১২৫তম জন্মজয়ন্তীর শ্রদ্ধাঞ্জলি – নেতাজীর দেশত্যাগ ও আজাদ হিন্দ – বাহিনী সম্পর্কে দু ‘চার কথা – অমিতাভ মুখোপাধ্যায়

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে শুধু দেশ নায়ক নয়, বিপ্লবের সন্তান বলাই শ্রেয়. কেননা গান্ধীজির সঙ্গে তাঁর শ্রদ্ধার সম্পর্ক থাকলেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি সত্যাগ্রহ ও অহিংস আন্দোলনের পথ পরিত্যাগ করে সহিংস নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন. নেপোলিয়নিও ভাবধারা তাঁকে প্রভাবিত করেছিল. জাগ্রত বিবেক বিবেকানন্দ ছিলেন তাঁর জীবন দর্পণ. দেশবন্ধু ও বাসন্তীদেবীর দ্বারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত হলেও তিনি বিশ্বাস করতেন, রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা ।

ব্রিটিশ সরকার সুভাষের এই মনস্তত্ব বুঝেই 1940, 2 জুলাই তাঁকে ‘ভারত রক্ষা আইনে ‘ গ্রেপ্তার করে. কারারুদ্ধ হওয়ার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন. তাই তাঁকে এলগিন রোডের বাড়িতেই গৃহ বন্দী করে রাখা হয়. এই বাড়ী থেকেই পাহারা দেওয়া পুলিশএর চোখে ধুলো দিয়ে(17 জানুয়ারি, 1941) অবাঙালির ছদ্মবেশে শিশির বসুর সহায়তায় মোটর গাড়িতে চেপে গোমো স্টেশনে গিয়ে ওঠেন.উদ্দেশ্য একটাই: অহিংস মতবাদ নিয়ে দেশ স্বাধীন করা যাবে না. ব্রিটিশ সরকারকে মারের বদলে মারই দিতে হবে. তাই এক্ষেত্রে বৈদেশিক সাহায্য প্রয়োজন. শত্রুর শত্রু আমার মিত্র এই ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ছিলেন ।

প্রথমে পেশোয়ার থেকে আফগানিস্তান, পরে মস্কো অতঃপর বার্লিন. 28 মার্চ, 1941.ইতিপূর্বে বন্দী হওয়া ভারতীয়দের নিয়ে প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত নাম্বিয়ার, ডঃ এম. আর ব্যাস, ডঃ গিরিজা মুখোপাধ্যায় প্রমুখ’র সহযোগিতায়’ আজাদ হিন্দুস্থান বেতার কেন্দ্র ‘গঠন করে সবধর্মের দেশবাসীর সমর্থন চান. তিনি যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে গড়ে তুললেন Free Indian Legion (মুক্ত ভারতীয় সেনা দল ).এই সেনা দলের প্রতীক হলো :উল্লম্ফনরত বাঘ. সুভাষ এই পর্বে হিটলারের সাহায্য চেয়েও পান নি. ইতিমধ্যে বিপ্লবী রাস বিহারী বসু জাপানে এক স্বতন্ত্র ভারতীয় সেনাবাহিনী গঠন করেছিলেন. এঁদের লক্ষ্য ছিল: আজাদ হিন্দ বাহিনী গঠন. প্রথমে 1942, 1সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে রাস বিহারী বসু ও ক্যাপ্টেন মোহন সিং “আজাদ হিন্দ ফৌজ “গঠন করেন. কিন্তু বিভিন্ন কারণে শ্রী সিং -এর সঙ্গে মত পার্থক্য দেখা দেওয়ায় সুভাষ চন্দ্র বসুকে রাস বিহারী বসু নব গঠিত সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক -এর দায়িত্ব নেবার আমন্ত্রণ জানান. সুভাষ সাগ্রহে তা মাথায় তুলে নেন.(1943, 25 অগাস্ট ) ।

জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে সুভাষ-এর যোগ্য নেতৃত্বে এক স্বতন্ত্র ধারা তৈরী হয়. আজাদ হিন্দ ফৌজের ডাকে ‘দিল্লী চলোর’ ঘোষণা করা হয়. এক বেতার ভাষণে এই সঙ্গে সমগ্র জাতির উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি. “এটি একটি স্মরণীয় আহ্বান বা উক্তি হয়ে সারা পৃথিবীর ভারত বাসীকে আন্দোলিত করে ।

শুরু হয় সশস্ত্র সংগ্রামের এক নতুন অধ্যায় . সেনা সদস্যরা সুভাষ চন্দ্রকে “নেতাজী “হিসেবে মেনে নেয়. আজাদ হিন্দ বাহিনীতে গান্ধী ব্রিগ্রেড, নেহেরু ব্রিগ্রেড, ঝাঁসীর রানী ব্রিগ্রেড(ক্যাপ্টেন: লক্ষ্মী স্বামী নাথন ) তৈরী হয়. এই পর্বে সুভাষের দেশপ্রেম, নেতা -নেত্রীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রশ্নাতীত ভূমিকা নেয়. শাহনওয়াজ খান সুভাষ ব্রিগ্রেডের দায়িত্ব পান ।

1943, 23 অক্টোবর সিঙ্গাপুরে স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়. শুরু হয় ব্রিটেন ও আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ. জাপান, জার্মানি, ইতালি মোট আটটি দেশ সেই স্বাধীন সরকারকে স্বীকৃতি দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়ায়. জাপান উপহার হিসেবে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ (1943, 6 নভেম্বর )আজাদ হিন্দ সরকারের হাতে অর্পণ করে. প্রধানমন্ত্রী তোজো নেতাজীকে পূর্ণ সমর্থন জানান. নেতাজী আন্দামানের নাম রাখেন শহিদ দ্বীপ আর নিকোবরের নাম রাখেন স্বরাজ দ্বীপ ।

1944, 14 এপ্রিল মণিপুরের মৈয়াং -এ ও কোহিমায় স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা তোলা হয়. ব্রিটিশ শক্তিকে নিয়ণ্ত্রণ করার জন্য ইম্ফল দখলে নিয়ে আসা হয় ।

কিন্তু বিধি ছিল বাম. দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে জার্মানি, জাপান হেরে যায়. মিত্র শক্তি জয় পায়. ফলে সুভাষএর ভারত জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যায়. কেননা আজাদ হিন্দ ও সর্বোপরি নেতাজী সামরিক দিক দিয়ে জাপানের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন.দিল্লী অভিমুখে অগ্রসর হয়েও তাঁকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্যাভাব, বিষাক্ত কীট পতঙ্গের সম্মুখীন হতে হয় ।

পরবর্তী পর্যায়ে তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনার অনভিপ্রেত সংবাদ প্রচারিত হয়. দিনটি ছিল–1945, 18 অগাস্ট।

জাতি এই দু :সংবাদ আজও বিশ্বাস করে না . নেতাজী পরিবারের সদস্যরা সকলেই এই সংবাদ বিশ্বাস করেন না. কেউ কেউ করেন ।

সমাজতন্ত্রী ও জাতীয়তাবাদী নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের আজাদ হিন্দ বাহিনীর মূল্যায়ন করতে গিয়ে মহাত্মা গান্ধী স্বীকার করে ছিলেন, “যদিও আজাদ হিন্দ ফৌজ তাঁদের আশু লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন নি, তথাপি তাঁরা এমন কিছু করেছেন , যে জন্য তাঁরা গর্ববোধ করতে পারেন . সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এই যে, তাঁরা একই পতাকার তলে ভারতের সকল ধর্ম ও জাতির মানুষকে একত্রিত করতে পেরেছিলেন. ধর্মীয় ও অন্যান্য ভেদবুদ্ধির উর্দ্ধে তাঁরা একতা ও সংহতির আদর্শ সঞ্চারিত করেছেন । “

সেদিন জার্মান ও জাপান দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে পরাজিত না হলে আজাদ হিন্দ ফৌজকে ব্যর্থতার মুখ দেখতে হতো না. আজাদ হিন্দ বাহিনী ও সুভাষ -এর দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই. তিনি ভারত আত্মার প্রতীক. প্রকৃত অর্থে দেশ নায়ক ।

শেষে, আক্ষেপ শুধু একটাই :স্বাধীনতার পর একাধিকবার বিভিন্ন নামে গুরুত্ব পূর্ণ কমিশন বসলেও সরকারি উদাসীন্যে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সঠিক মৃত্যু দিন সর্বোপরি চূড়ান্ত সংবাদ আজও ঘোষণা হলো না !

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এটি একটি রহস্য জনক অধ্যায় হিসেবেই আজও থেকে গেল ।

story and article

রেজাল্ট – শম্পা সাহা

দুই বোন পিঠোপিঠি, বড়টা বছর দশেক, ছোটটা আট সাড়ে আট। খেলতে যায় রোজই সামনের মাঠে। ওখানে আরো অনেক ছেলেমেয়েই খেলতে আসে।

গরীব বড়লোক অতোটা বাছবিচার তখনো ছিল না।
বড়টা বেশ ঠোঁট কাটা প্রতিবাদী টাইপের আর ছোটোটা নরমসরম ভালোমানুষ। বড়টা যে মন্দ মানুষ তা নয় তবে সব কিছু মেনে নেবার মধ্যে বাহাদুরি আছে বলে মনে করে না।

রোজই খেলতে যায় আর দেখে কয়েকজন ছেলে মেয়ের বাবা মা ওদের সঙ্গে নিজের ছেলে মেয়েদের মিশতে দিতে চায় না। প্রথম প্রথম ওরা বুঝতো না, কেন? কিন্তু ওরা মাঠে গেলেই বাবলীর মা ডাকতো, “বাবু চলে এসো, আর খেলতে হবে না”, পম্পার মা চ্যাঁচাতো, ” পম্পি,এই পম্পি, বাড়ি আয়”।

ওরা ভাবতো, বোধহয় ওদের কোনো কাজ আছে তাই ওদের মা ওদের ডাকছে। কিন্তু একদিন মেঘলা, দুই বোন একসাথে একটু আগে থাকতে উপস্থিত, “মান্তু  মাঠে ঢুকতে গিয়েও ওদের দেখে আবার বাড়ির পথে হাঁটা দেয়। কি হল ব্যাপার টা? খেলতে এসে ও চলে যাচ্ছে কেন?

বড়জন ছুটে গিয়ে ধরলো মান্তুর হাত, “কি  রে, খেলবি না? “, ” না, রে”, মান্তু এড়িয়ে যেতে চায়। ছোট জন গোবেচারা মুখ করে দাঁড়িয়ে।

“একটু খেল না, কি হবে? “, বড় বোন একটু জোর করে। মান্তু ও এদিক ওদিক দেখে রাজী। ব্যস শুরু হল ন ঘর কেটে কিৎ কিৎ খেলা।

মান্তুর মা বাড়ির বাইরে বেড়িয়ে মেয়েকে ওদের দুই বোনের সঙ্গে খেলতে দেখে মেয়েকে উদ্দেশ্যে করে গলা ছাড়ে, ” মান্তু, কতো বার বইলিছি না, ঐ ডির লগে খেলবা না, ঐডি ছুডোলোগ! ”

“ছুডোলোগ”, মানে তো ছোটোলোগ! স্তম্ভিত দুই বোন ই। কিন্তু কেন?  ওদের বাবার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে ওদের বাবা টাকার বিনিময়ে লোকের বাড়ির জল তুলে দেয়, আর মা ফুল গাঁথে, ওরা গরীব, তাই ওরা ছোটলোক!

না ওরা আর খেলেনি, খেলতে যায়নি আর। ওদের বন্ধুদের কাছে, তাদের মায়েদের কাছে নিজেদের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে যায়। মান্তু ওদের প্রায় সমবয়সী হলেও, তখন মান্তু থ্রি, ছোটটার সঙ্গে, বড়টা ফোর।

এর বছর ছয়েক পরের ঘটনা, মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেড়িয়েছে, বড় মেয়েটা এবছর মাধ্যমিক দিয়েছিল। মান্তু , বাবলীর মতো ভালো স্কুল নয়, ওদের এলাকার সবচেয়ে ওঁচা  স্কুল। যে স্কুলে লাস্ট ফার্স্ট ডিভিশন গেছিলো সাত বছর আগে। হ্যাঁ, 1995-96 সালে এতো ঘন ঘন, গাদা গাদা স্টার আর ফার্স্ট ডিভিশন ছিল না। বড়টা ফার্স্ট ডিভিশন, স্টার তো পেয়েছে, মাধ্যমিক মূল তালিকায় পজিশন 120.

বিকেল বেলা, আজ দুই বোন মা এর সঙ্গে যাচ্ছে এক আত্মীয়ার বাড়ি প্রনাম করতে। রাস্তায় যেতে যেতে শুনলো মান্তুর মা মান্তুকে ওকে দেখিয়ে বলছে, “ওই দিদিটার মতো রেজাল্ট করতে হবে, মনে থাকবে? ”

 

না ওরা আর খেলেনি খেলতে যায়নি আর

কবিতার রূপকল্প : পর্ব- ৫ – গুপ্ত কবি” : ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত – সৌম্য ঘোষ

সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, ” সেকাল আর একাল এর সন্ধি স্থলে ঈশ্বরগুপ্তের প্রাদুর্ভাব ।” ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ( ১৮১২– ১৮৫৯) । চব্বিশ পরগনা জেলার কাঞ্চন পল্লীতে ( বর্তমান নাম , ” কাঁচরাপাড়া’ ) ঈশ্বর গুপ্তর জন্ম হয় এক সম্ভ্রান্ত বৈদ্যপরিবারে। বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র একটি পর্যায়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন মূলত: কবিওয়ালা ও পাঁচালী দলের গান রচয়িতা। কবিওয়ালা ও পাঁচালীকারদের উত্তরাধিকার তাঁর কবিতায় মেলে । তাঁর কবিতা আবহমান পয়ার- ত্রিপদী তে লেখা, অনুপ্রাস ও যমকে চটকদার।

” বলীবলে আমি বলী বলে কভু নই বলী,
বলি কভু করিনে ভক্ষণ ।
হিত কথা সদি বলি রীতিমত দিই বলি
নাহি করি বলির বারণ ।।”

কবিওয়ালাদের ধরনে perpetual alliteration and play upon words যেমন তাঁর রচনায় লক্ষণীয়, তেমনি লক্ষণীয় রুচিহীনতা। এই রীতির পুরানো কাব্যধারার তিনি হলেন শেষ প্রতিনিধি। দেশপ্রেমের দ্বারা অনুপ্রাণিত ইতিহাস-চেতনাও তাঁর মধ্যে ছিল । সাহিত্য সম্রাট যদিও তাঁকে রায়গুণাকর কবি ভারতচন্দ্রের অনুগামী বলে গণ্য করেছেন, কিন্তু পরবর্তীকালে অনেক গবেষকের মতে , ঈশ্বরগুপ্তের উপর রামপ্রসাদের প্রভাব বেশি ছিল। তাঁর জীবন আদর্শ ও দর্শন ছিল বেশ পুরনো পন্থী । ইংরেজি-শিক্ষিত নব- বঙ্গের যুবকদের আধুনিকতা তিনি বরদাস্ত করতে পারেন নি। রক্ষণশীল এই কবির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মূলতঃ রক্ষণশীল জমিদারগণ। পরের দিকে তত্ত্ববোধিনী সভা ও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির উদারনৈতিক সংস্রবে এসে তাঁর গোঁড়ামি হ্রাস পায় । তৎকালীন সময়ে কৃষকদের উপর উৎপীড়ন, চাষীদের উপর নীলকরদের অত্যাচারের প্রতিবাদে দেশ প্রেমিক এই কবি বেদনাবোধ করেছিলেন ,

“হায় হায় পরিতাপে পরিপূর্ণ দেশ।
দেশের ভাষার প্রতি সকলের দ্বেষ ।।”

আবার বিপরীত দিকে, অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যায় তাঁর মধ্যে। তিনি সিপাহী বিদ্রোহের নিন্দা করেছিলেন এবং ইংরেজ রাজশক্তির তোষণ করেছিলেন,

” ভারতের প্রিয় পুত্র হিন্দু সমুদয়।
মুক্ত মুখে বল সবে ব্রিটিশের জয়।।।”

একজন দেশ প্রেমিক হওয়া সত্বেও তাঁর মধ্যে গড়ে ওঠা মধ্যবিত্তসুলভ দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিন ছিল। যুগসন্ধিকালের এই কবির উপর সেই যুগের অন্তর্বিরোধ প্রতিফলিত হয়েছিল । তিনি মেয়েদের লেখাপড়া নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতেন, আবার তিনিই ” বালিকারা যাহাতে বিদ্যাবতী” হয়, উপায় বাৎলে ছিলেন । তিনি বিধবা-বিবাহ মেনে নিতে পারেননি । অথচ অদ্ভুত বিষয়, তিনিই আবার বালবিধবার বিবাহের বিরোধী ছিলেন না । এই ধরনের অন্তর্বিরোধ প্রতিনিয়তঃ তাঁর লেখনীতে ধরা পড়তো।

দশ বছর বয়সে মাতৃবিয়োগের পর ঈশ্বরচন্দ্র জোড়াসাঁকোয় মাতুলালয়ে আশ্রয় নেন। শৈশবে লেখাপড়ায় অমনোযোগী হওয়ার কারণে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশিদূর এগোয়নি, তবে অসাধারণ মেধা ও স্মৃতিশক্তির অধিকারী ঈশ্বরচন্দ্রনিজচেষ্টায়বাংলা, সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষা শেখেন এবং বেদান্তদর্শনে পারদর্শিতা লাভ করেন। সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশের প্রেরণায় এবং বন্ধু যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুরের আনুকূল্যে ১৮৩১ সালের ২৮ জানুয়ারি তিনি সাপ্তাহিক সংবাদ প্রভাকর প্রকাশ করেন। অর্থসংকটের কারণে মাঝে চার বছর বন্ধ থাকার পর ১৮৩৬ সালের ১০ আগস্ট সপ্তাহে তিন সংখ্যা হিসেবে পত্রিকাটি আবার প্রকাশিত হতে থাকে। তাঁর সুযোগ্য সম্পাদনায় পত্রিকার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলে ১৮৩৯ সালের ১৪ জুন থেকে এটি দৈনিক পত্রে রূপান্তরিত হয়।

আধুনিক বাংলার সমাজ গঠনে সংবাদ প্রভাকরের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈশ্বরচন্দ্র প্রথমে নব্যবঙ্গ আন্দোলনের বিরুদ্ধে রক্ষণশীলদের পক্ষভুক্ত ছিলেন। তিনি হিন্দু কলেজের শিক্ষাপদ্ধতিরও বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু নবপর্যায়ে সংবাদ প্রভাকর সম্পাদনার সময় থেকে তাঁর মনোভাবের পরিবর্তন হতে থাকে। তিনি দেশের প্রগতিশীল ভাবধারার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। হিন্দু থিয়ফিলানথ্রফিক সভা এবং তত্ত্ববোধিনী সভায় তিনি বক্তৃতাও করতেন। প্রথম দিকে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ আন্দোলনের বিরোধিতা করে এ বিষয়ে নানা ব্যঙ্গ কবিতা রচনা করলেও পরে স্ত্রীশিক্ষার সমর্থন, ধর্মসভার বিরোধিতা, দেশের বৈজ্ঞানিক ও বাণিজ্যিক উন্নয়ন প্রচেষ্টা এবং দরিদ্র জনগণের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের মাধ্যমে উদার মনোভাবের পরিচয় দেন। এমনকি তিনি অক্ষতযোনি বিধবার বিবাহেও আর আপত্তি করেননি।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ছিলেন মজলিশি স্বভাবের কবি, রঙ্গ-ব্যঙ্গেই তাঁর কবিতা ভালো খুলতো । কবি বিষ্ণু দে তাঁকে প্রশংসা করেন। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত পারিপার্শ্বিক জীবন, নতুন কলকাতা শহরের জীবন ইত্যাদি নিয়ে কবিতা লিখতেন। অদম্য কৌতুকবোধের সরসতা মিশিয়ে । তাঁর লেখা অনেক ছত্র প্রবাদের মর্যাদা পেয়েছে । যেমন , ” এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙ্গে ভরে “। তিনি “সংবাদ প্রভাকর “এর সম্পাদক ছিলেন । ব্যক্তিগতভাবে তিনি সাংবাদিকও ছিলেন। সমকালের সমাজ সম্পর্কে সচেতন সাংবাদিক ও কবি। ইংরেজ ললনার সম্পর্কে লিখেছিলেন,

” বিড়ালাক্ষী বিধুমুখী মুখে গন্ধ ছোটে।
আহা আয় রোজ রোজ কত রোজ ফোটে ।।”

বাঙালি ধনীদের সম্পর্কে লিখেছিলেন,

” কর্তাদের গালগপ্প গুড়ুক টানিয়া ।
কাঁঠালের গুড়ি প্রায় ভূড়ি এলাইয়া।।”

পুরানো পন্থী ও নব্য পন্থীদের সম্বন্ধে ,

” একদিকে কোশাকুশি আয়োজন নানা।
আর দিকে টেবিলে ডেভিল খায় খানা।।”

কবি মদনমোহন তর্কালঙ্কার ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সমকালীন। সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক ইংরেজীও জানতেন তিনিও পুরানো পন্থী কবি । সমাজ চিন্তায় প্রগতিশীল মনন ও চিন্তন ছিল মদনমোহন তর্কালঙ্কারের মধ্যে। তিনি বিধবা বিবাহ, স্ত্রীশিক্ষা প্রভৃতির সমর্থক ছিলেন এবং জাতিভেদের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু কাব্য রচনার ক্ষেত্রে ছিলেন রক্ষণশীল তাঁর জনপ্রিয় পংক্তি :

” পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল
কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল ।। “

বাংলার লব্ধপ্রতিষ্ঠ লেখক রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮২৭– ১৮৮৭ ) ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত পন্থী এবং “সংবাদ-প্রভাকর” এর শিক্ষানবিশি। ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে ঈশ্বর গুপ্ত” সংবাদ প্রভাকর” পত্রিকার সম্পাদনা নিযুক্ত হয়েছিলেন। ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে “সংবাদ রত্নাবলী “পত্রিকার সম্পাদক হন ।’ সংবাদ প্রভাকর’ ছিল একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। তিনি এটিকে দৈনিকে রূপান্তরিত করেন। ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে “সাপ্তাহিক পাষণ্ড” পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। “সংবাদ সাধুরঞ্জন” পত্রিকার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন এবং কবিগান বাঁধতেন ।প্রায় বারো বছর গ্রামে গঞ্জে ঘুরে ঘুরে তিনি প্রাচীন কবিওয়ালাদের তথ্য সংগ্রহ করে জীবনী গ্রন্থ রচনা করেন ।

ইশ্বরচন্দ্র প্রথম জীবনে অত্যন্ত রক্ষণশীল ছিলেন। তিনি হিন্দু কলেজের শিক্ষা পদ্ধতি, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিরোধিতা করতেন । পরবর্তীকালে থিওফিলান্থ্রপিক সভা, তত্ত্ববোধিনী সভা ও জোড়াসাঁকোর সংস্পর্শে এসে তাঁর রক্ষণশীল পুরানো পন্থী মানসিক গোঁড়ামি মুক্ত হয় ।

ঈশ্বরচন্দ্র বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যুগসন্ধির কবি হিসেবে পরিচিত, কারণ তিনি সমকালের সামাজিক ও ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে কবিতা রচনা করলেও তাঁর ভাষা, ছন্দ ও অলঙ্কার ছিল মধ্যযুগীয়। মঙ্গলকাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্রের সাহিত্যাদর্শ যখন লুপ্ত হয়ে আসছিল, তখন তিনি বিভিন্ন বিষয় অবলম্বনে খন্ডকবিতা রচনার আদর্শ প্রবর্তন করেন। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপই ছিল তাঁর রচনার বিশেষত্ব। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের এ ভঙ্গি তিনি আয়ত্ত করেছিলেন কবিয়ালদের নিকট থেকে। ব্যঙ্গের মাধ্যমে অনেক গুরু বিষয়ও তিনি সহজভাবে প্রকাশ করতেন।

স্বদেশ ও স্বসমাজের প্রতি ঈশ্বরচন্দ্রের অনুরাগ ছিল অত্যন্ত নিবিড়। তিনি বাংলা ভাষার উন্নয়নের জন্য যে আন্দোলন করেছেন তা আজ স্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি সবসময় ইংরেজি প্রভাব বর্জিত খাঁটি বাংলা শব্দ ব্যবহার করতেন। ভাষা ও ছন্দের ওপর তাঁর বিস্ময়কর অধিকারের প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর বোধেন্দুবিকাশ (১৮৬৩) নাটকে।

ঈশ্বরচন্দ্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ভারতচন্দ্র রায়, রামপ্রসাদ সেন, নিধুগুপ্ত, হরু ঠাকুর ও কয়েকজন কবিয়ালের লুপ্তপ্রায় জীবনী উদ্ধার করে প্রকাশ করা। পরবর্তীকালের বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ লেখকের জন্য একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করার কৃতিত্বও তাঁর। যদিও ঈশ্বরচন্দ্রের কাব্যরীতি পরবর্তীকালের বাংলা সাহিত্যে আর অনুসৃত হয়নি, তথাপি এ কথা স্বীকার্য যে, ভবিষ্যৎ বাংলা সাহিত্যের জন্য তাঁর গঠনমূলক চিন্তাভাবনা ও আদর্শ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বাংলা সাহিত্যে তাঁর চিরস্থায়ী আসন লাভ হয়েছে। মধ্যযুগের দেবমাহাত্ম্য ব্যঞ্জক বিষয় থেকে বাংলা সাহিত্যকে তিনি মুক্ত করেন । এমনকি তৎকালীন কবিওয়ালাদের জিম্মা থেকে বাংলা কবিতাকে বৈদগ্ধ ও মার্জিত রুচির আলোয় আনেন । স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র তাঁকে ” গুরু” মানতেন।
২৩শে জানুয়ারি, ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতায় পরলোকগমন করেন।।

 Soumya Ghosh

লিখেছেন – অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ।
পোঃ চুঁচুড়া জেলা : হুগলী

পরম – অভিষেক সাহা

” অবশেষে একটু শান্তি পেলাম। বলতে পারিস একটা অস্ত্র পেলাম।” স্বস্তির শ্বাস ফেলে প্রথম বন্ধু বলল।
” কেন রে কী হল। কী অশান্তিতে ভুগছিলি !” অবাক হয়ে দ্বিতীয় বন্ধু জিজ্ঞেস করল ।
” খবরের কাগজ পড়িস না, টিভিতে নিউজ দেখিস না ? এই দুনিয়াতে থাকিস নাকি অন্য কোথাও ?” বিরক্ত হয়ে প্রথম বন্ধু পাল্টা প্রশ্ন করল।
” আহা, চটছিস কেনো! খবরের কাগজও পড়ি, টিভিও দেখি, তবে শুধু খেলার খবর । অন্য খবরে আমার তেমন কোনও ইন্টারেস্ট নেই। কী বলতে চাইছিস খুলে বল ।” দ্বিতীয় বন্ধু বলল ।

” এই যে এত মাস ধরে করোনা ভাইরাস আমাদের উপর দিয়ে , সারা দুনিয়া জুড়ে বুলডোজার চালাচ্ছে, কত নামি- অনামি লোক মারা পড়ল, কত লোকের চাকরি গেল, কত লোক মাইলের পর মাইল হেঁটে শুধু প্রাণটুকু নিয়ে বাড়ি ফিরল, কত লোক বেঘোরে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তাতেই জান খোয়ালো, সেসব খবর রাখিস নাকি ফুটবল-ক্রিকেট নিয়েই মেতে আছিস ?” প্রথম বন্ধু ব্যাখ্যা করে জানতে চাইল ।

” করোনার কথা জানব না কেনও! আমিও তো তিন মাস বাড়ি থেকে বের হতে পারিনি। এপাড়া-ওপাড়া-সেপাড়ায় কত লোক মারা গেল। এখনও তো কাজ এগোচ্ছে কচ্ছপ গতিতে। প্রথম দিকে সব খবরই রাখতাম। তারপর বিরক্ত হয়ে ছেড়ে দিয়েছি। এখন নতুন কী হল!” দ্বিতীয় বন্ধু জিজ্ঞেস করল ।
” এখন হল এই যে, বিজ্ঞানীরা করোনার ভ্যাকসিন বের করেছেন। মানুষকে দেওয়াও শুরু হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে সবাই ভ্যাকসিন পাবে। তারপর আর করোনার ভয় থাকবে না । তাইতো একটু শান্তি পেলাম। তুই কী আকাশের দিকে তাকিয়ে চলিস !” প্রথম বন্ধু স্বস্তির কারণ বলল।

দ্বিতীয় বন্ধুর তবু স্বস্তি হল না, কেমন একটা আনমনা হয়ে বলল ” জানিস তো করোনার থেকেও একটা বড় ভাইরাস আছে, খিদের ভাইরাস। পুরো দুনিয়াতে কত মানুষ না খেতে পেয়ে, অপুষ্টিতে রোজ মরছে, নাহলে মরার জন্য অপেক্ষা করছে। করোনার ভ্যাকসিন এসেছে খুব ভালো কথা, কিন্তু যেদিন খিদে ভাইরাসের ভ্যাকসিন আসবে, একটা মানুষও আর না খেতে পেয়ে মরবে না, সেদিন আমি পরম শান্তি পাব। “

abhisek saha

Scroll to Top