উপন্যাস

গুপ্তজীবন – ২ – সুদীপ ঘোষাল

কামলীলায় পুরুষদের প্রাধান্য আর বেশিদিন টিকিয়ে রাখা যাবে না। নারী তলে আর পুরুষ উপরে এই প্রথার অবসান হতে চলেছে। অবশ্য অনেক পুরুষ নারীকে উপরে স্থান দিয়ে বেশি তৃপ্ত হয়।যাক এবার আলোচনা করব পুরোনো প্রথা নিয়ে। কাম পরিপূর্ণ হয় ভালোবাসা থাকলে। তা না হলে যান্ত্রিক নিয়মে পরিণত হয়।

বিদ্যাপতির মাথুরের একটি বহু পরিচিত পদ, এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।  পরপুরুষের প্রতি বিরহের বোধ আসলে সুখের। সুখ এবং দুঃখ দুই ই। অর্থাৎ প্রেমের তীব্র না পাওয়াও একরকম পরকীয়ার সন্ধান দেয়, এক গভীর আত্মকেন্দ্রিকতা মুক্তি পায়, আহ্লাদ হয় নতুন কামলীলায়, অনুভবনের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কারের।

পূর্বের মিলনস্মৃতি হেরে যায় নবকামরূপ নদীর কাছে।পুরুষর ও নারি নিজেদের শারীরবৃত্তীয়  হরমোনের কারণে, সুখ বা দুঃখে উপনীত হয় । কামলীলা শুধু সুখ নয়, প্রচন্ড দুঃখেরও মূল কারণ।  উৎস হল এই বিরহের পদটি।রাধা বললেন, “ঝম্পি ঘন গরজন্তি সন্তত, ভুবন বরিখন্তিয়া, কান্ত পাহুন কাম দারুণ, সঘন খরশর হন্তিয়া।”

প্রকৃতি রাজ্যে এই মিলনের উৎসব, অথচ আমার গৃহ শূন্য। রাধা তখন নিজের জন্য এক নতুন স্বপ্নলোক বুনলেন। মনে পড়বে আলব্যর কামু র সেই বিবাহিত মহিলার নিশাচরবৃত্তি। এ হেন অ্যাডাল্টেরি ১৫,১৬ শতকের মহিলাকে সাজে কিনা তা ভাবার অতীত। কিন্তু বিদ্যাপতি রাধাকে বিন্দাস একক আত্মরতিতে মগ্ন করে সুখানুভবে ব্রতী দেখালেন।

হয়ত কবির অন্তরে কবির সচেতন দৃষ্টি তখনো সক্রিয়তা শেখেনি। এ হল সেই অর্ধমাগধী, যা তোমার আছে আর যা নেই দুইই। ভাষার বা শব্দের সিগনিফায়ার ও সিগনিফায়েড দুইই কবির অপুষ্ট অবচেতনের সংকেতজনিত। এ ভাষা তাই আজও পারিনি আমরা ডিকোড করতে। ফ্রয়েডের পিতৃতান্ত্রিক ভুল দিয়ে একে পড়া সমীচীন নয়।

কারণ, যিনি কলম ধরেন, তিনি এখানে একমাত্র ভাবয়িতা নন। মনের অনেক আয়না। সর্বোপরি, প্রেয়সীর অসহায় অস্বীকার, সামাজিক নিষেধ, নিজেকে নিষেধ, এ সবই এখানে বহুস্তরীয় মননশীলতার গতিস্পন্দ তৈরি করেছে। তাই যাকে রাধা বলে ডাকা হল, সে আসলে এ সবের মিলিত একটি বাসনাপূরণের ডিল্ডো। সেক্স টয়।

সেমিওটিক বিশ্বে হয়ত এই আমাদের প্রাচীনতম সাংকেতিক পুনর্বাসন। পৃথিবীর সেরা নিষিদ্ধ বস্তু বা ট্যাবু। তাই পলিঅ্যান্ড্রিকে ১৭ ও ১৮ শতকে গৌড়ীয় দর্শনের সাহায্য নিয়ে আমরা বৈধ করে নিলাম।

আর নষ্ট করলাম আমাদের ইমপারফেক্ট্ যৌনতার প্রকৃত প্রমাণ। দস্তখত মিটিয়ে দিলাম চৈতন্যচরিতামৃত দিয়ে। চতুর্থ পরিচ্ছেদ আদিলীলা ও ৮ম মধ্যলীলায় বারংবার বলতে হল, আসলে রাধা হলেন কৃষ্ণের একটি শক্তি। হ্লাদিনীশক্তি, যা ত্রি শক্তির মূল নিয়ন্ত্রী। তিনি পরা শক্তির অন্যতমা, স্বকীয়া। পরকীয়া নন।

ইন্দ্রের সঙ্গে সরস্বতীর সম্পর্ক যেমন ঘনিষ্ঠ তেমনি ঘনিষ্ঠ মরুৎ ও অশ্বিনীদ্বয়ের সঙ্গে। সরস্বতী কখনো ইন্দ্রের পত্নী আবার কখনো শত্রু, কখনোবা ইন্দ্রের চিকিৎসক। ঋগ্বেদেই আবার যে বাক-দেবীর সাথে ব্রহ্মার যৌনসংসর্গ দেখানো হয়েছে, সে বাক-দেবী সরস্বতী ভিন্ন আর কেউ নন।ইন্দ্র তার গুরুপত্নীকে গুরুর রূপ ধরে ধর্ষণ করায় তার দেহে সহস্র যোনীর চিহ্ন প্রকট হয়ে ফুটে ওঠে ঋষির অভিশাপে।

পক্ষান্তরে, কোন কোন পুরাণকারের মতে ব্রহ্মা স্বীয় কন্যা সরস্বতীর সাথে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হন। কলকাতার জাদুঘরে রক্ষিত এক সুপ্রাচীন মূর্তিতে এর পক্ষে প্রমাণ মিলে, যেখানে দেখা যায় ব্রহ্মার বামজানুর উপর সরস্বতী বসে আছেন এবং তাঁর এক হাত ব্রহ্মার কাঁধে জড়িয়ে বেশ ঘনিষ্ঠ।

নেপালে চতুর্দশ শতকের পাওয়া এক শিলালিপিতে আছে দেবী বন্দনা – “সারদা তুমি মাতৃরূপী, তুমি কামমূর্তি”! সারদা সরস্বতীরই নাম। এতো দেবতার সান্নিধ্য পেয়েছেন বলেই হয়তো মকবুল ফিদা হুসেনের আঁকা সরস্বতীর গায়ে কোন আব্রু নেই। অজস্র যৌনতা বা কামজ কাহিনি ছড়িয়ে আছে ভারতীয় পুরাণের পরতে পরতে। যার কারণে মেঘদূত, গীতগোবিন্দ সহ প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় কাব্যেও দেহজ রূপ বর্ণনার ছড়াছড়ি। চোখ-নাক-ঠোঁট-মুখ ইত্যাদি কম ধর্তব্য ছিল বিধায় পটল-বাঁশি-কমলার কোয়া-পানপাতা ইত্যাদি রূপকের তেমন পাত্তা দেখা যায় না।

বরং পীনোন্নতবক্ষ-স্বর্ণাভ স্তনাগ্র-কদলীসদৃশউরু-বর্তুলাকার নিতম্ব ইত্যাদি রূপকের সেখানে জয়জয়কার। আর তাতেই যেন রূপের প্রকাশ আরো খোলতাই হয়েছে। আবার একইসাথে কুচ-জঘন-উরু এসব রীতিমত ভক্তিস্নাত হয়ে গেছে।তবে একথাও সত্য যে, প্রাচীন অনেক শব্দের ব্যবহার আজকাল সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে প্রয়োগ হয় বিধায় প্রাচীন শাস্ত্রপাঠে কোন কোন শব্দ পাঠকের মনে দ্বিধার জন্ম দিতে পারে। যেমন, প্রাচীন তন্ত্রমতে শিব দুর্গাকে বলছেন, “কুলবেশ্যা, মহাবেশ্যা, ব্রহ্মবেশ্যা প্রভৃতির মধ্যে তুমিই শ্রেষ্ঠ বেশ্যা। যোনিপীঠ সাধনায় তুমি প্রসন্না ও তুষ্টা হয়ে সাধকের সকল কামনা, বাসনা, অভীষ্ট সিদ্ধ করে থাকে।

 আদি নাম ছিল দেবর্ষি উশনা। গোড়ায় তিনি দেবদ্বেষী ছিলেন না। একবার দেবগণের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবার জন্য অসুররা দেবর্ষি উশনার মা ভূগুপত্নীর আশ্রমে আশ্রয় নিয়েছিল। দেবতারা সেখানে প্রবেশ করতে পারেনি। বিষ্ণু তখন তার চক্র দিয়ে ভৃগুপত্নীর শিরচ্ছেদন করেন। এই ঘটনার পর দেবর্ষি উশনা দেবদ্বেষী হন। একদিন তিনি যোগবলে কুবেরকে বদ্ধ করে তার সমস্ত ধন অপহরণ করেন। কুবের মহাদেবের কাছে অভিযোগ করে। মহাদেব কুবেরের অভিযোগ শুনে শূল হস্তে উশনাকে মারতে আসেন।

উশনা মহাদেবের শূলের ডগায় আশ্রয় নেন। মহাদেব উশনাকে ধরে মুখে পুরে গ্রাস করে ফেলেন। তার ফলে উশনা মহাদেবের পেটের ভিতর থেকে যায়। মহাদেব মহাহদের জলের মধ্যে দশ কোটি বৎসর তপস্যা করেন। পেটের ভিতর থাকার দরুন, এই তপস্যার ফল উশনাতেও অর্শায়। মহাদেব জল থেকে উঠলে, উশনা মহাদেবের পেট থেকে বেরিয়ে আসার জন্ত বারম্বার প্রার্থনা করে।

মহাদেব বলে তুমি আমার শিশ্নমূখ দিয়ে নির্গত হও। মহাদেবের শিশ্নমুখ দিয়ে নির্গত হওয়ার দরুণ, তার নাম হয় শুক্র। মহাদেব শুক্রকে দেখে আবার শূল দিয়ে তাকে মারতে যান। এমন সময় ভগবতী বলেন শুক্র আমার পুত্র। তোমার পেট থেকে যে নির্গত হয়েছে, তাকে তুমি মারতে পার না।

কিন্তু কাহিনীটার শেষ এখানে নয়। হরিবংশ অনুযায়ী বিষ্ণু শুক্রের মার শিরচ্ছেদ করেছিলেন বলে শুক্রের পিতা মহর্ষি ভৃগু ক্রুদ্ধ হয়ে বিষ্ণুকে অভিশাপ দেন যে স্ত্রীবধ-হেতু পাপের জন্য বিষ্ণুকে সাতবার মনুষ্যলোকে জন্মগ্রহণ করতে হবে। তারপর তিনি মন্ত্রবলে শুক্রজননীকে আবার জীবিত করে তোলেন। এই ঘটনার পর দেবতারা ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। সবচেয়ে বেশী ভয় পান ইন্দ্র।

কেননা মহাদেবের আদেশে শুক্র ব্রহ্মচারী হয়ে তপস্যা করেছিলেন এক প্রার্থিত বর পাবার জন্ত ! ইন্দ্র শুক্রের এই তপস্যা ভঙ্গ করবার জন্য নিজ কন্যা জয়ন্তীকে শুক্রের কাছে পাঠিয়ে দেন। দীর্ঘকাল তপস্যার পর শুক্র তার ইন্সিত বর পান। এদিকে জয়ন্তীর ইচ্ছানুসেের শুক্র অদৃশ্য হয়ে থেকে জয়ন্তীকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করেন। সেই সুযোগে বৃহস্পতি শুক্রের রূপ ধরে অসুরদের মধ্যে আসেন ও অসুররা তাকে প্রকৃত শুক্র ভেবে গুরু হিসাবে সংবৰ্দ্ধনা করেন। অদৃশ্য অবস্থায় থাকাকালীন শুক্রের ঔরসে ও জয়ন্তীর গর্ভে দেবযানী নামে এক কন্যা হয়।

শুক্র যখন ফিরে এল, অসুররা তখন তাকে চিনতে না পেরে তাড়িয়ে দেয়। তারপর যখন তারা বৃহস্পতির ছলনা বুঝতে পারল, তখন তারা শুক্রকে গ্রহণ করে তার কোপ নিবৃত্ত করল।দেবতাদের কামচরিত্র খুব দূর্বল ও ছলনাময়ী ছিল। অসুর বা মানুষ কুমুক হবে এটা স্বভাবিক কিন্তু দেবতাদের লুকিয়ে চুরিয়ে পরস্ত্রী বা কন্যার সঙ্গে যৌনমিলনকে আপনি কোন চোখে দেখবেন। তাহলে মানুষ লুকিয়ে চুরিয়ে মিলন করার শিক্ষা কার কাছে পেল। বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়ায় ভক্তির মাঝে।

এইসব তথ্য পড়ে মনে হয় এখনকার নীলছবি নেহাতই ধার করা প্রতিচ্ছবি। আসলে বহুকাল আগে থেকেই যৌনশাস্ত্র পরিপুষ্ট। এখনকার ছেলেমেয়েরা ব্লুফিল্ম মোবাইলে বা কম্পিউটারে সার্চ করে দেখে নিজেদের আধুনিক প্রমাণ করতে চাইলেও আসলে এগুলি পৌরাণিক গল্প থেকে ধার করা বিদ্যা। যৌনাঙ্গ চোষণ,মর্দন,লেহন সবই সেকেলে বিদ্যা। নতুন কিছু আবিষ্কার করতে গেলে শুধু কামুক হলে হবে না, যথেষ্ট মগজেরও প্রয়োজন। আগামী কামলীলার আধুনিকিকরণ তাদের উপরই ন্যস্ত থাকুক।

আসুন বদলাই – শম্পা সাহা

নারীকে অধিকার দিতে হবে না, সমানাধিকার ও নয়। এ আপনাদের পকেটে রাখা মানিব্যাগ নয়, যে পকেট থেকে বার করে তার থেকে দয়া করে দুএকটা খুচরো দেবেন। আমাদের অধিকার আমরা বুঝে নিতে পারবো। শুধু অকারণে ভয় পেয়ে আমাদের রাস্তায় পাথর, কাঁচ ছড়াবেন  না।
কি? ভয় পাচ্ছেন না! তাহলে এতো প্রতিবাদ কেন? কেন এতো নাকি কান্না, যে পুরুষ রা অত্যাচারিত অথচ তাদের জন্য কোনো আইন নেই! কি মনে হয়, যারা আইন প্রণয়ন করছেন তারা সবাই নারী, তাই তারা এ ধরনের একপেশে আইন রায় দিচ্ছেন অথবা তাদের স্ত্রী দের দ্বারা অনৈতিক ভাবে প্রভাবিত হয়ে এই রায় দিচ্ছেন?
অনেকে বলেছেন যে যৌন সুখ নাকি স্ত্রী পুরুষ সকলেই সমান ভাবে উপভোগ করেন, তাই যদি হয় তাহলে বৈবাহিক ধর্ষণ কথাটি এসেছে কেন? নাকি ওটাও মিথ্যা মন গড়া কথা।
অনেকেই বলেছেন স্ত্রী দ্বারা যৌন ভাবে পুরুষ রাও শোষিত হন! হতে পারে, কারণ ” এভরিথিং ইজ পসিবল ইন দিস হোরাশিও! ” তবে কজন পুরুষ মানুষ বিয়ের পর স্ত্রীর যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ছিন্নভিন্ন যৌনাঙ্গ নিয়ে, একটু পরিসংখ্যান দিন।
অনেকেই বলেন, মেয়েদের মেয়েরা যদি অর্থ নৈতিক ভাবে স্বাধীন হয়, তবে সে সন্তানের দায়িত্ব নিজেই নিতে পারবে, তার জন্য স্বামীর কাছে খোরপোষ চাইতে হবে না। ঠিক কথা? দারুন কথা। স্বামী ইচ্ছে মত ভোগ করবে, তার পর ইচ্ছে হলে ছুঁড়ে ফেলে দেবে সন্তান সহ। তখন সে মহিলা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ব্যবহার করে নিজের এবং সন্তানের দায় বহন করবে। আর পুরুষ গায়ে হাওয়া লাগিয়ে, ঝাড়া হাত পা হয়ে ঘুরে বেড়াবে! কারণ মেয়েটি স্বাধীন সব দিক দিয়ে।
আর সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা বা টান অনেক বেশি সে কে না জানে। তাই মা হয়ে সন্তান কে ছুঁড়ে যে ফেলে দেবে না, সে তো বলাই বাহুল্য।
সব শেষে একটা কথা। অনেকেই বলেন, মেয়েরা যদি অত ই সমানাধিকার চায় তাহলে চাকরি করা মেয়েরা কেন বেকার ছেলে কে বিয়ে করে না। কে বলেছে করে না বা করবে না। অনেক মেয়েই আছে বেকার ছেলে বিয়ে করে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে ছেলেটি কি একজন হাউস ওয়াইফের মত সব সাংসারিক দায়িত্ব নেয়? সন্তান ধারণ না হয় বাদ ই দিলাম, কারণ সেক্ষেত্রে তার কিছু করার নেই, কিন্তু একজন গৃহবধূর মত সে কি খুশি মনে সব করে স্ত্রী কে শুধু চাকরির জন্য ছেড়ে দেবে?
আমার অভিজ্ঞতা কিন্তু উল্টো কথা বলে। বেকার ছেলেটি পায়ে পা তুলে বসে থাকে, হীনমন্যতায় ভোগে, প্রতি মুহূর্তে স্ত্রী কে নানাভাবে অপদস্থ করে, যেন স্ত্রীর কারণেই সে বেকার এবং তার সঙ্গে সঙ্গে দোষারোপ তো আছেই।
পরিণতি, হয় ডিভোর্স নয় তো চাকুরিরতা মেয়েটি সংসারের স্বার্থে সব মেনে নেয়। এ কিন্তু আমার নিজের চোখে দেখা পরিণতি।
তাই আমাদের ভাবতে হবে যে সমস্যা কিন্তু গোড়ায়। ছেলে মেয়ে নয় আসুন আমরা মানুষ তৈরি করি, তাদের বোঝাই শারীরিক গঠন বাদে ছেলে মেয়ে তে কোনো বিভেদ নেই, তা হলে হয়তো একশো বছর বাদে পরিস্থিতি বদলালেও বদলাতে পারে।

কবিতার রূপকল্প : পর্ব ১৬ – সৌম্য ঘোষ

ধারাবাহিক প্রবন্ধ :
কবিতার রূপকল্প : পর্ব ১৬
 বিশুদ্ধ কবিতার আত্মমগ্ন ধারা       
            
  
                    প্রগতি আন্দোলন দ্বারা প্রাণিত সমাজসচেতন কবিতার ধারার পাশাপাশি প্রভাবিত হয়েছিল ” বিশুদ্ধ কবিতার আত্মমগ্ন ধারা” ।  এই ধারার কবিরা বুদ্ধদেব বসুর কলাকৈবল্যবাদকে গ্রহণ করেছিলেন । তাঁরা বুদ্ধদেব বসুকে তাঁদের ‘নেতা’ মেনে নিয়েছিলেন।  এঁদের মধ্যে আছেন —- সুনীল চন্দ্র সরকার , অশোক বিজয় রাহা , কামাক্ষী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, বিশ্ব বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুণ কুমার সরকার, নরেশ গুহ, রমেন্দ্র কুমার আচার্য চৌধুরী, জগন্নাথ চক্রবর্তী, অরুণ ভট্টাচার্য, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, আলোক সরকার প্রভৃতি।
                   কবি সুনীল চন্দ্র সরকার (১৯০৭-১৯৬১) মগ্ন মুগ্ধ কবি । তিনি আহ্বান করেন,
“আয় চলে এই জামতলায়
 দূর থেকে দ্যাখ বাড়িটা তোর ।”
দেশ ভাগ এবং তর্জনীর উদ্বাস্তু বন্যার কথা তিনি ভুলতে পারেন না ।
“ছেড়ে গ্রাম জমি জোত
 আজ এই শ্রেণী স্রোত
 হয় পৃথিবীর ।”
                 কবি অশোক বিজয় রাহা (১৯১০–৯০)
ছিলেন ‘রূপদক্ষ কবি’ । তাঁর কবিতায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য সৌন্দর্য চমৎকারভাবে রূপায়িত হয়েছে । এই দেশ যেন রূপকথার দেশ, সেখানে নিসর্গ আর প্রেমের অনুভূতি মিশিয়ে তাঁর কবিতার বই “উড়োচিঠি ঝাঁক”।
             কবি কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (১৯১৭–৭৬) এই সময়ের একজন সুপরিচিত কবি ছিলেন ।
“মৈনাক, সৈনিক হক
 ওঠো কথা কও।
 দূর করো মন্থর মন্থরা
  মেদময় স্ফীত বৃদ্ধ জরা ।”
            কবি বিশ্ব বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯১৬–) আজ প্রায় বিস্মৃত । তাঁর কাব্যগ্রন্থ “আকাশিনী ও  মৃন্ময়ী” ।
           বিশুদ্ধ কবিতার ধারা র তিনজন খুব উল্লেখযোগ্য কবি হলেন , কবি অরুণ কুমার সরকার (১৯২২–৮০) , কবি নরেশ গুহ (১৯২৪–২০০৯),কবি রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরী ( ১৯২২–২০০৯ ) । অরুণ কুমার সরকার মনোজ্ঞ কবিতা লিখতেন । তাঁর কবিতায় আছে জাত শিল্পীর প্রমাণ ।
        “স্মৃতি থেকে তাই এনেছি দু’মুঠো
          গন্ধ মদির আমনধান্য ‌।
          ওদুটি চোখের তাৎক্ষণিকের
         পাব কি পরশ যৎসামান্য ?”
আনন্দ চিত্তে বুদ্ধদেব বসুর কাব্যের রাজ্যে ভ্রমণ করেন তিনি এবং প্রার্থনা করেন, “যদি মরে যাই/ ফুল হয়ে যেন ঝরে যাই ।”
আদ্যন্ত প্রেমের কবি অরুণ কুমার লিখলেন,
      “বইতে পারিনা আমি এই গুরুভার
       এত প্রেম কেন দিলে এতটুকু প্রাণে।
       প্রেম জাগে দু নয়নে, প্রেম জাগে ঘ্রাণে
        প্রেম জাগে তৃষাতুর হৃদয় আমার ।”
                       কবি নরেশ গুহ বুদ্ধদেব বসুর ভাব শিষ্য। তাঁর প্রথম বই “দুরন্ত দুপুর” । এই কবি শৈলী দক্ষ ।
“আমাকে ডুবাও জলে, হাওয়ায় শুকাও,
 তবু গান দাও।”
প্রেমের কবি লিখলেন,
      “মাঘ শেষ হয়ে আসে
      ভোর হলো হীমে নীল রাত ।
       আলোর আকাশগঙ্গা ঢালে কত উল্কাপ্রপাত।
       আনত ওষ্ঠের তাপ বসন্তের প্রথম হাওয়ায় ।”
কবির  সংকল্প :
        “মৃত্যুকে দিয়ে মৃত্যুকে হবো পার,
         কবিতা আমার, কবিতা আমার ।”
আবার কখনো লেখেন :
         “এক বর্ষার বৃষ্টিতে যদি মুছে যায় নাম
      এত পথ হেঁটে এত জল ঘেঁটে কী তবে হলাম ?”
                  কবি রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরী এই সময়ের এক বড় মাপের কবি । তাঁর চারটি কাব্যগ্রন্থ  একত্রে সংকলিত হয়ে ” ব্রহ্ম ও পুঁতির
মউরি ” । তাঁর বিখ্যাত কবিতার বই “আরশিনগর”।
               এই ধারার দুই সফল কবি  জগন্নাথ চক্রবর্তী (১৯২৪– ৯২), অরুণ ভট্টাচার্য (১৯২৫–৮৫) ।
                 নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
               —————————–
  তাঁর কবিতার প্রেরণা রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, আবার তিনিই বিশুদ্ধ কলাকৈবল্যবাদী কবিও নন।
তাঁর অবস্থা যেন মধ্যবর্তী । তিনি এই রোগ নয় সমাজের ব্যাখ্যাতা এবং দুঃস্থ  দিবসের ভাষ্যকার ।
তিনি     নীরেন্দ্রনাথ     চক্রবর্তী   ( ১৯২৪—২০১৮)
তিনি সময় কে তাঁর কবিতার দর্পণে নিজের মতন করে ধরতে সবসময় উদ্যোগী থেকেছেন। তাঁর বামপন্থী কবিতা “এশিয়া” । পরে তিনি রাজনৈতিক সংস্রব থেকে সরে যান । “আমার ভিতরে / দলবদ্ধ হবার আকাঙ্খা নেই ।/ দলভুক্ত কবি, তুমি গজভুক্ত কপিত্থ প্রায় । “
 ‘উলঙ্গ রাজা’ তাঁর অন্যতম বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থ লেখার জন্য তিনি ১৯৭৪ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
দীর্ঘ সময় তিনি ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। নীরেন্দ্রনাথের প্রথম কবিতার বই ‘নীল নির্জন’, প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৪ সালে। এরপর প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা ‘অন্ধকার বারান্দা’, ‘নীরক্ত করবী’, ‘নক্ষত্র জয়ের জন্য’, ‘আজ সকালে’ সহ অসংখ্য কবিতার বই।
তাঁর কবিতা :
 ” অন্ধকার বারান্দা “
——————————
 “না, আমাকে তুমি শুধু আনন্দ দিয়ো না,
বরং দুঃখ দাও।
না, আমাকে সুখশয্যায় টেনে নিয়ো না,
পথের রুক্ষতাও
সইতে পারব, যদি আশা দাও দু-হাতে।
ভেবেছিল, এই দুঃখ আমার ভোলাবে
আনন্দ দিয়ে; হায়,
প্রেম শত জ্বালা, সহস্র কাঁটা গোলাপে,
কে তাতে দুঃখ পায়, ………..”
কিম্বা ,
|| অমলকান্তি ||
 “…………      ……..   …………
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।
সেই অমলকান্তি–রোদ্দুরের কথা ভাবতে-ভাবতে
ভাবতে-ভাবতে
যে একদিন রোদ্দুর হতে চেয়েছিল। “
অথবা তাঁর  বিখ্যাত জনপ্রিয় কবিতা :
   ” উলঙ্গ রাজা “
—————————
“………       ……..      ………
যাও, তাকে যেমন করেই হোক
খুঁজে আনো।
সে এসে একবার এই উলঙ্গ রাজার সামনে
নির্ভয়ে দাঁড়াক।
সে এসে একবার এই হাততালির ঊর্ধ্বে গলা তুলে
জিজ্ঞাসা করুক:
রাজা, তোর কাপড় কোথায়?”
__________________________________________
লিখেছেন :—-   সৌম্য ঘোষ । চুঁচুড়া । হুগলী ।

কবিতা সমগ্র

শপথের পথেই আমার ঘর
রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায়

এ যাবৎ যতবার হেঁটেছি শপথের পথ
ততবারই একদিনে তেইশ ঘণ্টা রাত্রি ঘেঁটেছি
অবশিষ্ট এক ঘণ্টার সূর্যে
শুকিয়ে নিয়েছি তেইশ ঘণ্টার ঘাম…..

আম্রপালী বা আপেলের দিকে নজর নেই
চব্বিশ ঘণ্টায় একশো আটবার দণ্ডবৎ করে
বরং নু’য়ে আছি উপরোক্ত চার বাক্যের অঙ্কে
আজও শপথের পথেই আমার ঘর….

আমি আলোর উপাসক হলেও
গন্তব্যের নাম অন্ধকার
অন্ধকারেই চেনা যায় নক্ষত্ররাজি
অন্ধকারেই ফুটে ওঠে আলোর শ্রেষ্ঠত্ব…..

আর শপথ অর্থে আমার অভিধান বলে:
অমাবস্যায় চড়ে সূর্যের দেশে যাবো….।

 

ব্যর্থ নারী দিবস
কলমে  সবিতা কুইরী

আমি ধর্ষিত এক নারী
হ্যাঁ  ধর্ষিত হয়েছি আমি।
দিনটা ছিল দু হাজার এগারো আট ই মার্চ।
বর্ষণ মুখর এক দুর্যোগের দিনে ।
দিনের বেলায় অন্ধকার নেমে এসেছিল সেদিন।
টিউশন থেকে বাড়ি ফিরছিলাম।
পথে দাড়িয়ে থাকা কয়েকটি নেড়ি কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ছুটে এসেছিল কিন্তু তারাও ঘ্রাণ নিয়ে
মুখ ফিরিয়ে আমাকে নিরপরাধ
প্রমান করল।
বিজ্ঞান বই এ পড়া কুকুরের ঘ্রাণশক্তির প্রমান যেন সেদিন
আরো একবার উপলব্ধি করলাম।
আজকেই ইতিহাস বই এ পড়ে ফিরছি
সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী
মানুষের কীর্তি কাহিনি।
গর্ব বোধ করছিলাম ।
আর বেশি পথ নেই
ভাবতে ভাবতেই বাড়ির আগে গাছগাছালিতে ঘেরা পোড়োবাড়িটা এসে গেল
ভীষণ দুর্যোগ ।
বিদ্যুতের ঝলকানি আর বজ্রপাত সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি।
সেখান থেকে ভেসে আসা মানুষের গলার আওয়াজ এ
আশ্বস্ত  হলাম ক্ষণিকের জন্য
যাক আর কুকুর গুলো জ্বালাতে পারবে না।
কিন্তু সেখানে
কয়েকটি নররাক্ষসদের দৃষ্টি
দেখে হাড় হিম হয়ে গেল
কিছু বুঝে ওঠার আগেই
অবর্ণনীয় অত্যাচারে জ্ঞানশূন্য হলাম।
কয়েক ঘন্টা পর পর চেতনা ফিরে বুঝলাম বেঁচে আছি।

আগে খবরের কাগজ টিভি
রেডিও তে এসব খবর পড়েছি।
মুখে মুখে মানুষের মহানুভবতার কথা শুনেছি।
তাই স্থির করলাম মরব কেন?
সব মানুষ তো পাশে আছে।
বাড়ি ফিরলাম।
ঘটনা আমার বলার  আগেই পাড়াপড়শিরা জেনে গেল
একেই বলে দেওয়ালেও কান আছে।
বাড়ির উঠোনে থিকথিক করছে
লোকজন।
দুর্যোগ কমেছে কিন্তু  একেবারেই নেমেছে বলা ভুল।
মাঝে মাঝে বিদ্যুত তখনও উঁকি ঝুঁকি বর্জ্রের গর্জন আর বৃষ্টি
কিন্তু উৎসুক মানুষ জনের ভুক্ষেপ নেই তাতে।
সবাই অ্যাকসিডেন্ট এ উদ্ধারের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
হসপিটাল যেতে লোকজনের অভাব নেই
মিডিয়ার ফোন নং জোগাড় করতে হল না
পুলিশ কে ডাকতে কোন হ্যাপা নেই।
আমি পাড়াপড়শি র গল্পের খোরাক
খবরের কাগজের হেড লাইনে
টিভি চ্যানেল গুলো আমার বাড়িতে লাইন দিয়ে বসে থাকে।
কবি  সাহিত্যিকদের  কলমের
ডগায় আমার স্থান।
এক ঝটকায় পাল্টে আমি হলাম নতুন আমি।
মানুষজন কাছে এসে তাদের নরপশু
বলে।নর রাক্ষুস বা এর থেকেও
নিম্ন মানের শব্দে আখ্যায়িত করে
মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় এখন।
কিন্তু দুরে গেলেই অন্য কথা
কেউ বলে মেয়ে মানুষ একা একা গেল কেন
কেউ বলে নিশ্চয় পোশাক ঠিক ছিল না
কেউ বা বলে নিশ্চয় কিছু ছিল
আমাদের কই হচ্ছে?
এভাবেই গেল কিছুদিন
আস্তে আস্তে আমার নামের খবরের কাগজ গুলো ঠোঙা
হয়ে বাজারে হাতবদল হল।
কেস এখন আদালতে ঝুলছে
মাঝে মাঝেই হাজির
বিরোধী পক্ষের বাকপটু উকিলবাবুর রকমারি প্রশ্ন
তির্যক মন্তব্যে মাঝে মাঝে
মনে হয় সেদিনের বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত মস্ত বড় ভুল ছিল।
খুড়তুতো বোন কে তার নিজের পছন্দ করা পাত্রের সঙ্গে
তড়িঘড়ি করে বিয়ে দিলেন কাকু।
আর ভাল পাত্র তো এ বাড়িতে
আসবে না।
আমার পর দুটো বোনের ভাগ্য
থেকে আইবুড়ি নাম কি উঠবে?
এ চিন্তায়  পাড়াপড়শি র ঘুম খিদে যেন উঠে গেছে ।
আমি বোনেদের মধ্যে বড়
আমি তো কলঙ্কিত
না আইবুড়ি না বিবাহিত।
বাবা মাকে দেখি অসহায় দৃষ্টিতে
তাকিয়ে আছেন।
কি করি বলুন তো?
উপদেশ দিতে আপনারা ভালোই পারেন।
জানি বলবেন
শক্ত হও
পড়াশুনা শুরু কর
নিজের পায়ে দাঁড়াতে বলবেন।
কিন্তু বিশ্বাস করুন আমার মাথা
কাজ করে না।
উৎসুক সমাজের নজর এড়িয়ে
কিছু করতে পারার ক্ষমতা নেই।
আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস
যা আমার কাছে অর্থ হীন।
আমার জীবনটাই তো অর্থহীন ।
আমি একটা সমস্যা ছাড়া তো আর কিছুই নয় এখন।
ভেবে পায়  না কাকে দোষারোপ করব?
ঐ নর রাক্ষুস গুলো কে? নাকি
সমাজ কে?
সমাধানের পথ কি আপনারাই বলুন।
এখন আমি কলঙ্কিত নারী।
বাবা মায়ের বোঝা
পাড়াপড়শি র বোঝা।আমার মুখ দেখলে নাকি অশুভ হয়।
আমার বোনেরা সংসারী হতে পারছে না।

আমি কি বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত
ভুল নিয়েছিলাম??

 

নারী
শ্রী রাজীব দত্ত 

আসলে কি  নাড়ীর টান ভাই
কখনো কি ভেবে দেখেছো তাই?
রক্তে-মাংসে গড়া স্নেহময়ী শরীরের কথা
সে যে স্নেহময়ী মা।
নারী দিবস উৎসবের আয়োজন
নাকি নারী সুরক্ষার প্রয়োজন।
অত্যাচার, ধর্ষণ চলেছে প্রতিনিয়ত
অন্যায়ের বিরুদ্ধে নারী পুরুষ গর্জে ওঠো।
সেদিন হয়তো ঘরের মেয়ে
নতুন আশা দেখবে
সমগ্র জাতি নতুন কিছু শিখবে।
হাত ধরো একে অপরের শক্ত করে
নারী জাতির উদ্দেশ্যে
সৃষ্টি যারা অঙ্গীকার
সেই নারী পূর্ণতা পাক এই সমাজের সাহায্যে।
যে  মা বোন বা প্রেমিকা তোমার প্রিয়
তারাও নারী
তাই সমগ্র নারী জাতিকে  সম্মানটুকু দিও।
আজ এই মহান দিনে এটাই হোক অঙ্গীকার

নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান অটুট থাক তোমার আমার।

 

নারী ও পুরুষের গল্প
মহীতোষ গায়েন

নারী দিবসে কবিতা লিখবো বলে
স্থির করেছি,নারী ও কলম হারিয়ে
গেল,যেমন হারিয়ে যায় ভালোলাগা
ভালোবাসার বাগানে শুরু আর্তনাদ।

নারীকে নিয়ে কবিতা লিখলে সবাই
রে রে করে তেড়ে আসছে,পুরুষকে
নিয়ে কবিতা লিখলে পুরুষ বলছে
আমি আবার কি দোষ করলাম কবি?

নারী ও পুরুষকে নিয়ে কবিতা লিখলাম
নারী বললো আমিইতো পুরুষের শক্তি,
পুরুষ বললো আমি নারীর পথ প্রদর্শক
সারা পৃথিবীতে চলছে এই দড়ি টানাটানি।

কৃষ্ণ ও রাধাকে নিয়ে কবিতা শুরু করবো
বলে ভাবছি,এমন সময় বাঁশি বেজে উঠলো,
দলে দলে রাধারা আসছে,দলে দলে কৃষ্ণরা

বাঁশি বাজাচ্ছে,ফুটছে শক্তি ও মৈত্রীর ফুল।

 

একটি বসন্তকালীন অভিযোগ
       শিবপ্রসাদ গরাই

আগুনরঙা পলাশের সঙ্গে আমার তীব্র বিরোধিতা
পলাশ ফুল দেখলেই মনে হয় তাতে লেগে আছে রক্তের রং
পলাশের লকলকে পাপড়িগুলি যেন আমার হৃদয়ের বেদনা
একটা সোজা রাস্তা ধরে যখন হেঁটে গেছি তোমার পাশেপাশে
তখনও রাস্তার পাশে পাশে ছড়ানো ছিল অসংখ্য পলাশের গাছ
বসন্ত এলে তার ডালে কালো ঘন কুড়ি সমস্ত পাতা ঝরিয়ে জেগে উঠতো
আর তখন থেকেই প্রতিদিন রাত্রে তীব্র যন্ত্রণায় ফেটে পড়ত আমার হৃদয়
বুঝতে পারতাম রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে
এর কোনো শেষ নেই
পলাশের ফুলগুলিও ফুটে ফুটে মাটিতে ঝরে পড়ে যাবে একদিন
সেদিনও এই যন্ত্রণার সমাপ্তি ঘটবে না ।

তুমি জানতে একথা
আমিও জানতাম
রক্তের সঙ্গে আমার আজীবন রক্তের সম্পর্ক
কিন্তু তাও প্রায় প্রত্যেক দিন আমরা পাশাপাশি হেঁটে যেতাম
আমার রক্তক্ষরণের দিনগুলোর যন্ত্রণার  উপশম হতে পারতে তুমি
কিছু কিছু দিন হয়েছও
কিন্তু পেনকিলার  খেলে যেমন তৎক্ষণাৎ যন্ত্রণার উপশম হয় যন্ত্রণার গভীরে যাওয়া যায় না
ঠিক তেমনই তোমার হাত আমাকে  যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিলেও
চিরকালীন কোন উপশম  দিতে পারেনি
কিন্তু কিছুই করার ছিলনা ।

আজও একই রাস্তা দিয়ে হেটে গেলে
পলাশ ফুল আগুন হয়ে আমায় খেতে আসে।

 

উর্বশী নদী ও রিক্ত পুরুষের গল্প
মহীতোষ গায়েন

কখনও  প্লাবন কখনও শান্ত
পূর্ণিমার চাঁদে মোহনিয়া নদী,
কখনও জোয়ার কখনও ভাঁটা
গোধূলির রঙে রিক্ত সে পুরুষ।

বেগবতী যৌবনা উর্বশী নদী,চলমান
জীবনের কথা এঁকেছে আহত পুরুষ,
সে এক ঘরছাড়া বাউল,বাসরের বাসি
ফুল সঁপে দেয় উত্তাল স্রোতের বুকে।

নিরিবিলি রাতভর স্রোতের শীৎকার
শুনে ক্লান্ত ঘুমায় সে পরকীয়ায় মজে,
কখনো ভাসায় তাকে,কখনো ডোবায়
নব-প্রেম খেলা করে ভাটিগাঙ বুকে।

সুরে সুরে বাঁধা পড়ে নদী,কামনার ফুলে
আবার সেজে ওঠে তাদের জীবন-বাসর,
সুখের গোলাপ বনে ঝড় ওঠে,সুরভিত
বাহারি বসন্ত-মৈথুনে তৃপ্ত নদী ও পুরুষ।

কাল থেকে কাল,ছয় ঋতু বারোমাস…
এভাবেই হিরণ্ময় প্রেম নদী ও পুরুষে
দীপ্ত হয়,কালের রাখাল সে পুরুষের

অতৃপ্ত প্রেম ভাসে উর্বশী নদীর বুকে।

 

ফসল বোনার ইতিকথা
মহীতোষ গায়েন

বহু বছর কেটে গেল! নিজেকে নিজের মত
দেখে নেওয়ার সময় এবার করে নিতে হবে,
আকাশ মেঘে ভরে যাবে,বৃষ্টিও হবে,উঠবে
ঝড়,দুর্যোগ কেটে গিয়ে সূর্য উঠবে আবার।

অসময়ে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করাটা খুব
জরুরি,লড়াইয়ের ময়দান সবার জন‍্য খোলা,
লড়াই থেকে নিজেকে সরালে অস্তিত্ব বিলোপ
হবে,তুমি ঘুরে দাঁড়াও,আগুনে আর কেন ভয়?

বহু বছর হয়ে গেল,নিজেকে নিজের মত করে
চেনার সময় এসে গেছে,চিনে নাও মানুষ,চিনে
নাও সময়,চিনে নাও জল বাতাস,চিনে নাও সব,
জেনে নাও হাওয়া মোরগের গতি,বিকশিত হও।

তুমি যদি আগুন নেভাতে না পারো আগুন তো
তোমাকে পোড়াবে,তুমি যদি আগুন জ্বালাতে
জান অন্ধকারে নিজের মুখও হারিয়ে যাবে,তুমি
যদি বৃষ্টি আনতে না পারো ফসল কিভাবে বুনবে?

 

Scroll to Top