না।


               বাঘবাবাজী ঝোপের ভেতরে গা এলিয়ে শুয়ে পড়েছে । ঘুমও এসেছে। অন্যদিকে কালুয়া সর্দার ভয়ে ভয়ে রামনাম জপ করছে। হঠাৎ করেই  জপ বন্ধ করে দিল। কারন মনে পড়ে গেল রাম নামে ভুত পালায় বটে কিন্তু বাঘের তো তাতে কিছু যায় আসে না।


                  বাঘটা আছে না পালাল সেটা দেখার জন্য ঝোপ হতে উঁকি মারল সর্দার। দেখল সামনে যতদূর চোখ যায় বাঘের নামগন্ধও নেই। এবার পেছন দিকে হেলান দিয়ে বসতেই পিঠে একটা নরম নরম লোমশ কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করল। জিনিসটা যে কি জানতে পেছন দিকে হাত বাড়িয়ে জিনিসটা টিপে দেখল। একটা মৃদু গরগর  আওয়াজ এল। এবার কৌতুহলী হয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল  । কিন্তু যা দেখল তা না দেখাই বোধহয় উচিত ছিল। দেখল একটা হলুদ ডোরাকাটা লোমশ দেহ। বাঘ !


               তড়াক্ করে লাফিয়ে ঝোপ হতে বেরিয়ে এল কালুয়া সর্দার। বাঘও ভয়ে অস্থির। সেও লাগিয়েছে প্রাণপণ দৌড়। বাঘ বিদায় হতেই গাছ হতে নেমে এল সবাই। সবার মুখেই স্বস্তির ছাপ। কেবল কালুয়া সর্দার বাদে। সে পঞ্চুর চুলের মুঠি ধরে বলল, "ডাকাত হয়েছ ! আমড়ার আঁটি হয়েছ ! বাপকে বাঘের মুখে ফেলে দিয়ে যে ছেলে পালায় সে কাপুরুষ ছাড়া আর কিছুই নয়। লোকে জানলে থুতু দেবে।"


               পঞ্চুর মুখে কথা নেই। সে যে কতটা সাহসী তা গোটা দলের সামনে প্রকাশিত হয়ে গেছে। এ বড় লজ্জার। কিন্তু হঠাৎই একটা ব্যাপার মাথায় খেলে গেল। সে কালুয়া সর্দার কে জড়িয়ে ধরে বলল,"চিকিৎসা বাবা চিকিৎসা। তোমার মুখে আবার কথা ফুটবে বলেই তো এই ব্যবস্থা। ভয় পাবে বলে দলের কাউকেই একথা বলিনি। তবে এটা ঠিক যে আমার দল আমি ভেঁড়া পুষছি। আমি নাহয় নাটক করেছি কিন্তু...."


              দলের বাকিরা একে একে তাদের বক্তব্য পেশ করল। তারা নাকি পঞ্চু সর্দারের মনোভাব আগেভাগেই বুঝতে পেরেছিল।  কালুয়া সর্দার তার বীরপুত্রকে জড়িয়ে ধরে বলল, "ব্যাটা তুই আমার গর্ব। না বুঝে তোকে ভালোমন্দ অনেক কিছু বলেছি, ক্ষমা করে দে বাপ ! "


               পিতাপুত্রের এমন মধুর মিলন দেখবার মতো।  বীরপুত্রকে বুকে জড়িয়ে গর্বিত পিতার সে কি কান্না। পিতাপুত্রের চোখের জলে বনস্থলি ভেসে যাওয়ার উপক্রম হল। ঘটনার গতিপ্রকৃতি দেখে বাকি ডাকাতেরাও কাঁদতে লাগল। যেন মহাভারতের যুদ্ধের পর কুরুকুলনারীরা কুরুক্ষেত্রে এসেছে।


                                   তিন


               গোলমালপুর পোস্ট অফিসের পোস্টমাষ্টার গোপাল পাল অতি সজ্জন মানুষ। সজ্জন হলেও সাহসের কমতি নেই। একমাত্র গিন্নী ছাড়া দুনিয়ার আর কাউকে তিনি ভয় পান না। বাড়িতেই পোস্ট অফিস। সকাল হতেই সাইকেলে চড়ে রাণার আসে। সাইকেলের সামনে চটের বস্তা গালা দিয়ে সিল করা। গোপালবাবু সিল কেটে চিঠিপত্র রিসিভ করে নেন। ডাকঘরে আসা চিঠিপত্র স্ট্যাম্প মেরে থলেয় ভরে রাণারের হাতে দেন।


           এরপর আসে ডাকপিওন। সে বিভিন্ন পোস্টবক্স হতে চিঠি সংগ্রহ করে পোস্ট অফিসে জমা করে, আর রাণারের আনা চিঠিগুলো নিয়ে যায় বিলির জন্য। ডাকপিওন চলে গেলে গোপাল পালের আর কোনও কাজ নেই। সে তখন পোস্ট অফিসের সামনে খালিগায়ে একটা চেয়ারে বসে বসে নভেল পড়ে।


            এরকমই দিন কাটছিল। কিন্তু হঠাৎই বিনা মেঘে বাজপড়ার মতো হাজির হল পঞ্চু সর্দার। সঙ্গে দুজন ডাকাত। কথা নেই বার্তা নেই টুঁটি ধরে গোপাল পালকে ফুট দুয়েক উপরে ঝুলিয়ে দিল। এরপর বাজপড়া কণ্ঠে বলল, "আমার বাবার চিঠি কই  ? হরিমোহনের ঘরে পৌঁছাল না কেন ?"




(চলবে) 

Post a Comment